দিঘলিয়ার ইয়ার আলীর খেজুর রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির এক জীবন যোদ্ধা

দিঘলিয়া প্রতিনিধি ঃ দিঘলিয়া উপজেলার দিঘলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ইয়ার আলী। শীতের শুরু হলেই তার জীবন যাত্রা শুরু হয় খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা এবং গুড় তৈরি করে বিক্রি করেই সংসার খরচ নির্বাহ করা। দিঘলিয়া উপজেলায় এক সময় ছিল খেজুর গাছে ভরপুর। খেজুর গাছ কাটার লোকেরও ছিল ছড়াছড়ি। দিঘলিয়ার ফরমাইশখানা, সুগন্ধি, দেয়াড়া, দিঘলিয়া, হাজীগ্রাম, পানিগাতী, লাখোহাটিসহ কোথাও খেজুর গাছ তোলার লোকের বসবাস ছিল। এখন আর তাদের কাউকে দেখা যায় না। তখন কথায় ছিল ‘দিঘলিয়ার যশ, খেজুরের রস।’ তবুও থেমে নেই এ পেশার মানুষের কাজকর্ম। তাই শীতের মৌসুম শুরু হতে না হতেই গাছ থেকে রস আহরণের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে দিঘলিয়া উপজেলায়। ইয়ার আলী নামের এক গাছির সঙ্গে তার জীবন চলার পথের সন্ধান খুঁজতে গিয়ে কিভাবে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করা হয় তারই সেই গল্প।
ইয়ার আলীর জীবন যাত্রা পরিচালিত হয় খেজুর রস সংগ্রহ করে। খেজুর রস সংগ্রহ করে এক ভাগ মালিকপক্ষকে প্রদান করেন আর এক ভাগ নিজে নিয়ে এলাকাভিত্তিক মানুষের কাছে বিক্রি করেন।
ইয়ার আলী তিন মাস এভাবেই তার জীবন চলে আর বাকি নয় মাস বিভিন্ন কাজে কর্মে নিজেকে জড়িয়ে পথ চলেন। শীতের আগমনে খুলনার দিঘলিয়াতে ব্যস্ত এখন খেজুর রস সংগ্রহকারী ইয়ার আলী। প্রকৃতির কোমল স্পর্শে যেন জেগে উঠেছে খেজুর গাছের অমৃত রস সংগ্রহকারীরা ।
গ্রামের পথে পথে গাছি ইয়ার আলী খুব ব্যস্ত সময় পার করছেন। তাদের হাতে ধারালো দা, মাজায় ঝোলানো টোপর ও মাটির হাঁড়ি। বিকাল বেলা নিভু নিভু সূর্যের আলোয় তারা উঠে পড়ে গাছে, হালকা করে কাটে খেজুর গাছের মগজ, যাতে নল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা রস ঝরে পড়ে রাতের নীরবতায় গাছে ঝুলিয়ে রাখা মাটির পাত্রে।
এই রসের ঘ্রাণ মিশে যায় বাতাসে, মনকে মাতোয়ারা করে তোলে এক অপরূপ স্নিগ্ধতায়।
সকালের পাখির ডাকে শুরু হয় রস সংগ্রহের মহাযজ্ঞ। গাছি ইয়ার আলী গাছের মাথায় চড়ে, দড়ি বেঁধে নিরাপদে ঝুলে থাকে, যেন তারা আকাশের সাথে মিলেমিশে একাকার। এক ফোঁটা রসও নষ্ট হতে দেয় না, হাঁড়িতে জমা হয় সেই সুমিষ্ট অমৃত রস। সন্ধ্যায় ফিরে এসে তারা গাছ পরিচর্যা করে, কেটে ফেলা অংশ বেঁধে দেয়, যাতে পরদিন আবার রসের ধারা বয়ে চলে। দিঘলিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রতিটা গ্রাম থেকে অন্যান্য জনপদ এখন রসের মহিমায় উদ্ভাসিত। রস থেকে তৈরি হয় খেজুরের গুড়।
পাতলা ঝোলা, দানাদার, পাটালি। শীত যত গভীর হয়, রস তত মিষ্টি, যেন প্রকৃতি নিজেই উপহার দেয় এই মধুর রস ও রস থেকে তৈরি বিভিন্ন প্রকার গুড়।
কিন্তু এই মধুরতার পিছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর উদ্বেগ। একসময় পথে, পুকুর পাড়ে, ক্ষেতের আইলে দাঁড়িয়ে থাকত অসংখ্য খেজুর গাছ। প্রতি বাড়িতে রসের হাঁড়ি ঝুলত, গুড় তৈরি হতো পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত রস বিক্রি হতো। গ্রামীণ জীবনের সঙ্গী ছিল এই গাছ। খেজুরপাতা থেকে তৈরি হতো পাটি, ডালপালা থেকে জ্বালানি।
ইয়ার আলী এ প্রতিবেদককে বলেন, খেজুর গাছ বর্তমানে বিলুপ্তির পথে।
যে গাছ দশ বছর রস দেয়, তার সংখ্যা দিন দিন কমছে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, যেন একটি সভ্যতার অংশ মুছে যাচ্ছে নীরবে।
ইয়ার আলীর জীবন যাত্রা পরিচালিত হয় খেজুর রস সংগ্রহ করে এক ভাগ মালিকপক্ষকে প্রদান। আর এক ভাগ নিজে এলাকাভিত্তিক মানুষের কাছে বিক্রি করা। কখনও তিনি পাটালি গুড় তৈরি করে চড়া দামে বিক্রিও করেন। এ জন্য তার কোথাও যাওয়া লাগেনা। প্রয়োজনে মোবাইলে অর্ডার দেন।

