স্থানীয় সংবাদ

‘এক মিনিট, আমার বাবুকে একটু ফোনে ধরিয়ে দেন না কেউ, শেষ কথাটা বলি!

# ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত ৩, আহত ৬ #
# জানাযা ও দাফন সম্পন্ন, শোকে পাথর ও বাকরুদ্ধ গোটা পরিবার #

স্টাফ রিপোর্টার : ‘এক মিনিট, ‘এক মিনিট, আমার বাবুকে একটু ফোনে ধরিয়ে দেন না কেউ, শেষ কথাটা বলি-’ মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত রুবেলের শেষ কথা ছিল এটি। অতঃপর, ভাঙা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন খুলনার দৌলতপুর দেয়ানা উত্তরপাড়া এলাকার বাসিন্দা কামাল হোসেন রুবেল (৪০)। রাজধানী ঢাকার একটি ভিসা এজেন্সির অফিসে প্রায় এক যুগ কাটিয়ে দিয়েছেন কর্মে। মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) ঢাকা গুলিস্তান হতে খুলনাগামী ওয়েলকাম বাসের টিকিটও কাটেন, গন্তব্য গোপালগঞ্জ। বাসের সিটে ওঠে বসে তিনি, বাস চলছিল ঠিকঠাক। হঠাৎ, সকাল সোয়া ৯টার দিকে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের মাদারীপুরের আড়িয়াল খাঁ ব্রীজের উপর বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ভয়াবহ মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনা ঘটে। মর্মান্তিক ওই সড়ক দূর্ঘটনায় বাসের হেলপারসহ ৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- বাসের হেলপার পিরোজপুর নাজিরপুরের আলতাপ হোসেনের পুত্র মনির শেখ (৪১), বাসের যাত্রী খুলনার দৌলতপুর দেয়ানা উত্তরপাড়া এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনের পুত্র কামাল হোসেন রুবেল (৩৮) ও গোপালগঞ্জ সদর এলাকার বাসিন্দা কহিনুর আলম (৫০)। এছাড়াও মর্মান্তিক দূর্ঘটনায় এজাহার সূত্রে ৬ জন আহত উল্লেখ থাকলেও বেশ কিছু যাত্রী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। ওই ঘটনায় মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) নিহত কহিনুরের পুত্র হাসানুল আলম রাজু বাদী হয়ে মাদারীপুর শিবচর থানায় সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ মোতাবেক মামলা দায়ের করেন (নং-২)।
নিহত রুবেলের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নিহত রুবেল প্রায় একযুগের অধিক সময় ধরে রাজধানী ঢাকায় নিজ ভিসা এজেন্সী অফিস কর্মরত। অফিসের কাজে তিনি মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) খুব সকালে বাসযোগে গোপালগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা করেন। সকাল সোয়া ৯টার দিকে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের মাদারীপুরের আড়িয়াল খাঁ ব্রীজের উপর বাস-ট্রাক সংঘর্ষে ভয়াবহ মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনা ঘটে। আশঙ্কা জনক অবস্থায় ৩ জনকে পুলিশ ও স্থানীয়রা উদ্ধার করে হাসপাতাল নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত বলে ঘোষনা করেন। নিহত রুবেলের ছোট ভাই সেজানকে ফোন দিয়ে পুলিশ তার ভাইয়ের মৃত্যুর খবর জানান। ওই খবরে ছোট সেজান হাসপাতালে পৌচ্ছে ভাইয়ের মরদেহ দেখতে পয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং বিকাল ৪ টার দিকে পুলিশ সকল আইনগত কার্যক্রম শেষে নিহতদের মরদেহ হস্তান্তর করেন। রাত ৯ দিকে রুবেলের লাশ খুলনার নিজ বাড়ীতে পৌচ্ছালে পরিবার, আত্মীয়-স্বজনদের আহাজারী ও আর্তনাতে সেখানকার আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠে। পরিবারের দাবি, হাইওয়েতে ট্রাকের পাকিং, বাসের উচ্চগতি ও ড্রাইভারের খামখেয়ালী এবং বেপরোয়া গাড়ী চালনার কারণে অকালে ঝড়ে গেল ৩ টি তাজা প্রাণ। এদিকে, রুবেলের লাশ বাড়ীতে আসলে তার একমাত্র শিশু পুত্র সন্তান ইব্রাহিম (৮) কান্নায় ভেঙে পড়ে। বাবার লাশ সামনে দেখে নিষ্পাপ শিশুটির কান্না থামেনি, অবুঝ শিশুটি বার বার বলছে,‘বাবা আসবেনা, আমার বাবা আসবেনা। আমার বাবা মরে গেছে, আমিও চলে যাবো। বুধবার (৩ ডিসেম্বর) সকালে দৌলতপুর আঞ্জুমান ঈদগাহে নিহত কামাল হোসেন রুবেলের জানাযা নামায শেষে গোয়ালখালি কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।
হাইওয়ে পুলিশ জানায়, রাজধানী ঢাকা থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে ওয়েলকাম পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস। ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের আড়িয়াল খাঁ ব্রীজের উপর ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দেয় বাসটি। ওই ঘটনায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় বাসের হেলপারসহ ২ যাত্রীকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাদের মৃত বলে ঘোষনা করেন। এছাড়া ওই দূর্ঘটনায় আরো ৬ গুরুতর আহত হয়েছেন। আইনগত পক্রিয়া শেষ করে নিহতদের মরদেহ তাদের আত্মীয়দের কাছে হস্তান্তর করে দেওয়া হয়। এছাড়া ওই ঘটনায় শিবচর থানায় একটি মামলাও হয়েছে। নিহত রুবেলের ছোট ভাই সেজান জানান, আমাদের দেশে আইন আছে, আইনের বাস্তবায়ন নাই। কিভাবে হাইওয়ে রাস্তার উপর ট্রাক দাড়িয়ে থাকে, তাছাড়া বাসের ড্রাইভারও বেপরোয়া গাড়ি চালিয়েছে। দূর্ঘটনায় আমি আমার ভাইকে চিরদিরেন জন্য হারিয়ে ফেললাম। আমাদের সুখি পরিবার ছিল, ভাইয়ার শূন্যতা কখনো পূরন হবে না। আমি আমার ভাইয়ের জন্য সকলের কাছে দোয়া চাই এবং পরিবহন আইনের সঠিক বাস্তবায়ন চাই, যাতে এমন ঘটনা আর কারো সাথে না ঘটে। নিহত রুবেলের ভাগ্নে আবির হাসান জানান, মামা এতো তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে যাবে ভাবতে পারছিনা। মামার একমাত্র ছেলে ও, যদি শুনতে চাই, তার বাবা কোথায় কি জবাব দেব। আমাদের দেশে আইন থাকলেও তার সঠিক প্রয়োগ নেই। মামা যে বাসে ছিল, তার ড্রাইভার বেপরোয়া গাড়ী চালানো এবং হাইওয়ের উপর ট্রাকের পাকিংয়ের কারণে দূর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে মনে করি। নিহত রুবেলের পিতা কান্না জড়িত কন্ঠে জানান, আমার বাবা আমাদের ফেলে তার আসল বাড়ীতে চলে গেল। পিতার কাধে সন্তানের লাশ পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বস্তু। কেবল সেই উপলব্দি করতে পারবে, যার কাধে লাশ উঠেছে। ছোট শিশুটিকে কি বলবো, যখন যে জানতে চাইবে তার বাবা কোথায়। সবাই আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন, যেন আল্লাকে ওকে ক্ষমা করে জান্নাতের মেহমান বানিয়ে নেন। সু-শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’র খুলনার সাধারন সম্পাদক এড.কুদরত ই খুদা জানান, সড়ক দূর্ঘটনার পেছনে বেশ কিছু কারন রয়েছে। বিশেষ করে নাম মাত্র লাইসেন্সধারী অভিজ্ঞ চালকের দিয়ে গাড়ী চালনা করা অন্যতম। তাছাড়া হাইওয়েতে ওভারটেকিং, ওভার স্প্রীড থাকার কারনে হরহামেশা দূর্ঘটনা ঘটে। এ ব্যাপারে হাইওয়ে পুলিশের অগ্রনী ভূমিকা রাখতে হবে। মাদারীপুরের শিবচর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জহুরুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান চালায় হাইওয়ে পুলিশ। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হলে সেখানে ৩ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় শিবচর থানায় একটি মামলা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button