স্থানীয় সংবাদ

ধারাবহিকতা রাখতে চায় জামায়াত, পুনরুদ্ধারে তৎপর বিএনপি

খুলনা-৬ আসন

পর্যটন কেন্দ্র, হাসপাতাল ও টেইসই বেড়িবাঁধসহ নানা প্রতিশ্রুতি প্রার্থীদের
টেকসই বেড়িবাঁধ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন দাবি ভোটারদের

কামাল মোস্তফা ঃ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেষ্টিত উপকূলীয় জনপদ কয়রা-পাইকগাছায় (খুলনা-৬) বইছে নির্বাচনী হাওয়া। আসনটি থেকে চারটি দলের প্রার্থী অংশ নিলেও নির্বাচনী মাঠে দৃশ্যমান কেবল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামির প্রার্থী ও সমর্থকদের প্রচার-প্রচারণা। ভোটারদের ভোট টানতে ব্যস্ত প্রতিশ্রুতির পসরা নিয়ে। তবে টানা তিনবার আওয়ামীলীগের প্রার্থী সংসদ সদস্য থাকায় উভয় দলের প্রার্থীরাই নিজস্ব ভোট ব্যাংকের বাহিরে আওয়ামী সমর্থকদের ভোট নিজের বাক্সে টানতে নিচ্ছেন নানা কৌশল। এর আগে জোটের প্রার্থী হিসেবে জামায়াত প্রার্থী দু’বার সংসদ সদস্য থাকায় কিছুটা নির্ভার তারা। তবে বিএনপি চায় হারানো আসন পুনরুদ্বার করে দলীয় অবস্থান আরো শক্তিশালী করতে। জামায়াত চায় অতীতের ধারাবহিকতা।
খুলনা-৬ আসন :
খুলনা-৬ আসন পাইকগাছা ও কয়রা নিয়ে গঠিত। জাতীয় সংসদের ১০৪ নম্বর আসন খুলনা-৬। জেলা নির্বাচন অফিসের গত বছরের নভেম্বর মাসের তথ্য মতে, এ আসনটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১৮ হাজার ৭৩৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১০ হাজার ২০৯ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৮৫ হাজার ২৪ ও হিজড়া ভোটার ১ জন। এ আসনে মোট ভোট কেন্দ্র রয়েছে ১৫৫টি।
খুলনা-৬ আসনে লড়বেন যারা : আসনটিতে বৈধ চার প্রার্থী হলেন-বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দলের প্রার্থী জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব মনিরুল হাসান বাপ্পী, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের মোঃ আছাদুল্লাহ ফকির এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রশান্ত কুমার মন্ডল।
ভোটের মাঠের চিত্র : বিগত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী সংসদ সদস্য হয়। সর্বশেষ ২০২৪ এর ডামি নির্বাচনে এমপি হন রশীদুজ্জামান। বর্তমানে দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় তাদের ভোটারদের টানতে তৎপর বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা। এর আগে দুই দফায় জামায়াতে ইসলামির এমপি থাকায় এই এলাকায় তাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। জামায়াত মনোনিত প্রার্থী বহু বছর ধরেই এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত রয়েছেন। এদিকে বিএনপি প্রার্থীসহ নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবেই ভোটের মাঠে আছেন। অতীত গৌরব ফেরাতে দিনরাত প্রচার প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে উভয় দলের কিছু নেতাকর্মীদের বেপরোয়া কর্মকান্ডে নাখোস ভোটাররা।
প্রার্থীদের যা বলছেন : জামায়াতে ইসলামির প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, দুর্নীতি ও জুলুমমুক্ত একটি সমাজ বিনির্মাণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি অঙ্গীকারবদ্ধ। এবার ভোটাররা ঠিক এমন একটি দেশ চায়, যেখানে চাঁদাবাজি, খুন, রাহাজানি থাকবে না। আমার দল সেরকম মেসেজ নিয়ে জনগণের কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে।
বেড়িবাঁধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উপক’লীয় এলাকার প্রধান সমস্যা বেড়িবাঁধ। আমি নির্বাচিত হলে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবো। অতীতে বিভিন্ন সময়ে এ অঞ্চলের মানুষ টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে প্রতারণার শিকার হয়েছে। এ অঞ্চলের সন্তান হিসেবে আমি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে চাই। পাশাপাশি এলাকার চাহিদা ও প্রয়োজনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হবে।
আগামী নির্বাচনে জনগণ কেন আপনাকে ভোট দেবে জানতে চাইলে আবুল কালাম আজাদ বলেন, বহু বছর ধরে আমি এই অঞ্চলের মানুষের সাথে চলছি। তাদের সুখে-দুঃখে পাশে থেকেছি। তারা আমাকে চিনে জানে। মানুষ যে পরিবর্তন চায় সেটা পূরণে জামায়াতে ইসলামি সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছে। মানুষ সৎ মানুষকে ভোট দিবে।
বিএনপি মনোনিত প্রার্থী মনিরুল হাসান বাপ্পী বলেন, সুন্দরবন সংলগ্ন উপক’লীয় অঞ্চল কয়রা-পাইকগাছার মানুষ বরাবরই বঞ্চিত,অবহেলিত। উন্নয়নের ছোঁয়া এখানে কখনো লাগেনি।
এ অঞ্চলের উন্নয়ন বিষয়ে তিনি বলেন, আমি নির্বাচিত হলে এখানে একটি পর্যটন কেন্দ্র, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, টেইসই বেড়িবাঁধ, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, সুন্দরবনের বনদস্যু নিমর্ুূল এবং জনগণের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে চাই।
নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে বাপ্পী বলেন, উপক’লীয় এ আসটিতে অতীতে জামায়াত যতবার নির্বাচিত হয়েছে জোটের প্রার্থী হিসেবেই হয়েছে। এককভাবে কখনো নির্বাচিত হননি। এ অঞ্চলে বিএনপির বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে। জোটের কারণে অতীতে আসনটি ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এবার বিএনপির প্রতি মানুষের যে আস্থা তাতে আমার বিশ^াস আমরা জয়লাভ করবো।

ভোটারদের ভাবনা : ভোটারদের একটি বড় অংশ বলছেন, অতীতে বিশেষ করে গেল ১৬ বছর আমাদের ভোট ছাড়াই এই এলাকার প্রতিনিধি নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক দূর্যোগপ্রবণ এ আসনটিতে যারাই এমপি হয়েছে তারা মূলত লুটপাট করেছে। জেলা শহর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। এই এলাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা টেকসই বেড়িবাধ। আজ অব্দি সেটার স্থায়ী সমাধান কেউ দিতে পারেনি। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চাওয়ার জায়গা থাকবে টেকসই বেড়িবাধ ও উন্নত রাস্তা। যে প্রার্থী সেই আস্থার জায়গায় আসতে পারবে, আমরা যাকে বিশ^াস করতে পারবো এমন প্রার্থীকেই ভোট দেবো। তবে বহিরাগত কোন প্রার্থীকে আমরা আমাদের প্রতিনিধি হিসেবে চাই না।
খুলনা-৬ আসনের বিগত নির্বাচনের ফলাফল : স্বাধীনতার পর আসনটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী স.ম বাবর আলী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী শেখ রাজ্জাক আলী ৩৪,০৫৯ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালের ৭ মে নির্বাচনে সীমানা পরিবর্তনের পর জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোমিন উদ্দিন, ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জহুরুল হক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শাহ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস ৫৮,৩৬৯ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে খুলনা-৬ আসনটি শূন্য থাকে, কোনো প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হননি।
১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত পুনর্র্নিবাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ মো. নূরুল হক, ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শাহ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের প্রার্থী সোহরাব আলী সানা, ২০১৪ সালে শেখ মো. নূরুল হক, ২০১৮ সালে প্রার্থী আক্তারুজ্জামান বাবু ও সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. রশীদুজ্জামান খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button