নগরীতে মসজিদের নামে অবৈধ ফুড কর্নার, গাড়ী পার্কিং জোন

# ভাড়ার নামে চাঁদার টাকা এক বিএনপি নেতার পকেটে
# পার্কিং লটের কর্মিদের দুর্ব্যবহারে অতিষ্ট নগরবাসী
# কেডিএ তে অভিযোগ
এম সাইফুল ইসলাম ঃ খুলনা নগরীর নিউ মার্কেট এলাকায় বায়তুন নূর মসজিদের নিচে গড়ে উঠছে ভাসমান ফাস্টফুড ও পার্কিং জোন। কেসিসি ও কেডিএ’র আওতাধীন এলাকায় গড়ে ওঠা এই অবৈধ ভাসমান মার্কেট জনভোগান্তির কারণ মনে করছেন নগরবাসি। মোটরসাইকেল পার্কি জোনের আশপাশে মোটরসাইকেল বা কার রাখলেই তেড়ে আসে পার্কিং কর্মিরা। ফাস্ট ফুডের দোকান থেকে টাকা আদায় বা গাড়ি পাকির্ং এর কোন রসিদ না দেওয়ায় এগুলোকে অবৈধ বলছে সাধারণ মানুষ।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিউ মার্কেট ঘিরে রয়েছে গাড়ি পার্কিং জোন। এটি কেডিএ’র আওতাধীন। কেডিএ এটিকে ইজারা দিয়েছে। যেখানে দশ টাকা থেকে শুরু করে গাড়ি ভেদে একশ টাকা নিচ্ছে ইজারাদার। এতে করে পথচারী ও যানবাহন চলাচলে সময় যানজট সৃষ্টিসহ দুর্ঘটনা ঘটছে। স্থানীয়রা এটাকে অবৈধ ও জনভোগান্তির কারণ হিসেবে আখ্যা দিলেও কর্তৃপক্ষের নেই মাথাব্যাথা। পার্কিং লটের পাশে একজন প্রবীন সাংবাদিক তার প্রাইভেট কারটি ১০ মিনিটের জন্য মার্কেটে গেলে কারের ড্রাইভারের কাছ থেকে পার্কিং জোনের কর্মচারিরা জোর করে ৫০টাকা আদায় করে। তারা সাংবাদিক গোনেনা এমন মন্তব্য করায় সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এছাড়াও স্থানীয়দের দাবি, মসজিদের নামে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হলেও এর সঠিক হিসাব বা ব্যবহারের কোনো স্বচ্ছতা নেই। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ফুটপাতের উপর সারি সারি ভাসমান দোকান বসিয়ে বিভিন্ন ধরনের ফাস্টফুড বিক্রি করা হচ্ছে। এতে পথচারীদের চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অপরদিকে খাবার স্বাস্থ্যসম্মত কিনা এ নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
সুত্রমতে জানা যায়, নিউ মার্কেট এলাকায় সর্ববৃহৎ মসজিদ বায়তুন নূর। মসজিদের নিচে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকান থেকে তোলা ভাড়া খরচ হয় এ মসজিদের উন্নয়নে। এ মসজিদের দীর্ঘদিন একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করেছেন এ ওয়ার্ডের কমিশনার হাফিজ বিশ্বাস। তিনি ই ভাড়া তুলতেন এখান থেকে। তবে টাকা কোথায়, কিভাবে খরচ হতো তার কোন হিসেব ছিলো না। পাঁচ আগষ্ট পরবর্তী সময়ে কমিশনার আত্মগোপনে গেলে সভাপতির দায়িত্ব নেন ওয়ার্ড বিএনপি নেতা ও ফেনসিডিলসহ গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি মোঃ ফারুক হোসেন। বর্তমানে এখান থেকে তিনি ই ভাড়ার নামে অবৈধ চাঁদা তুলছেন। তবে টাকা কেসিসির রাজস্বখাতে যায় বললেও কোন দোকানি-ই পায়না সিটি কর্পোরেশনের রশিদ। সুত্রমতে গত মাসে ৭০টি দোকান থেকে ১১০ টাকা করে তোলা হয়েছে। যা থেকে স্টাফদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, আদায়কারি বিল, ওয়াসার পানির বিল, ফটোকপি ও বিবিধ বিল দিয়ে বেচে যায় প্রায় লক্ষাধিক টাকা। মসজিদের কো চেয়ারম্যানের পরিচয় দেয়া স্থানীয় বিএনপি নেতা মোঃ ফারুক হোসেন দাবী করেন বেচে যাওয়া টাকা মসজিদের ফান্ডে রাখা হয়েছে। তিনি আরও জানান, আমি মসজিদের কো চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছি। প্রতিদিন ১১০ টাকা করে ভাড়া বাবদ নেয়া হয়, যা মসজিদের কল্যাণে খরচ করা হয়। এছাড়া বিদ্যুৎ বিল ও পরিচ্ছনতাকর্মি বিল নেয়া হয়। বেচে যাওয়া টাকা মসজিদের ফান্ডে রাখা হয়। অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানে গরীব মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারো ভোগান্তির হওয়ার কথা নয়।
কেডিএ নিউ মার্কেট কমিটির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য আঃ গফ্ফার বিশ্বাস বলেন, নিয়মত পৌরকর দিয়েও ব্যবসা করতে পারছেন না তারা। অপরদিকে কোন ভাড়া কিংবা রাজস্ব না দিয়েই একটি মহলকে চাঁদা দিয়ে ফুটপাতে ব্যবসা করে যাচ্ছে ভাসমানরা যা প্রকৃত ব্যবসায়ীদের ক্ষতি করছে। এ নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে অভিযোগ ও সরেজমিন পরিদর্শনের আহবান জানিয়েছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন দোকানদার জানান, ব্যবসা চালিয়ে যেতে হলে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নিয়মিত দিতে হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানদার বলেন, আমার ছোট দোকান, তাই প্রতিদিন এক’শ টাকা করে দিই। টাকাটা নেন বিএনপি নেতা ফারুক। এ টাকা মসজিদের কল্যাণে ব্যবহার হয় বলে জানিয়েছেন কেডিএ ও কেসিসির কর্মকর্তাবৃন্দ। কেডিএর পরিচালক মোঃ ইকবাল হোসেন বলেন, ভাসমান মার্কেটের একটি অংশ কেডিএর আওতাধীন। নিয়ম মেনে ইজারা দেওয়া হয়েছে। বাকি কেসিসির অংশ মসজিদ কমিটি পরিচালনা করছে। যতদুর জানি মসজিদের কল্যানে খরচ করা হয় এ অর্থ। কেসিসির নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ জানান, কেসিসির আওতাধীন মসজিদটি। কোন অব্যবস্থাপনা থাকলে খোঁজ নিয়ে খুব দ্রুত নিরসন করা হবে। এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর নজরদারি নেই।
বায়তুন নূর মসজিদের ইমাম জানান, দোকান নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই আমার। কারণ এটা কমিটি কর্তৃক পরিচালিত। তিনি আরও জানান, কমিটির দায়িত্বে রয়েছে স্থানীয় বিএনপি নেতা ফারুক। সুজনের মহানগর সেক্রেটারি প্রফেসর রমা রহমান জানান, চাঁদাবাজির অভিযোগ সত্য প্রমানিত হলে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় কেডিএ ও সিটি কর্পোরেশনের আরও কার্যকরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, মসজিদ কমিটির স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। সেখানে অবশ্যই ধার্মিক লোক থাকতে হবে। অভিযোগ আসছে মসজিদ কমিটিতে মাদক কারবারিরা রয়েছে। যদি অভিযোগ সত্য প্রমানিত হয় তাহলে তাকে অপসারন করা হোক এবং যোগ্য ব্যক্তিকে পদ দেওয়া হোক। কোন মাদক কারবারি মসজিদ কমিটির দায়িত্বশীল হতে পারে না। দেশের সার্বিক উন্নয়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির প্রয়োজন।



