বন কর্মকর্তাদের জোগসাজসে সুন্দরবনের অভয়ারণ্যে চলছে মাছ শিকার

স্টাফ রিপোর্টার ঃ সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে পরিচিতি লাভ করলেও, কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের কারণে ধ্বংস হচ্ছে এর জীববৈচিত্র। এ সকল দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রতিনিয়ত সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় মাছ শিকারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতিপূর্বে এসকল বিষয় নিয়ে নানা প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়ায় সংবাদ প্রচার হলেও, এখনো সুনজর পড়েনি কর্তৃপক্ষের । সিন্ডিকেটটি শক্তিশালী হওয়ায় , নিষেধাজ্ঞার মৌসুমেও অবাধে চলছে বিষ প্রয়োগে মৎস্য শিকার। বনের রক্ষকেরা ভক্ষক হওয়ায় হুমকির মুখে পড়ছে সুন্দরবনের মাছের প্রজননক্ষেত্র গুলো। তবে বন বিভাগের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের সংরক্ষিত এলাকায় মাছ ধরার অপরাধে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন জেলেকে আটক করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি বন বিভাগের অভিযানে মাছ শিকারের নৌকা জব্দ করলেও, ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন মূলহোতারা। অনুসন্ধানে জানা যায়, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ তথা বাগেরহাটের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের অভয়ারণ্যে প্রবেশ করে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে কাকড়া, চিংড়িসহ অন্যান্য মাছ শিকার করছে জেলেরা। শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে বিশেষ করে ছাপড়াখালী, চান্দেশ্বর এবং জোংড়া টহল ফাঁড়ির অধীনস্থ নদী ও খালগুলোতে অবৈধভাবে মাছ শিকার করছে জেলেরা। এছাড়া জয়মনি, শেলারচরসহ অভয়ারণ্যের নিষিদ্ধ খালে বিষ বা অবৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পূর্ব বিভাগের পাশাপাশি পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জের নীলকমল, পাথকষ্টা, গেওয়াখালির অংশ বিশেষ, নোটাবেকি, মান্দারবাড়ি, পুস্পকাটিসহ বনের অন্য সকল অভয়ারণ্য এলাকায় মৎস্য ব্যবসায়ীদের দাদনভুক্ত শত শত জেলে মাছ শিকার করে অবৈধ ভাবে আর্থিক ফায়দা লুটে নিচ্ছে। মাঝে মাঝে কিছু অবৈধ মাছ শিকার কালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও মুল হোতারা থাকছে ধরা ছোয়ার বাইরে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়রা এলাকার কয়েকজন জেলে ও দাদন ব্যবসায়ীরা জানায়, সুন্দরবন দক্ষিণ অভয়ারণ্যের নীলকমলের ছিচখালী,কেঁড়ড়া সুতি, ভোমরখালি ও বালি নদীর আশপাশের এলাকা, চান্দাবুনি ও বুন্দো নদী সহ আশপাশের খালে মৎস্য বাবসায়ী আব্দুল মাজেল, মফিজুল, জহির মেম্বর, এছাক ও মালেকের জেলেদের সাথে কিছু কথিত সাংবাদিক, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও জনপ্রতিনিধি মিলে বছরের প্রায় সময়জুড়ে মাছ শিকার করে থাকে।
নোটাবেকি, পুস্পকাটি অভয়ারণ্যের নান্দী ও জলঘাটা বন এলাকার নদী-খালে মৎস্য ব্যবসায়ি রজব আলী, কামরুল গাজী, মহিদুল সহ কয়রা ও শ্যমনগরের শতাধিক জেলে মাছ শিকার করছেন।তথ্য অনুসন্ধানে ও স্থানীয় জেলেদের সাথে কথা বলে জানা যায়,সুন্দরবনে আবু সালেহ এর ২২ টি নৌকা, তন্ময় কোম্পানির ১৭ টি, শরীফ ডাক্তারের ৪০ টি, বুলবুলির ২২ টি,নূরুজ্জামানের ১০টি, রহিমের ১০টি, ইসমাইলের ৪০ টি, মফিজুলের ২২ টি, আব্দুল মাজেদ এর ৩০ টি, জহিরের ৪০ টি, এছহাকের ৩০ টি, রজব আলীর ২৫ টি, মহিদুল এর ২০ টি, কামরুল গাজি এর ২৩ টি, জামাল মোল্লার ৩০ টি, শহীদুল্লাহ্ মোল্লার ৩৫ টি, শহীদের ৩৫ টি, মিন্টু গং দের ৩০টি, বাবুর ৫ টি, লৎফর মোল্লার ১৫ টি, আলামিনের ১০ টি, শাহেব আলীর ৮টি, মাজেদ ১৫টি,বাক্কার ২৩টি, বারিক ৫টি,মহিদুল সরদার ১৫টি সহ বিভিন্ন জেলে কোম্পানির কয়েক’শ নৌকা অবৈধভাবে অভয়ারণ্য এলাকায় মাছ ধরছে। এসব মাছ ট্রলার যোগে এনে দাদন ব্যবসায়ীর কাটায় কয়রা, কলবাড়ি, সোনার মোড়, নঁওয়াবেকী, নূরনগরসহ বিভিন্ন মৎস্য আড়তে নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। একাধিক জেলেরা জানায়, অভয়ারণ্যে মাছ শিকারের সুযোগ করে দেওয়ায় অভয়ারণ্য এলাকার বনরক্ষী বাবদ প্রতি গোনে জেলে নৌকা প্রতি ৭ হাজার টাকা করে মৎস্য কোম্পানিগুলো জেলেদের কাছ থেকে কর্তন করে নেয়। এই সুযোগ তৈরী করতে কাজ করে কিছু প্রভাবশালী রাজনীতিক ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধি ও কিছু কথিত সাংবাদিক ও স্টেশন কর্মকর্তা। জেলেরা আরো জানায়, গহীন সুন্দরবন থেকে টাপুরে নৌকাযোগে মাছ নিয়ে লোকালয়ে পৌঁছাতে পথে ঘাটে সবখানে ম্যানেজ করে চলতে হয়। বন সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজের মাধ্যমে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরাসহ অন্যান্য সকল দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের কর্মকর্তা (ডি এফ ও) এ জেড এম হাছানুর রহমানের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, কালাবগি স্টেশনে এপর্যন্ত অনেক নৌকা আটক করা হয়েছে। কোনো এলাকায় এমন তথ্য উপাত্ত পেলে, আপনাদের উপস্থিতিতে ও জনসম্মুখে আমি তার ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
এদিকে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বন কর্মকর্তাদের জোগসাজসে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের বিষয়ে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের কর্মকর্তা (ডি এফ ও) মো: রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, অভয়ারণ্যে গিয়ে মাছ শিকার করা অপরাধ। এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে পুনরায় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


