‘অনেক শখ ছিল মেয়ে ডাক্তার হবে, মানুষের সেবা করবে’ কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল

কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশীনের পরিবারে আহাজারি
স্টাফ রিপোর্টার : ‘অনেক শখ ছিল মেয়ে ডাক্তার হবে, মানুষের সেবা করবে’, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না। সব শেষ হয়ে গেল। মেয়ের শখ পূরণে কষ্ট হলেও তাকে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি করিয়েছি। ছোট মেয়ে হিসেবে যা, আবদার করেছে, দিয়েছি। কিন্তু কি কারণে ও আমাদের ছেড়ে চলে গেলে এখনও বুঝতে পারছি না।’
গতকাল শনিবার বিকালে খুলনা নগরের দক্ষিণ টুটপাড়া সার্কুলার রোডের নিজ বাড়িতে বসে কথাগুলো বলছিলেন আত্মহত্যার শিকার কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশীনের বাবা আনোয়ার হোসেন।
একটু পর পর বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি। খুলনা জেলা প্রশাসনের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে অবসর নিয়েছেন তিনি। এক ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল তাদের।
বড় ছেলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চাকরি করতেন। চিকিৎসক বানাতে ছোট মেয়েকে ভর্তি করিয়েছিলেন কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজে।
গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় টুটপাড়া বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, আত্মীয়-স্বজনদের ভিড়। তারা অর্পিতার বাবা-মাকে শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তারা দু’জনই চুপ করে বসে আছেন। মাঝে মাঝে দু’একটি কথা বলছেন।
স্বজনরা জানান, ছোট বেলা থেকেই দুই ভাই-বোন খুবই মেধাবী ছিল। শান্ত-শিষ্ট স্বভাব হওয়ার সবার কাছে ছিল আদরের। এজন্য সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ না পাওয়ায় বেসরকারি মেডিকেলে পড়াতে রাজি হন বাবা-মা। তাদের বড় ছেলে শাহরিয়ার আরমান লাশ আনতে কুমিল্লায় গিয়েছে। বিকাল নাগাদ লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ি খুলনায় রওনা হয়েছে। রাতে পৌছানোর পর আজ রোববার সকাল ৯টায় জানাযা নামাজ অনুষ্ঠিত হবে।
মোবাইল ফোনে শাহরিয়ার আরমান জানান, ‘নওশীন একটু চাপা স্বভাবের ছিল। মাঝে মাঝে এনাটমি বিভাগের মনিরা ম্যাডামের (ডা. মনিরা জহির) কথা বলত। একদম ফার্স্ট ইয়ার থেকে আমার বোনকে মানসিক নিপীড়ন করেছেন তিনি।
সবাইকে পাস করিয়ে দেয়, আমার বোন প্রত্যেকটা সাবজেক্ট পাস করে, কিন্তু ওই একটা সাবজেক্টে আটকে রাখে। আমি বলেছি, আমার বোনের সমস্যা কোথায় বলেন, তাও বলবে না। প্রেসার দিতে দিতে আমার বোনকে মেন্টালি নিপীড়ন যারা করেছে, তারাই এই মার্ডার করেছে। আমি ওই শিক্ষকের বিচার দাবি করছি।’
তিনি বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবারও নওশীনের সঙ্গে কথা বলেছি। ফর্ম ফিলাপের জন্য টাকা নিয়েছে। আমাকে বলল যে, ভাই আমি তো বাড়িতে বলতে পারছি না, আব্বুর ভয়ে, এখন তুই একটু ম্যানেজ কর। আমি বললাম, ঠিক আছে, তুই তোর বন্ধুর সঙ্গে ফর্ম ফিলাপটা কর, আমি টাকা পাঠাচ্ছি। আর আজকে এরকম খবর পাব কোনোদিন কল্পনা করিনি।’
কুমিল্লার সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশিনের মরদেহ গতকাল শুক্রবার রাতে উদ্ধার হয়েছে।
খুলনার সরকারি করোনেশন গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও খুলনা কলেজিয়েট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কেসিসি উইমেন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে অর্পিতা এ মেডিকেল কলেজটির ১৮তম ব্যাচে ভর্তি হন।
পুলিশ ও কলেজ সূত্র জানায়, গতকাল শুক্রবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে কলেজটির সদর দক্ষিণ উপজেলার মোস্তফাপুর ক্যাম্পাস সংলগ্ন মহিলা হোস্টেল থেকে অর্পিতার নিথর দেহ উদ্ধার করে কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। পরীক্ষার পর চিকিৎসলরা জানিয়েছেন হাসপাতালে নেওয়ার অনেক আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।



