নগর আলোকিত হচ্ছে সাড়ে ৬ কোটির প্রকল্পে!

তিন সড়কে যুক্ত হচ্ছে ৪১২ স্মার্ট লাইট ও ৯২ বৈদ্যুতিক পোল
মো. আশিকুর রহমান : খুলনা মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ তিন সড়ক আলোকিত হচ্ছে সাড়ে ৬ কোটি টাকার প্রকল্পে। সড়কগুলো হচ্ছে নগরীর শেরে বাংলা রোড (ময়লাপোতা থেকে গল্লামারী মিড আইল্যান্ড পর্যন্ত), কেডিএ এভিনিউ (শিববাড়ি থেকে রয়্যাল মোড় পর্যন্ত) এবং যশোর রোড (খুলনা থানার মোড় থেকে নগর ভবন, কেডি ঘোষ রোড, বিভাগীয় কমিশনারের বাংলো থেকে কাস্টমস ঘাট হয়ে ডাকবাংলা মোড় পর্যন্ত)। এ তিন সড়কে স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে কোভিড-১৯ রেসপন্স এন্ড রিকভারী (এলজিসিআরআর) প্রকল্পের আওতায় মোশন সেন্সর সার্ভার বেজ এলইডি র্স্মাট লাইট ও পোল স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৪৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে প্রকল্পের অনুমোদন মিলেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) এ মাসের শেষের দিকে দরপত্র আহবান করবে বলে জানিয়েছে।
এর আগে সর্বশেষ মহানগরী এলাকার ২২টি মোড়ে কেসিসির সৌন্দর্য্য বর্র্ধনের কাজ করার কথা থাকলেও ১৮টি মোড়ে আলোকবাতির কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ওই প্রকল্পের আলোকবাতি স্থাপনে ১ কোটি ২১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে খুলনা মহানগরীর চার লেনে উন্নীত হওয়া ময়লাপোতা থেকে গল্লামারী হয়ে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত সড়কটি অন্ধকারাচ্ছন্ন রয়েছে। সন্ধ্যা নামতেই চারিদিক ভূতুড়ে অন্ধকারে ঢেকে যায়। ওই সড়কে বৈদ্যুতিক লাম্পের আলোর বিপরীতে যানবাহনের হেডলাইটের আলো-ই একমাত্র পথচেনা ও চলাচলের উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ময়লাপোতা মোড় পার হয়ে জোহরা খাতুন স্কুল, হাজিবাড়ী মোড়, কমার্স কলেজ হোস্টেল, তাবলীগ মসজিদ, এসওএস স্কুল, লায়ন্স স্কুল, গল্লামারী ব্রীজ থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত সড়কের অন্ধকারে রয়েছে। ফলে একদিকে যেমন দুর্ঘটনা ও অপরাধ প্রবণতামূলক কর্মকা-বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি কর্মব্যস্ত নগরবাসীর ঘরে ফিরতে চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণ হিসাবেও কাজ করছে।
কেসিসির গুরুত্বপূর্ণ এই শেরে বাংলা সড়কে বাস্তবচিত্র নিয়ে খুলনার বহুল প্রচারিত দৈনিক প্রবাহ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি আরো দৃষ্টিগোচর হয় এবং অবশেষে প্রকল্প অনুমোদনে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশাও পূরণ হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের বিদ্যুৎ বিভাগ শহরকে আলোকিত রাখতে ২৮ হাজারের অধিক বিদ্যুৎবাতি সরবরাহ করে (লাইট জ¦লে)। তবে মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ শেরে বাংলা রোড ময়লাপোতা থেকে গল্লামারী মিড আইল্যান্ড পর্যন্ত সড়কে আলোর স্বল্পতা দুরীকরণ ও বৈদ্যুৎতিক পোল স্থাপনের লক্ষ্যে এই প্রকল্পের আওতায় ৮৬ টি পোল ও ৪১২টি মোশন সেন্সর সার্ভার বেজ এলইডি র্স্মাট লাইট স্থাপন করবে। একই সাথে কেডিএ এভিনিউ’এর শিববাড়ি থেকে রয়্যাল মোড় পর্যন্ত এবং যশোর রোডস্থ খুলনা থানার মোড় থেকে নগর ভবন, কেডিএ ঘোষ রোড, বিভাগীয় কমিশনারের বাংলো থেকে কাস্টমস ঘাট হয়ে ডাকবাংলা মোড় পর্যন্ত সড়কে বরাদ্দের বাকি পোল ও মোশন সেন্সর সার্ভার বেজ এলইডি র্স্মাট লাইট স্থাপন করা হবে। ওই স্থানসমূহে নতুন বাতি স্থাপনের পর পুরাতন বাতিগুলোকে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে প্রতিস্থাপনেরও উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ।
সূত্র আরো জানিয়েছে, কেসিসি খুলনা মহানগরীকে ঢেলে সাজাতে কোনো না কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এরই ধারাবাহিকতায় খুলনা মহানগরী এলাকার ২২টি মোড়ে কেসিসির সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু ১৮টি মোড়ে আলোকবাতির কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ওই আলোকসজ্জায় সংশ্লিষ্ট প্রকল্প থেকে ১ কোটি ২১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। যার মধ্যে সংযোজন করা হয়েছে ডাবল এলার্ম স্ট্রিট লাইট, ডাবল এলার্ম গার্ডেন লাইট, সিঙ্গেল এলার্ম গার্ডেন লাইট, ডিভাইডার স্ট্রিট লাইট ও হাই মাস্ট লাইটসমূহ। যা মোড়গুলোর সৌন্দ্যর্যবর্ধনকে আলোকিত করে আরো দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে। ইতোমধ্যে দৃশ্যমান এই আলোকবাতি নগরবাসীর প্রশংসা কুঁড়িয়েছে।
জিরো পেয়েন্ট এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হাফিজুল জানান, সন্ধ্যা নামলেই গল্লামারী থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত পোলে বাতি জ¦লে না। এতো বড় গুরুত্বপূর্ণ সড়কে লাইট জ¦লে না, এ নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। প্রায় প্রতিনিয়তই ওই অন্ধকারাচ্ছন্ন সড়কে আলোর স্বল্পতার কারনে দুর্ঘটনা ঘটে। শুনেছি কেসিসি লাইট লাগনো ও খাম্বা বসানোর উদ্যোগ গ্রহন করছে। এটি বাস্তবায়ন হলে পথচারীরা নিরাপত্তার সাথে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবে।
আক্তারুজ্জামান নামের এক পথচারী জানান, দীর্ঘদিন ধরে শেরে বাংলা রোডটিতে ভূতুড়ে অবস্থা বিরাজ করছে। এখন এই সড়কে লাইট ও পোল বসানোর জন্য মোটা অংকের টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে এবং কাজেরও নাকি অনুমোদন হয়েছে। এটি খুলনাবাসীর জন্য খুশির খবর। বেসরকারি চাকুরীজীবি রিপন জানান, মোটর সাইকেলযোগে খুলনার একটি শো-রুমে চাকুরীর জন্য প্রতিদিন ডুমুরিয়া এলাকা হতে আসি। কাজ শেষ হয় রাত সাড়ে ১০ টার দিকে বাড়ী ফেরার উদ্দেশ্যে ময়লাপোতা মোড় থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত অনেকটা ভূতুড়ে অবস্থা বিরাজ করে, এতোটাই অন্ধকার। আর এখন শীতের রাত, সন্ধ্যার পর থেকে রাস্তা ফাঁকা হতে থাকে। এছাড়া খুলনায় প্রায় প্রতিদিনই খুন লেগেই আছে। অন্ধকার সড়ক দিয়ে বাড়ী ফেরার পথে খুব বেশি ভয় লাগে, নিরাপত্তাহীনতায় থাকতে হয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’র এর খুলনা মহানগর সাঃ সম্পাদক এড. কুদরই খুদা বলেন, কেসিসি আলোকবাতি বৃদ্ধি করছে এটা নগরবাসীর জন্য সু-সংবাদ, যদি সেটি যথাযথ মানসম্মতভাবে স্থাপন করা হয়। প্রকল্পে পোল বসে, লাইট দেওয়া হয়, তবে সেটি জ¦লে না, এমনটি যেন না হয় সেদিকে সংশ্লিষ্টদের সার্বক্ষনিক মনিটরিং করা উচিৎ। রক্ষণাবেক্ষন ও তা পর্যবেক্ষনের জন্য একটি সেটআপ বা জনবল আছে তাদেরও সঠিকভাবে মনিটরিং করতে হবে।
এ বিষয়ে কেসিসির বিদ্যুৎ বিভাগের উপ-প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নগরবাসী যেন শহরে স্বাচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারে, সে কারনে সর্বত্র আলোকবাতি প্রদান করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। অভিযোগ পেলে সাথে সাথে ব্যবস্থা গ্রহনের চেষ্টা করি। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা শেরে বাংলা রোডে পর্যাপ্ত পোল ও আলোকবাতির ব্যবস্থাসহ কেডিএ এভিনিউ ও যশোর রোডে পোল ও আলোকবাতি স্থাপন ও প্রতিস্থাপন করা হবে। প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ওই প্রকল্পটির ইতোমধ্যে অনুমোদন মিলেছে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হবে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নাজমুস সাদাত মো. জিল্লুর রহমান জানান, স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে কোভিড-১৯ রেসপন্স এন্ড রিকভারী (এলজিসিআরআর) প্রকল্পটি প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে অনুমোদন মিলেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হবে।
এ বিষয়ে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মো. মশিউজ্জামান খান জানান, খুলনাকে একটি আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপ দিতে সারা বছর ধরেই কেসিসি উন্নয়নের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। এরই ধারাবাহিকায় (এলজিসিআরআর)’ প্রকল্পের আওতায় এবার খুলনার গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সড়কে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪১২টি আধুনিক ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী লাইট ও ৯২টি পোল স্থাপন করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন পর হলেও এ কার্যক্রমকে নগরবাসী ইতিবাচক হিসাবে দেখবে। দ্রুত টেন্ডার আহ্বান ও কাজ শুরু হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।



