স্থানীয় সংবাদ

যশোর-খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলের টিআরএম প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নদীগুলো নাব্যতা ফিরে পাবে

# জলাবদ্ধতা মোকাবলোয় করণীয় বিষয়ক সাংবাদিক সম্মেলন #

স্টাফ রিপোর্টার ঃ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় যশোর-খুলনা-সাতক্ষীরা জেলার প্রধান সমস্যা হলো জলাবদ্ধতা সমস্যা। বিগত ৩৫-৪০ বৎসর যাবৎ এ সমস্যাটি অত্র অঞ্চলে অব্যাহত আছে। সমস্যাটি ক্রমশঃ তীব্র হচ্ছে এবং এর পরিধি ব্যাপক এলাকায় বিস্তৃত হচ্ছে। এ সমস্যাটি এখন সুন্দরবন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রায় ৬০ লক্ষ অধিবাসী এ সমস্যা দ্বারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ। সমস্যা সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে যে সব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তাতে সমস্যার কার্যকারী কোন সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না। বলা বাহুল্য, এ সমস্যার কার্যকরী সমাধান হলো জনগণ উদ্ভাবিত ও পরীক্ষিত টিআরএম বা জোয়ারাধার পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, সরকার কর্তৃক টিআরএম পদ্ধতি এখন বন্ধ রাখা হয়েছে যা পুনরায় চালু করা ছাড়া অন্য কোনভাবেই জলাবদ্ধতা মোকাবেলাা করা সম্ভব হবে না। মূল সমস্যা পলি দ্বারা নদী ভরাট হওয়া ঃ জলাবদ্ধতার মুল কারণ পলি দ্বারা নদী ভরাট হওয়া। ১৯৬০, এর দশকে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল অঞ্চলে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ, জলোচ্ছ্বাস ও প্লাবন প্রতিরোধ এবং অধিক ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে পোল্ডার ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। এ ব্যবস্থার আওতায় প্লাবনভূমি তথা বিল খাল থেকে এলাকার জোয়ার-ভাটার নদীগুলোকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। ফলে জোয়ারে আগত পলি প্লাবনভূমি বা বিলে অবক্ষেপিত হতে না পেরে তা নদীবক্ষে অবক্ষেপিত হয়ে নদীর বুক প্লাবন ভূমি থেকে উঁচু হয়ে যায়। যার ফলে বর্ষা মৌসুমের পানি পোল্ডারের মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে যায়, সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। বৎসরে ৬-৯ মাস বা কোন কোন বিল সারা বৎসর জলমগ্ন থাকে। এর ফলে দেখা দেয় নীচু বসতি এলাকায় বসবাস সংকট, ধান ও মাছ চাষে ব্যাপক বিপর্যয় এবং কর্মসংস্থানের সংকট। পলি সমস্যার কারণে উপকূলীয় নদীগুলো ক্রমশঃ মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। যশোর অঞ্চলের টেকা-মুক্তেশ্বরী, আপারভদ্রা, বুড়ীভদ্রা ও হরিহর, শিবসা ও কড়ুলিয়া নদী এবং সাতক্ষীরা জেলার কপোতাক্ষ, বেতনা, মরিচ্চাপ, সাপমারা, লাবণ্যবতী, গলঘেষিয়া ও খোলপেটুয়া প্রভৃতি নদীগুলোতে বর্ধিত হারে পলি জমে নদীগুলো দ্রুত মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। সুন্দরবনের ও নদী খালগুলোতে ব্যাপকহারে পলি জমে পরিবেশের ব্যাপক বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। অন্যদিকে, ব-দ্বীপ ভূমি ক্রমশঃ বসে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ সমস্যা তীব্র হচ্ছে। পোল্ডার ব্যবস্থার কারণে এলাকার ভূ-গঠন প্রক্রিয়া তথা ব-দ্বীপের ভূমি গঠন কাজ একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাভাবিক নিয়মে এই এলাকার পললজাত ভূমি নিজস্বভাবে বসে যায় (আর্থ সাবসিডেন্স) যা পলি দ্বারা পূরণ হতো। ভূ-গঠন কাজ বন্ধ হওয়ায় ভূমি একতরফাভাবে বসে যেয়ে ক্রমশঃ নীচু হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তজনিত কারণে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীতে পানির উচ্চতাও বৃদ্ধিপাচ্ছে। জলাবদ্ধতার সাথে উল্লেখিত দুটি কারণ যুক্ত হওয়ায় জলাবদ্ধতার তীব্রতা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি ঘটে চলেছে পরিবেশের ব্যাপক বিপর্যয়। এলাকবাসীর আশংকা এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে এলাকায় আদৌ বসবাস করা সম্ভব হবে কিনা? টিআরএম বা বিলে জোয়ার-ভাটা পদ্ধতি ঃ জলাবদ্ধ সমস্যা মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে নদী-খাল খনন, উপকূলীয় বাঁধ ও স্লুইসগেট সংস্কার, সেচের মাধ্যমে পানি পাম্প আউট পুনঃপুনঃভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু এসব কার্যক্রম দ্বারা কার্যকরী কোন ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। নদী খনন হওয়ার পর নদী ১-২ বৎসরের মধ্যে আবারও পলি দ্বারা ভরাট হচ্ছে। এলাকার জনগণ এটি উপলব্ধি করেছে যে, মূল সমস্যা হলো নদীবক্ষে পলি অবক্ষেপন। নদী খননের মাধ্যমে এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পোল্ডার পূর্বে পলি যেমন বিলের মধ্যে অবক্ষেপিত হতো সে ব্যবস্থায় পুনঃ প্রবর্তন দরকার। এতে নদী সারা বৎসর নাব্য থাকবে, জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান হবে। জনগণ কর্তৃক ১৯৯১ সালে বিল ডাকাতিয়া এবং ১৯৯৭ সালে ভবদহ অঞ্চলের হরি অববাহিকার ভায়না বিলে জোয়ার-ভাটা পদ্ধতি চালু করা হয়। সরকার কর্তৃক ভায়না বিলে একটি সমীক্ষার ভিত্তিতে এ পদ্ধতি কার্যকরী বিবেচিত হওয়ায় ২০০২ সালে বিল কেদারিয়ায়, ২০০৬ সালে খুকশিয়া বিলে এবং ২০১৫ সালে কপোতাক্ষ অববাহিকায় তালা উপজেলার পাখিমারা বিলে জোয়ার-ভাটা পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হয়, যার ফলে সংশ্লিষ্ট ঐ সব এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব হয়। কিন্তু ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এখন সব অববাহিকায় টিআরএম কার্যক্রম বন্ধ আছে। টিআরএম কার্যক্রমে বিলের ক্ষতিগ্রস্থ জমির মালিকদের জন্য ক্ষতিপূরণের বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু ক্ষতিপূরণ উত্তোলন সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতার কারণে অধিকাংশ জমির মালিক ক্ষতিপূরণ উত্তোলন করতে পারেনি। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ জমির মালিকরা টিআরএম বাস্তবায়নে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, যার জন্য টিআরএম কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে কর্তৃপক্ষ কোন উদ্যোগও গ্রহণ করছে না। বাস্তবতা হচ্ছে টিআরএম ছাড়া অন্য কোনভাবে সমস্যা নিরসন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ ঃ বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের আগামী ১০০ বৎসরের জন্য বাংলাদেশ ব দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ নামে একটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প ২০১৮ সালে ঘোষনা করেছ্ েযশোর-খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলের ৭টি নদী অববাহিকার ৩৮টি বিলে টিআরএম বাস্তবায়নের নির্দেশনা রয়েছে। নদী অববাহিকাগুলা হলো, সাতক্ষীরা জেলার বেতনা ও মরিচ্চাপ অববাহিকার ৩৮টি বিলে টিআরএম বাস্তবায়নের নির্দেশনা রয়েছে। নদী অববাহিকাগুলো হলা, সাতক্ষীরা জেলার বেতনা ও মরিচ্চাপ অববাহিকার ১১টি বিল, কপোতাক্ষ অববাহিকার ৭টি বিল, যশোর জেলার ভবদহ অঞ্চলের হরি-মুক্তেশ্বারী অববাহিকায় ৬টি বিল, আপারভদ্রা-হরিহর অবাবহিকায় ৪টি বিল, খুলনা জেলার ঘ্যাংরনাইল অববাহিকায় ৫টি হামকুড়া অববাহিকার ৫টি বিল। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ এর নির্দেশনা অনুযায়ী টিআরএম ভিত্তিক কোন প্রকল্প গ্রহণ করছে না। টিআরএম বাস্তবায়নের পরিবর্তে বার বার ব্যর্থ হলে প্রমানিত নদী খাল খনন এবং অবকাঠামো সংস্কারমূলক কার্যক্রম দ্বারা পরিস্থিতির তীব্রতা ও জটিলতা আরো বৃদ্ধি করা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, এ অঞ্চলের শেষ ভরসাস্থল শিবসা ও খোলপেটুয়া নদী। এ দুটি নদী এখন মৃত্যুপথের যাত্রী। সুতরাং টিআরএম বাস্তবায়নে কালক্ষেপন করা হলে পরিস্থিতি আগামীতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। জনগণের দাবী ঃ ১. বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ এর নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অববাহিকা সমূহে দ্রুত টিআরএম বাস্তবায়নে উদ্যোগে গ্রহণ করা। ২. টিআরএম বিলের অধিবাসীরা যাতে সহজে ক্ষতিপূরণ পায় তার ব্যবস্থা করা। ৩. সকল কার্মকান্ডে জনগণ ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন-অধ্যক্ষ আব্দুল মতলেব সরদার সভাপতি, কেন্দ্রীয় পানি কমিটি, হাসেম আলী ফকির সদস্য, কেন্দ্রীয় পানি কমিটি, মোঃ রেজাউল করিম সদস্য কেন্দ্রীয় পানি কমিটি, সেলিম আক্তার স্বপন সম্পাদক, ডুমুরিয়া উপজেলা পানি কমিটি ও সদস্য কেন্দ্রীয় পানি কমিটি, মীর জিল্লুর রহমান সম্পাদক, তালা উপজেলা পানি কমিটি। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন উত্তরণের কর্মকর্তা শেখ মোশারফ হোসেন সদস্য ডুমুরিযা, উপজেলা পানি কমিটি, এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন উত্তরণের কর্মকর্তা মোঃ মুস্তাফিজুর রহমান, মোঃ আল-আমিন মোল্লা, দিলীপ কুমার সানা ও গোলাম হোসেন পানি কমিটি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button