খুলনায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে পেঁয়াজের দাম!
ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানী বন্ধের খবর ও মজুত সংকটের অজুহাতে কারসাজির অভিযোগ

# দ’ুদিন আগের ১০০ টাকার পেঁয়াজ খুচরা ১৪০-১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে #
# কারাসাজির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণসহ বাজার মনিটরিংয়ের দাবি সংশ্লিষ্টদের প্রতি #
# দামের এমন ছন্দপতনে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে সাধারণ ক্রেতারা #
মো. আশিকুর রহমান ঃ সারাদেশের মতো খুলনার বাজারে আবারো চোখ রাঙাচ্ছে দেশী পেঁয়াজ। পেঁয়াজের ঝাজে পুড়ছে গোটা খুলনার বাজার। মাত্র দু’দিনের ব্যবধানে খুলনার পাইকারি বাজারে দৃশ্যমান মানভেদে ১২৫-১৩০ টাকা ও হাত ঘুরে খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৪০-১৫০ টাকার কেজি দরে। তাছাড়া ভারতের পেঁয়াজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশ-পেঁয়াজ আমদানী বন্ধের খবর ও মজুত থাকার পরও চাহিদার তুলনায় পেয়াজ সংকট, মুকামে দাম বেশিসহ বিভিন্ন অজুহাত খাড়া পেয়াজ নিয়ে কারসাজি বন্ধ হচ্ছে না। ওইসব কারনকে সামনে রেখে এক শ্রেনীর অসাধু ব্যবাসায়ীরা পেয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। হঠাৎ করে পেঁয়াজের দামের এই ছন্দপতনে ক্ষুব্ধ খুলনার সাধারন ক্রেতারা। পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রন ও কারসাজি বন্ধে বাজার মনিটরিংয়ের বিষয়ে যাদের মাথা ব্যাথা থাকার কথা, তাদের দৃশ্যমান সন্তোষজন কোনো উল্লেখ্য পদক্ষেপ গ্রহন করতে দেখা যাচ্ছে না। ক্ষুব্ধ ক্রেতারা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে পেঁয়াজ নিয়ে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট ও কারসাজি চলছে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। সিন্ডিকেট ও কারসাজির কাছে সবাই যেন জিম্মি হয়ে আছে। কোন দেশে বসবাস করছি আমরা রাতে পেয়াজ দেখলাম ৯৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, ঘুম থেকে ওঠে শুনি সেই পেয়াজ ১৪০-১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যে যেভাবে পাচ্ছে দাম হাকাচ্ছে। অর্থ্যাৎ, মুকাম হয়ে পাইকারি বাজার, পাইকারি বাজার হয়ে খুচরা বাজার এবং সর্বশেষ শহরের অলিগলির দোকানগুলোতে নিয়ন্ত্রনহীনভাবে বিক্রি হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষুব্ধ সাধারনত ক্রেতারা পেয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রন ও কারসাজি বন্ধের বিষয়ে বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্ব থাকা দপ্তরগুলো সুদৃষ্টি ও হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
খুলনার পাইকারি পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা বলছেন, খুলনার পাইকারি পেঁয়াজ বাজারে কুষ্টিয়ার- শ্মশান, বাঁশগ্রাম, পান্টি, মাগুরার- বুনোগাতি, আড়পাড়া, ঝিনাইদহের- শৈলকূপা, লাঙ্গলবাঁধ, ফরিদপুরের নগরকান্দা, ঝাটুরদিয়া, চারহাট, মকসুদপুর, পোড়াপাড়া, কালিনগর, ময়েনদিয়া, ধানগাসহ বিভিন্ন হাট ও মুকাম হতে পেয়াজ সরবরাহ হয়ে থাকে। ওই অঞ্চলে কৃষকের কাছে যে পেঁয়াজ মজুত ছিল তার প্রায় শেষে দিকে। যে কারনে চাহিদার তুলনায় পেয়াজের সংকট। ক্রমশই কৃষকদের কাছে মজুত করা পেঁয়াজ কমে আসছে। মুকামে বেশি দামে পেয়াজ কেনা লাগছে, এসব কারনই প্রভাব ফেলছে খুলনার পাইকারি ও খুচরা বাজারে। তারা আরো জানিয়েছেন, বাজারে নতুন কালি পেয়াজ আসা শুরু করেছে। কিছু দিনের মধ্যে আসলে বাজার নিয়ন্ত্রন ও দাম কমে আসবে। অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, যখন পেঁয়াজের দাম কমছিল, ওই সময় অনেক ব্যবসায়ী বাজারে সরবরাহের জন্য কৃষকের কাছ থেকে যারা সরাসরি পেঁয়াজ কিনেন, তারা সেই পেঁয়াজ বাজারে না ছেড়ে মজুত করে রেখে ছিল। কৃষকদের কাছে মজুত করা পেঁয়াজ কমে আসার খবরে ওই অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের পূর্বের মজুত রাখা পেঁয়াজ এখন বেশি দরে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নগরীর পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের বলছেন, যখন যে দামে পেয়াজ কিনি, সামান্য সামান্য লাভে বিক্রি করি।
নাগরিক নেতা বলছেন- সিন্ডিকেটের শিকড় অনেক গভীরে। প্রশাসনের যে শাখাগুলো বা বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে যারা আছেন তারাও এদের দ্বারা কোনো কোনো ভাবে প্রভাবিত, এছাড়া প্রশাসনেরও গাফালতি আছে। এই সিন্ডিকেট বা কালো বাজারিরা জনগণকে জিম্মি করে তারা নিজেরা একটা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। সিন্ডিকেটের মাধ্যেমে তারা একটা দর ঠিক করে ফেলে, সবখানে ওই দামেই বিক্রি হয়। এই সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য জেলা প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ দরকার। পাশাপাশি আইন-শৃঙখলা বাহিনীর সহযোগীতায় বাজার মনিটরিং ও এছাড়া মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে দোষীদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা বা জরিমানা করা গেলে কলোবাজারি পুরাপুরি বন্ধ না হলেও কিছুটা নিয়ন্ত্রনে আসবে বলে জানিয়েছেন তারা। শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) খুলনা মহানগরীর পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি পেয়াজ বিক্রি হয়েছে মানভেদে ১২৫-১৩০ টাকা দরে, নতুন কালি কাটা পেয়াজ মানভেদে ৯৫-১০০ দরে বিক্রি করা হয়েছে। পাশাপাশি নগরীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেয়াজ বিক্রি হয়েছে ১৪০-১৪৫ টাকা দরে। নগরীর স্থানীয় অঞ্চলের ক্ষুদ্র বাজার ও দোকানে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে নগরীর পাইকারি ও খুচরা বাজার সমূহে ছুটির দিনে বাজারে এসে সাধারন ক্রেতারা হোচট খাচ্ছেন পেয়াজ কিনতে বলে জানিয়েছেন।
দৌলতপুর পাইকারী কাঁচা বাজারে আসা ক্রেতা জাহিদ জানান, বাজারে ফের পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজি ও অস্থিরতা শুরু হয়েছে। কোনো ভাবেই ২ দিনের আগের ৯০-১০০ টাকার পেঁয়াজ ১৪০ টাকা, স্থানীয় এলাকায় ১৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমরা কোন দেশে বাস করি, যে ব্যবসায়ীদের কাছে সাধারন ক্রেতারা জিম্মি। এটা কোনো ভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করা উচিত। বাজার নিয়ন্ত্রনে আসলে সাধারন ভোক্তারা একটু হলেও স্বস্তিতে থাকবে। পাবলা চুন্নির বটতলা এলাকার বাজারে আসা ক্রেতা নদী জানান, পেঁয়াজ রান্নার গুরুত্বপূর্ণ একটি মসলা। তরকারি রান্না করতে পেয়াজের বিকল্প নাই। দু’দিন আগে ১০০ টাকায় পেয়াজ কিনলাম, গতকাল বাজারে গিয়ে শুনি ১৫০ টাকা কেজি। কেমন যেন আকাশে ভেঙে মাথায় পড়লো।
ফারুক হোসেন নামের আরেক ক্রেতা জানান, এদেশের উন্নয়ণ চাইলে, আগে আমাদের নীতি- নৈতিকতা ও মানসিকতা বদলাতে হবে। আমরা কোন দেশে বাস করি, যে ২/৩ দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৩০/৪০ টাকা বেড়ে যায়। গত, কয়েক বছর ধরে পেঁয়াজ নিয়ে ব্যবসায়ীরা কারসাজি করছে। এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের আইনের মুখোমুখি করলে আমাদের মতো সাধারন জনগন উপকৃত হবো, আর কিছুই বলার নেই।
কেসিসির সোনাডাঙ্গা পাইকারী বাজারে নিউ হক বানিজ্য ভান্ডারের ব্যবসায়ী আসাদুল ইসলাম আসাদ জানান, কৃষকদের কাছে যে পেয়াজ মজুত ছিল তা প্রায় শেষের দিকে। পেয়াজের ঘাটতি রয়েছে। ১০/১৫ দিনের মধ্যে পুরাদমে নতুন পেয়াজ আসা শুরু করবে। তখন বাজার নিয়ন্ত্রনে চলে আসবে। তিনি আরো জানান, তাছাড়া, বর্তমানে সার-বীজ প্রভৃতির যে দাম বেশি, তাতে যদি কৃষক পেঁয়াজ বিক্রিতে দাম বেশি না পায়, তবে চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।
যমুনা বানিজ্য ভান্ডারের ব্যবসায়ী বোরহান উদ্দিন জানান, কৃষকরা যে পেঁয়াজ মজুত করে রেখে ছিল, তা প্রায় শেষের দিকে। ক্রমশই কৃষকদের কাছে মজুত করা পেঁয়াজ কমে আসছে। পেয়াজের সংকট , মুকামে দাম বেশি। তারই প্রভাব পড়ছে পাইকারি ও খুচরা বাজারে। সামনে বাজারে নতুন কালি পেয়াজ আসা পুরাদমে শুরু করলে বাজার নিয়ন্ত্রন ও দাম কমে আসবে।
খুলনা নিউ মার্কেটের খুচরা ব্যবসায়ী কালু জানান, কি কারণে হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে জানিনা। পাইকারি বাজার থেকে ১৩০ টাকা দরে পেঁয়াজ কিনেছি, বিক্রি করছি ১৪০-১৪৫ টাকা দরে প্রতি কেজি। দাম তো আর আমাদের হাতে নেই। পাইকারি বাজার হতে যে দামে কিনি, সামান্য লাভে বিক্রি করি। যখন দাম কমবে,তখন কম দামে বিক্রি করবো।
নগরীর ময়লাপোতা বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী রহমত জানান, সোনাডাঙ্গা পাইকারি বাজার হতে বাছাই করা পেঁয়াজ ১৩০ টাকা কেজি দরে কেনা লাগছে। এরপর খরচ আছে, খুচরা ১৪০ টাকা দরে বিক্রি করছি। যে সময় যেমন কেনা, সেই সময় সময় তেমন দামে বিক্রি করি। রাখি বা মজুতের কারণে বর্তমানে পেয়াজের দাম বেড়েছে।
এ বিষয়ে নাগরিক সমাজ খুলনার সাঃ সম্পাদক এড. মো. বাবুল হাওলাদার জানান, আমাদের কাছে মনে হয় এই সিন্ডিকেটের শিকড় অনেক গভীরে। প্রশাসনের যে শাখাগুলো বা বাজার মনিটরিংয়ের দায়িত্বে যারা আছেন তারাও এদের দ্বারা কোনো কোনো ভাবে প্রভাবিত। এছাড়া প্রশাসনেরও গাফিলতি আছে। এই সিন্ডিকেট বা কালো বাজারিরা জনগণকে জিম্মি করে তারা নিজেরা একটা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। সিন্ডিকেটের মাধ্যেমে তারা একটা দর ঠিক করে ফেলে, সবখানে ওই দামেই বিক্রি হয়। এই সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য জেলা প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ দরকার। খুলনা জেলা প্রশাসনের একটা টাস্কফোর্স আছে, এটা দীর্ঘদিন অকার্যকর। তাদের কোনো কার্যকারিতা নাই। এটা চালু করা দরকার, বাজার কর্মকর্তা যিনি আছেন তার এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। আইন-শৃঙখলা বাহিনীর সহযোগীতায় এটি মনিটরিং করা দরকার। বিশেষ করে জেলা প্রশাসনের উচিৎ মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে দোষীদের যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা বা জরিমানা করা। এটা করা গেলে কলোবাজারি পুরাপুরি বন্ধ না হলেও কিছুটা নিয়ন্ত্রনে আসবে, সাধারন ভোক্তারা স্বস্তি পাবে।
এ ব্যাপারে সু-শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা মহানগর শাখার সাঃ সম্পাদক এড. কুদরত-ই খুদা জানান, একজন ভোক্তা হিসাবে আমরা চাই বাজার স্বাভাবিক থাকুক। সিন্ডিকেটদের যদি নিয়ন্ত্রন না করা যায়, যদি বাজার মনিটরিং জোরদার না করা যায় তবে নিয়ন্ত্রনহীন হয়ে পড়বে এটা স্বাভাবিক। পেঁয়াজের সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে ভোক্তা অধিকার ও সংরক্ষন অধিদপ্তরের কঠোর ভূমিকায় থাকতে হবে।
এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার ও সংরক্ষন খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মাদ সেলিম জানান, খুলনার নিত্যপণ্যের বাজারে আমরা নিয়মিত তদারকিসহ অভিযান অব্যহত রেখেছি। ভোক্তার অধিকার লঙ্ঘিত করলে ওই ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা হিসাবে জরিমানা আরোপসহ আদায় করা হচ্ছে। যেহেতু পেঁয়াজের মজুত সংকটকে কেন্দ্র করে দাম বৃদ্ধির বিষয়ে অবগত করা হয়েছে, এ ব্যাপারে বাজার মনিটরিং করে ব্যবস্থা গ্রহন করবো। কোনো ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান সরকার প্রদত্ত নিয়মনীতির বাইরে ব্যবসা পরিচালনা করলে তাদের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দপ্তর হতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।



