স্থানীয় সংবাদ

আমার ভায়ের রক্তে রাঙ্গানো

১৯৪৮ সালে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে করাচিতে গণপরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ অধিবেশনে ভাষা প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের বেশির ভাগ সদস্যই সরকারি প্রস্তাবের ওপর সংশোধনী বক্তব্য রাখেন। তারা বলেন, রাষ্ট্রভাষা সেই ভাষা-ই হওয়া উচিত, বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ যে ভাষা ব্যবহার করেন। যদি ২৯ নং বিধিতে ইংরেজি ভাষা সম্মানজনক স্থান পেতে পারে- পরিষদের কার্যাবলি উর্দু এবং ইংরেজির মাধ্যমে চলতে পারে; তবে বাংলার ৪ কোটি ৪০ লাখ লোকের ভাষা কেন সম্মানজনক স্থান পাবে না? কাজেই এ ভাষাকে প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে নয়, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হোক, প্রস্তাবটি সরকারি বেশির ভাগ সদস্যদের বিরোধিতার মুখে অগ্রাহ্য হয়। এদিকে গণপরিষদে বাংলা ভাষার দাবি অগ্রাহ্য হওয়ার পর ঢাকায় বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। সিদ্ধান্ত নেয়া হয় আন্দোলন গড়ে তোলার। তমদ্দুন মজলিসসহ বিভিন্ন সংগঠন ও নেতৃবৃন্দ সংবাদপত্রে বিবৃতির মাধ্যমে জনগণকে সংগ্রামে এগিয়ে আসার আবেদন জানান। গড়ে ওঠে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ও বাংলাভাষা প্রচার তহবিল। সংগ্রামের প্রয়োজনে পরিষদের কলেবর বৃদ্ধি করে ১৯৪৮-এর ৭ মার্চ ঢাকায় ধর্মঘট এবং ১১ মার্চ দেশের সর্বত্র সাধারণ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ আন্দোলনের পরতে পরতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব লক্ষ্যে পৌঁছানোর ইতিহাস সুবিদিত। তার আত্মজীবনী, কারগারের জীবনকথা এবং পাকিস্তান সরকারের গোপন ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের রিপোর্ট ইতিহাসের অনন্য দলিল এবং এর সপক্ষের সাক্ষ্য। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তখন পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল। তিনি ১৯ মার্চ বিকেলে ঢাকায় আগমন করেন। ২১ মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে এক সংবর্ধনা সভায় তিনি ঘোষণা করেন- ‘একমাত্র উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে।’
বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ১১ মার্চ ১৯৪৮ আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশিষ্টজনদের কথায় ১১ মার্চের আন্দোলন না হলে ’৫২-এর আন্দোলন হতো না। ’৪৮-এর ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষার দাবি নিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়- ’৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারিতে তা পূর্ণতা পায়।
ভাষা সৈনিকদের মতে, ’৪৮ সালের ১১ মার্চ ছিল ভাষা সংগ্রামের ইতিহাসে প্রথম সংগঠিত গণবিক্ষোভ। সভা-শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ-মিছিল ছাত্র-ছাত্রীদের পিকেটিং এবং পুলিশের লাঠিচার্জের ফলে ঢাকা শহর বিক্ষোভের নগরীতে পরিণত হয়। গ্রেপ্তার ও পুলিশি জুলুমের প্রতিবাদে ১২, ১৩ ও ১৪ মার্চ, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়।
২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়েও তিনি বলেন, ‘এটা আমার বিশ্বাস যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হওয়া উচিত।’ বছর চারেক পর ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পল্টনের এক জনসভায় খাজা নাজিম উদ্দিন পুনরায় ঘোষণা করলেন ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’ এ ঘোষণা ছিল প্রকৃতপক্ষে আগের চুক্তির খেলাপ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button