স্থানীয় সংবাদ

নানা বঞ্চনার মধ্যে দিয়ে বেঁচে আছে কয়রার বাঘ বিধবা নারীরা

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস

রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা) ঃ নানা সংকট আর সমস্যাজনিত ঘাত প্রতিঘাত ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সুন্দরবন সংলগ্ন জনবসতির আশপাশের এলাকায় বিগত দিনের তুলনায় বাঘের আনাগোনা কমে গেছে। তবে তাই বলে বাঘের শিকারে পরিণত হওয়া মানুষের স্ত্রীদের কপালের দুর্ভোগ কমেনি। মাছ, গোলপাতা, মধু বা কাঠ সংগ্রহে সুন্দরবনের ভেতরে গিয়ে বাঘের থাবায় প্রাণ হারানো পুরুষটিকে হারিয়ে এমনিতেই দিশাহারা জীবনযাপন করেন বিধবা নারীরা। তার ওপর আবার যোগ হয়েছে ‘অপয়া’ অপবাদ, স্থানীয়ভাবে তাদের নতুন পরিচিতি হচ্ছে ‘বাঘবিধবা’। স্বামীদের বাঘের পেটে যাওয়ার পেছনে যেন তারাই দায়ী, এমন ধারণার কারণে গ্রামের অন্যরাও সেভাবে মিশেন না তাদের সঙ্গে। তাই এক প্রকার সমাজচ্যুৎ জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন এই স্বামী হারানো নারীরা। নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনে এখন সরকারের হস্তক্ষেপ চাইছেন তারা। স্থানীয় অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই ‘বাঘবিধবাদের জীবন কাটছে দুর্বিষহ পরিবেশে। স্বামীকে হারিয়ে শিশু-সন্তানদের নিয়ে জীবনযুদ্ধে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। ডিঙ্গি নৌকায় নদীতে মাছ শিকার বা ঘেরে দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় তাদের। এভাবে কষ্টকর জীবন-জীবিকার মাধ্যমে নিজেদের-সন্তানদের বড় করছেন। কিন্তু তাদের কষ্টের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসছে না। তবে বর্তমানে কয়েক জন নারী সেলাই মেশিন ট্রেনিং শেষে কাজ করে সংসারে স্বাবলম্বী করার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আবার দুই একজন চায়ের দোকান কিংবা মুদির দোকান করে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এমনই একজন কয়রা উপজেলার ৬নং কয়রা গ্রামের নারী রোকেয়া বেগম। তিনি জানান, ২০০৮ সালে তার স্বামী আব্দুল গফ্ফার খাঁ সুন্দরবনে যান মাছ শিকারের জন্য। সেখানে গিয়ে পাটাজাল নিয়ে নৌকায় অবস্থান করছিলেন। কিন্তু এ সময় একটি বাঘ এসে তার ঘাড়ের উপর হামলে পড়ে। এই অবস্থায় তার চিৎকারে অন্যান্য জেলেরা এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। কিন্তু ততক্ষণে বাঘ তার স্বামীর ঘাড়ের উপর থেকে এক খাবলা গোশত তুলে নেয়। ফলে শেষ রক্ষা হয়নি। তখন তার সংসারে ৮ বছরের মেয়ে ও সাড়ে ৫ বছরের ছেলে। সেই থেকে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে তার জীবনযুদ্ধ শুরু হয়। নদীতে মাছ ধরে, আর দিনমজুরি করে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। স্বামী বাঘের আক্রমণে নিহতের পর কুসংস্কারের প্রভাবে তাদের অবয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ কারণে তিনি দ্বিতীয় বিয়েও করতে পারেননি। কয়রার আম্বিয়া খাতুন বলেন, ‘২৪ বছর আগে স্বামী আমজাদ হোসেন সরদার সুন্দরবনে মাছ শিকারে গিয়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান। এরপরই ৩ মেয়েকে নিয়ে শুরু হয় জীবনযুদ্ধ, যা এখনো চলছে। কিন্তু আমরা খাসজমি বরাদ্দ পাই না। সরকারি বিভিন্ন ধরনের সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করা হলেও আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। বাঘবিধবাদের জন্য সরকারের আলাদাভাবে ভাবা প্রয়োজন।’ স্বাভাবিক জীবনে পুনর্বাসনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন তিনি। ৫নং কয়রা গ্রামের আঞ্জুয়ারা, গোলেজান বিবি, হাসিনা খাতুনসহ আরও অনেকে জানান, তারা নদীতে মাছ ধরে, পরের বাড়িতে কামলার কাজ করে কোনো রকম কষ্টের মধ্যে দিয়ে বেঁচে আছে। তবে বিভিন্ন সময় এই নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ভেলেপমেন্ট (আইসিডি) নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। এর প্রতিষ্ঠাতা আশিকুজ্জামান আশিক জানান, বাঘবিধবাদের জন্য কিছু করার চিন্তা থেকে কয়রাতে তিনি কার্যক্রম শুরু করেন। অনেকের প্রশিক্ষণ দেয়াসহ সেলাই মেশিন সরবরাহ করেছেন। বাকিদের আর সহযোগিতা করতে পারেনি। এমন নারীর সংখ্যা রয়েছে কয়রায় প্রায় ১৬৫ জন। গোবরা গ্রামের বাঘবিধবা নারী লাইলি খাতুন ও লুৎফন্নে বলেন, সেলাই মেশিন পাওয়ার পর তা থেকে রোজগার করে কোনো রকম বেঁচে আছি। তারপরেও ছেলেমেয়েদের নিয়ে কষ্টে আছেন তারা। কয়রার জলবায়ু সুরক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ ফরহাদ হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিন সাংবাদিক আমিরুল ইসলাম কাগজীর উদ্যোগে আইসিডির মাধ্যমে কয়রার বাঘ বিধবাদের মাঝে বিভিন্ন ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের কার্যক্রম গ্রহন করা হয়েছে। জিয়াউর ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর সাংবাদিক আমিরুল ইসলাম কাগজী বলেন বাঘের আক্রমনে নিহত হওয়া পরিবারকে একটু আনন্দ দেওয়ার জন্য এই উদ্যোগ গ্রহন করা হয়েছে। কয়রা সদর ইউনিয়ন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এস এম লুৎফর রহমান বলেন, ‘বাঘবিধবাদের তালিকা তৈরির কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। তালিকা পূর্ণাঙ্গ করার মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়ার জন্য বর্তমান সরকারের নিকট দাবি জানান হবে।’ সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহত পরিবারের সদস্যদের একটি তালিকা স্ব স্ব স্টেশন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নেয়া হয়েছে। তাদের কীভাবে সহযোগিতা করা যায় তার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ ব্যাপারে কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, কয়রায় বাঘে ধরা পরিবারের সদস্যদের স্বাবলম্বী করার জন্য উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button