সুদের ফাঁদে নিঃস্ব একটি পরিবার। ঋণ শোধের পরও ৭ লাখ টাকার দাবি

শরিফুল ইসলাম (দিদার), মোল্লাহাট ঃ নিজের বসতভিটায় থেকেও যেন বাস্তহারা। রাত নামলেও ঘুম আসে না, দিনের আলোতেও স্বস্তি নেই। যে জমিতে ফসল ফলেছে বছরের পর বছর, সেই জমি হারানোর ভয় তাড়া করছে প্রতিনিয়ত।
বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার দড়ি উমাজুড়ী গ্রামের দুই সহোদর বিজয় মন্ডল ও কৃষ্ণপদ মন্ডলের আজকের বাস্তবতা এমনই।
অভিযোগ উঠেছে, সুদের টাকা নিয়ে সুদ সমেত আসল পরিশোধ করার পরও পড়েছেন ভয়ংকর এক সুদের ফাঁদে। ব্ল্যাংক স্ট্যাম্প দেখিয়ে এখন তাদের কাছে দাবি করা হচ্ছে ৭ লাখ টাকা। টাকা না দিলে বাড়িঘর ও ঘের দখল সহ প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
সম্প্রতি ভুক্তভোগীরা চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে অভিযুক্তরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় পরিবারটি চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবার দুটি জানায়, প্রায় নয় বছর আগে ঘের ও জমিজমা সংক্রান্ত কাজে তারা স্থানীয় কয়েকজনের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা ধার নেন। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর ৯০ হাজার টাকা সুদ দেওয়ার কথা ছিল। দুই ভাইয়ের দাবি, তারা টানা প্রায় ছয় বছর নিয়মিত সুদের টাকা পরিশোধ করেছেন।
পরবর্তীতে জমি ও ঘের বন্ধক রেখে মূল ৩ লাখ টাকাও পরিশোধ করেন। কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি গল্প। সুদের অজুহাতে আবারও টাকা দাবি করা শুরু হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রায় ছয় মাস আগে স্থানীয়ভাবে তাদের আটকে রেখে তিনটি ব্ল্যাংক স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক সই করিয়ে নেওয়া হয়। এখন সেই স্ট্যাম্পই হয়ে উঠেছে নতুন অস্ত্রেরদোহাই দিয়ে ৭ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে।
এবিষয় বিজয় মন্ডল বলেন, আমরা সব টাকা শোধ করেছি। তারপরও নতুন করে ৭ লাখ টাকা চাওয়া হচ্ছে। টাকা না দিলে ঘরবাড়ি ছেড়ে দিতে বলছে। মেরে ফেলার হুমকিও দিচ্ছে। পরিবার নিয়ে আমরা চরম আতঙ্কে আছি।
তার ভাই কৃষ্ণপদ মন্ডলের কণ্ঠেও একই আতঙ্ক আইন না জানার সুযোগ নিয়ে আমাদের দিয়ে স্ট্যাম্পে সই করানো হয়েছে। আমরা কোনো অপরাধ করিনি। তবু প্রতিদিন হুমকি পাচ্ছি। আমাদের জমি আর জীবন দুটোই আজ বিপন্ন। এদিকে গোপাল মন্ডল বলেন, কৃষ্ণপদ মন্ডলের জমি তার কাছে বন্ধক রয়েছে এবং সেই জমি বন্ধক রেখেই সুরেশ বৈরাগীর হাতে ৩ লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয়।
সুরেশ বৈরাগী দাবি করেন, তিনি শুধু টাকা পৌঁছে দিয়েছেন, নিজে কোনো টাকা রাখেননি।
অন্যদিকে পলাশ হীরা সুদের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি সুদে টাকা দিইনি। জমি বন্ধক রেখে টাকা দেওয়া হয়েছিল। স্ট্যাম্পে তারা স্বেচ্ছায় লিখিত দিয়েছে। যদি সবকিছু স্বেচ্ছায় হয়ে থাকে, তবে টাকা শোধের পর নতুন করে ৭ লাখ টাকা কেন? আর ব্ল্যাংক স্ট্যাম্পে সই করানোর অভিযোগই বা এলো কীভাবে? প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছে সংখ্যালঘু পরিবারটি।
এ বিষয়ে চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার এর অফিসিয়াল মুঠোফোনে (০১৭৩৩৩৬০২৩৫) একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেনি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সুদের দৌরাত্ম্য ও প্রভাবশালীদের চাপের কাছে সাধারণ মানুষ দিন দিন আরও অসহায় হয়ে পড়ছে। একটি প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সুদের ফাঁদে আর কত মানুষ এভাবে সর্বস্বান্ত হবে?

