স্থানীয় সংবাদ

সুন্দরবনে মধু আহরণ মৌসুম শুরু

# বনদস্যুদের আতঙ্ক মাথায় নিয়েই মধু
আহরণ করতে যাচ্ছে মৌয়ালরা #

রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা)ঃ বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে আজ ১ এপ্রিল থেকে মধু আহরণ মৌসুম শুরু হচ্ছে। তা চলবে এ বছরের ৩১ মে পর্যন্ত । প্রতি বছরের মত এবারও সুন্দরবনের গভীরে গিয়ে মৌয়ালরা মধু সংগ্রহ করবেন। মৌয়ালদের হয়রানী থেকে মুক্ত করতে ইতিমধ্যে সকল প্রস্তুুতি সম্পন্ন করেছে বন বিভাগ। খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক( এসিএফ) মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, ইতিমধ্যে মৌয়ালদের পাশ পারমিট দেওয়ার বিষয়ে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। কোন মৌয়ালরা যাতে করে হয়রানীর শিকার না হয় তার জন্য সকল স্টেশন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে তাদেরকে সবাত্মক নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে।
জানা গেছে, সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলীয় উপজেলা খুুলনার কয়রা, দাকোপ ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলাকায় বিকল্প কোন
কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না থাকায় বেশিরভাগ মানুষ সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল। এ অঞ্চলের মানুষের একমাত্র আয়ের উৎস সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরা ও মধু আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করা । তবে বর্তমানে বনদস্যুদের কারণে এই প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যাচ্ছে। ফলে স্থানীয় জেলে-বাওয়ালী ও মৌয়ালদের জীবিকায় ও আর্থিক ভাবে প্রভাব পড়ছে। বুধবার ১ এপ্রিল এবার মধু আহরণের জন্য মৌসুম শুরুর প্রথম দিন সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের ২ টি রেঞ্জ থেকে অনুমতিপত্র, নৌকার (পাস) দেওয়া হবে ।এসব অনুমতিপত্র (পাস) নিয়ে মৌয়ালরা চলে যাবেন গহীন সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে মধু সংগ্রহ করতে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে গত বছর সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জে থেকে যে পরিমান (পাশ) নিয়ে মৌয়ালরা বনে মধু আহরণে গিয়েছিল। গত বছরের তুলনায় এবার অনেক হবে। এর প্রধান করণ হলো বনদস্যুদের নির্যাতনে ও মুক্তিপনের জন্য ভয়। ৪নং কয়রা গ্রামের মৌয়ালী লুৎফার রহমান বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর মধু আহরণের জন্য অনুমতি পেয়েছি। ৬ জনের বহর নিয়ে ১৫ দিনের জন্য বাজার সদয় নিয়ে রওনা হচ্ছি।কিন্তু এবছর ডাকাত দলের উৎপাত অনেক বেশ। তার উপর আবার বৃষ্টি কম, বৃষ্টি না হলে ফুল ঝরে যায় মধু জমে না। বৃষ্টি না হওয়ায় চাকে কেমন মধু হবে সেটা নিয়ে চিন্তিত। তবে সুন্দরবন সংলগ্ন স্থানীয় জেলে-বাওয়ালী ও মৌয়ালরা জানান, সুন্দরবনে ছোট বড় মিলিয়ে কয়েকটি বনদস্যু দল থাকায় তারা মধু আহরণে আগ্রহ হারাচ্ছে। বনদস্যুদের হাতে নিরিহ জেলে-বাওয়ালীরা তাদের চাহিদা মতো মুক্তিপন দিতে না পারায় হামলার শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত । কারণ তাদের সাথে যোগাযোগ না করে বনে ঢুকলে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। যার কারণে তারা পূর্বের মতো সাচ্ছন্দ্যে মাছ-কাঁকড়া ও মধু আহরণে আগ্রহ হারাচ্ছে। তারা আরও জানায় এ বছর বনদস্যু বাহিনী বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জেলে বাওয়ালী ও মৌয়ালদের হুমকি দিচ্ছে জন প্রতি ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত মুক্তিপনের টাকা দিয়ে বনে প্রবেশ করতে হবে। স্থানীয় কয়েকজন মৌয়ালের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমের শুরুতে সুন্দরবনে খলিশা ফুলের মধু আসে। এর ২০-২৫ দিন পর আসে গরান ফুলের মধু। শেষে আসে কেওড়া ও ছইলা ফুলের মধু। এই তিন প্রজাতির মধুর মধ্যে সবচেয়ে ভালো ও দামি হচ্ছে খলিশার মধু। মৌসুমের প্রথম ফুলের মধু যা দেখতে সাদা, গাঢ় ও অনেক বেশি মিষ্টি। তবে বৃষ্টি না হলে ফুল শুকিয়ে ঝরে যায়, মধু জমে না। এ বছর তেমন বৃষ্টি না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত মধু না পাওয়ার শঙ্কা আছে। কয়রার ঘোলপাড়া গ্রামের মোকছেদ আলী বলেন , এলাকয় তেমন কোন কাজকর্ম না থাকায় মহাজনদের কাছ থেকে ধার দেনা করে মধু কাটতে যাচ্ছি। মধু না পেলে চালানে মার খাবো। ঋনের বোঝা নিয়ে টানতে হবে। আবার সুন্দরবনে কয়েকটি ডাকাত দল আছে তাদের কাছে ধরা পড়লে গুনতে হবে টাকা। আমিরুল ইসলাম জানান, এ বছর যা ডাকাতে যা উৎপাত শুনতেছি তাতে চালান বাচবে কিনা বুঝতে পারছি না। বাজার সওদা করা না হয়ে গেলে এবছর বনে মধু কাটতে যেতাম না। বন বিভাগ সুত্রে জানা গেছে চলতি বছর খুলনা রেঞ্জে ৭ শ কুইন্টাল মধু ২১০ কুইন্টাল মোম এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১১ শ কুইন্টাল মধু ও ৭ শ কুইন্টাল মোম আহরনের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের সাবেক অধ্যাপক আ,ব,ম আব্দুল মালেক বলেন, ৫ই আগষ্টের পর থেকে আবারো সুন্দরবনে বনদস্যুদের অত্যাচার বেড়ে গেছে। ছোট বড় মিলে বেশ কয়েকটি দস্যুদল বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রায়ই শোনা যায় বনদস্যুদের হাতে জিম্মি হচ্ছে জেলে – বাওয়ালীরা। বনের গহীনে যেখানে মাধু আহরণ করছে সেখানে সাপ,বাঘ,অনন্য ভয়ানক প্রানীর উপস্থিতি যেমন থাকে, তেমনি বনদস্যুরা তাদের কাছ থেকে অর্থ ও তাদের অন্য সামগ্রী ছিনতাই করে নিয়ে থাকে। এসব কারণে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় এবং জীবনের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। আমরা চাই সরকার এ বনদস্যুদের বিরুদ্ধে দ্রূত ব্যাবস্থা গ্রহন করুক। সুন্দরবন নির্ভরশীল জেলে -বাওয়ালী ও মৌয়ালরা বনে গিয়ে নিরপদে মাছ-মধু আহরণ করতে পারে। তবে তাদের মুখে হাসি ফুটবে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এজেড এম হাসানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনে নির্বিঘ্নে মধু আহরণের জন্য বন বিভাগের টহল কার্যক্রম জোরদার করা হবে। এ ছাড়া মৌয়ালরা যাতে বন্যপ্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য বন বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button