যশোর-খুলনার দুঃখ ভবদহ পাড়ের মানুষের ভোগান্তির শেষ কোথায়?

# প্রায় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বরাদ্দেও ভোগান্তির অবসান হয়নি #
মোঃ আব্বাস উদ্দীন, মণিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধিঃ
যশোর-খুলনার দুঃখ ভবদহ পাড়ের মানুষের যেন ভোগান্তির কোন শেষ নেই ! দীর্ঘ চার দশক ধরে ভবদহ বিল পাড়ের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে জলের সাথে লড়াই করে জীবন-জীবিকা অতিবাহিত করছেন। ভবদহ পাড়ের ভুক্তভোগী মানুষের একটাই এখন প্রশ্ন কবে এই জলযন্ত্রনার ছোবল থেকে তারা পরিত্রাণ পাবেন? প্রায় বছর জুড়েই পানির সাথে সংগ্রাম করেই তাদের দিনাতিপাত করতে হয়। আর বর্ষা মৌসুম আসলে এই জলযন্ত্রনা তাদের আস্টে-পিস্টে চেপে ধরে। বছরের পর বছর ভবদহ সমস্যা সমাধানের আশ্বাস ওদের কাছে এখন চরম অবিশ্বাসে রুপ নিয়েছে। ভবদহ সমস্যার সমাধান কল্পে চার দশকে প্রায় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বরাদ্দ হলেও তেমন কোন সুফল পাওয়া যায়নি। ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে আমডাঙ্গা খাল ও ৮১ কিলোমিটার নদী খনন প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন চাই ভূক্তভোগিরা। পাশাপাশি ভবদহের বিলে পর্যায়ক্রমে টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভবদহ সমস্যা সমাধানের দাবীতে আজও তারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
চলতি বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও নদীর উজানের ঢলে একদিকে যশোর জেলার অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর ও খুলনা জেলার ফুলতলা ও ডুমুরিয়া উপজেলার প্রায় তিনশ’ গ্রামের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন অপরদিকে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।
গম্প্রতি সরেজমিন ভবদহ অধ্যুষিত মণিরামপুর উপজেলার কুলটিয়া,লখাইডাঙ্গা, হাটগাছা, বাজে কুলটিয়া, আমিনপুর,হাসাডাঙ্গা এলাকায় গেলে মানুষের দুর্ভোগের চিত্র উঠে আসে। লখাইডাঙ্গা গ্রামের কাকলী রানী বিশ্বাস এভাবে আর জলের সাথে কতদিন বসবাস করবো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, আর কারো কাছে জল সরানোর কথা বলবো না। বলে কোন লাভ নেই! আমিনপুর গ্রামের মুক্তা খাতুন জানান, গত এক মাস ধরে বাড়ি-ঘরে পানি উঠেছে। বাধ্য হয়ে বারান্দায় রান্না করতে হচ্ছে।
জানাযায়, যশোর-খুলনা জেলার ২৭ বিলের পানি নিষ্কাশনের একামাত্র পথ ভবদহ স্লুইচগেট। ১৯৬৩ সালে ভবদহ স্লুইচগেট প্রতিষ্ঠার পর ৮০’র দশকে ভবদহ সংলগ্ন টেকা, শ্রী,হরি নদীসহ খালগুলোতে পলি পড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতে থাকে। আকাশ বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ওই ৮০’র দশকের শেষ দিকে এই দুই জেলার মণিরামপুর,অভয়নগর,কেশবপুর,ফুলতলা ও ডুমুরিয়া উপজেলার তিনশ’ গ্রাম পানিতে তলিয়ে যায়। পলি অপসারনসহ পানি নিষ্কাশনে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে প্রায় ৮শ’কোটি টাকা ব্যয় হলেও এ সব অপরিকল্পিতভাবে গৃহীত প্রকল্পে কোন সুফল বয়ে আনেনি। বরং সিংহভাগ অর্থ লুটপাট হয়েছে দাবি ভূক্তভোগিসহ বিভিন্ন শ্রেনি-পেশার মানুষের। ভবদহের করাল গ্রাসে টিকে থাকতে না পেরে বাধ্য হয়ে তাই অনেক পরিবার তাদের পূর্ব পুরুষের পৈত্রিক নিবাস তথা বাস্তু-ভিটা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে গেছে।
সূত্র জানায়, ১৯৯৬ সালে কেজেডিআরপি’র (খুলনা-যশোর ড্রেনেজ রিহেবিলেশন প্রকল্প) আওতায় ২২৯ কোটি, ২০০২ সালে খুলনা-যশোর পানি নিষ্কাশন প্রকল্পের আওতায় ২৫২ কোটি, ২০০৬ সালে ৬৯ কোটি, ২০১১ সালে ৭১ কোটি, ২০১৪ সালে ৪৪ কোটি এবং সর্বশেষ ভবদহ আমডাঙ্গা খাল খননে ৪৯ কোটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া নদী খননে ১৪০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। গৃহিত প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থ লুটপাট হয়েছে দাবি ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটিসহ সংশ্লিষ্টদের।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক রনজিৎ বাওয়ালি বলেন, বিগত সরকারগুলো ভবদহ সংস্কারে শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও সে সব প্রকল্প কোন সুফল বয়ে আনেনি। সিংহভাগ অর্থ জনপ্রতিনিধি ও পাউবো’র (পানি উন্নয়ন বোর্ড) এক শ্রেনির দুর্নীতিবাজ অসাধু কর্মকর্তার পকেটে গেছে।
পাউবোর যশোর অঞ্চলের নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাশীষ ব্যানার্জী জানান, ভবদহ সংলগ্ন নদী-খাল খননে ১৪০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা একনেকে অবমুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে।



