স্থানীয় সংবাদ

মোংলা বন্দরের ইনারবার খনন প্রকল্প : ডাম্পিং জটিলতায় এক বছরের খনন কাজ পাঁচ বছরে

মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি ঃ দেশের দ্বিতীয় সামুদ্রিক বন্দর মোংলায় ইনারবার খনন কাজ শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের মার্চ মাসে। খননকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিলো ২০২২ সালের ৩০ জুন। কিন্তÍ ডাম্পিং (খননের বালি ফেলা) জটিলতায় সেই খনন কাজ শেষ হবে ২০২৬ সালের ৩০ জুন। এতে করে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে গিয়েছে ১শ ৬৮ কোটি টাকা।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ১৩১ কিলোমিটার উজানে পশুর নদীর পূর্ব তীরে মোংলা বন্দর অবস্থিত। বন্দরের প্রবেশ মুখ থেকে চ্যানেলের হাড়বাড়িয়া পর্যন্ত বন্দরের আউটারবার নামে পরিচিত। আর হাড়বাড়িয়া থেকে বন্দর জেটি পর্যন্ত নৌ পথ হলো ২৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার, যেটি বন্দরের ইনারবার নামে পরিচিত। বন্দরের জেটিতে সহজে ৯ থেকে ১০ ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানোর লক্ষে পশুর নদীতে ৭শ ৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ইনারবার খননের কাজ ২০২১ সালের ১৩ মার্চ শুরু করে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। সূত্র আরো জানায়, খননের কাজ পায় চায়না দুটি কোম্পানি সিইসি ইসিজি ও জেএইচ সিইসি। এ প্রকল্পে ২ কোটি ৩৭ লক্ষ ঘণমিটার বালি উত্তোলন করার কথা।
মোংলা বন্দরের ইনারবার খনন প্রকল্পের পরিচালক ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী (সিভিল ও হাইড্রোলিক্স বিভাগ) শেখ শওকত আলী জানান, ইনারবার খননের বালু ফেলার জন্য ১৫শ একর জমির প্রয়োজন হলে ৫শ একর সরকারী খাস জমি এবং মোংলা উপজেলার চিলা ইউনিয়নের জয়মনি এলাকার মালিকানা ৭শ একর জমি এবং পশুর নদীর পশ্চিম পাড় খুলনার দাকোপ উপজেলার বানিয়াশান্তা এলাকায় আরো ৩শ একর জমি নির্ধারণ করে। শওকত আলী আরো জানান, খনন কাজ শুরুর পর মোংলা উপজেলার ও সরকারি খাস জমিতে বালু ফেলা নিয়ে কোন সমস্যা হয়নি। সমস্যা সৃষ্টি হয় দাকোপ উপজেলার বানিয়াশান্তা এলাকায় ৩শ একর জমিতে বালু ফেলতে গিয়ে। সেখানের গ্রামবাসীকে ভুল বুঝিয়ে আন্দোলনের নামে একটি কুচক্রী মহল ওই জমিতে খননের বালু ফেলতে ক্রমাগত বাধার সৃষ্টি করে আসে। এতে করে খনন নিয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে ধীরগতি নেমে আসে খনন কাজের। শওকাত আলী আরো বলেন, ২০২৪ সালের শেষের দিকে পশুর চ্যানেলের ইনারবার খননের বালু রাখার সংকট কেটে যায়। নতুন করে মোংলা উপজেলার খাস জমিতে বালু ফেলার জায়গা পাওয়ার পর খননকাজ আবার নতুন উদ্যমে শুরু করা হয়। শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট কাজের প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন করতে পেরেছে চায়না ঠিকাদারী দুটি প্রতিষ্ঠান। তিনি আরও বলেন, আমাদের ধারনা ছিল, শুরু থেকে এ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে সময় লাগবে মাত্র এক বছর। কিন্তÍ ২০২১ সালের ১৩ মার্চ শুরু হওয়া এ কাজটি ২০২২ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও চলমান কাজের মধ্যে ডাস্পিংয়ে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় ড্রেজিংয়ে ধীর গতিতে নেমে আসে। এরপর খননকৃত জায়গায় অতিরিক্ত পলি জমাট হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৯শ ৬২ কোটি টাকা পুর্ননির্ধারন করা হয়। বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারনে তেল সংকটের পরও আমরা চেষ্টা করছি চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যে ইনারবার প্রকল্পের খনন কাজ শেষ করতে।
মোংলা বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী এইচ এম দুলাল বলেন, দেশের একটি বন্দরকে সচল রাখতে হলে প্রথমে দেশী-বিদেশী ব্যণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের চ্যানেলকে ঠিক রাখতে হবে। আর সেই চ্যানেলের নাব্যতা ঠিক রাখতে হলে খননের কোন বিকল্প নাই। নাব্যতা সংকটের কারনে মোংলা বন্দরের জেটিতে ৮ মিটার থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের কোন জাহাজ ভিড়তে পারে না। বড় মাদার ভেসেলগুলোকে জেটি থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে বন্দরের চ্যানেলে নোঙর করতে হয়। সেখান থেকে পন্য পরিবহনের জন্যে আলাদা করে লাইটারেজ জাহাজ ভাড়া করতে হয়। ফলে পন্য পরিবহনের ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। এজন্যে খনন খুবই প্রয়োজন। তাহলে পন্য পরিবহনে আর্থিক সাশ্রয় হবে এবং বিদেশি মাদার ভেসেলগুলো সরসরি জেটিতে ভিড়তে পারবে। তিনি আরো বলেন, এই চ্যানেলে প্রচুর পরিমান পলি জমে। তাই খনন প্রকল্পের কাজ শেষে নিয়মিতভাবে মেইনটেনান্স খনন চালু রাখতে হবে। তাহলে চ্যানেলের গভীরতা ঠিক থাকবে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন রফিক বলেন, মোংলা বন্দরের ইনারবার খনন সম্পন্ন হলে কনটেইনারবাহী জাহাজসহ ১০ ফুট গভীরতার জাহাজ সহজে মোংলা বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারবে। ফলে চট্রগ্রাম বন্দরের উপর চাপ কমবে। মোংলা বন্দরে জাহাজ আনার ব্যাপরে দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীরা আগ্রহী হবে। এবং জাহাজ আগমেনর সংখ্যা বাড়লে সার্বিকভাবে দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বৃদ্ধি পাবে। মোংলা বন্দর আরো গতিশীল হবে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন উপ ব্যবস্থাপক মাকরুজ্জামান বলেন, মোংলা বন্দরের একটি বড় মেগা প্রকল্প ইনারবার খনন। বিভিন্ন সমস্যায় এই প্রকল্পের খননকাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা যায়নি। এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে সার্বিকভাবে মোংলা বন্দরের জেটিতে জাহাজ আগমনের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে। বন্দরের আয়ও বাড়বে। সেই সাথে বন্দরের সক্ষমতা বহুগুনে বৃদ্ধি পাবে। তিনি আরো বলেন, ইনারবার খননের মূল প্রকল্প শেষ হলে এরপর নাব্যতা ধরে রাখার জন্যে আমরা মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং চালু করবো। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাথে আমাদের পাঁচ বছরের চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button