স্থানীয় সংবাদ

কারফিউ-ইন্টারনেট বন্ধে ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন খুলনা

জুলাই আন্দোলনের দিনগুলি-২১

এম সাইফুল ইসলাম ঃ চব্বিশের ২১ জুলাই। টানা প্রায় তিন দিন ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। তথ্যপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে মানুষকে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। সংবাদমাধ্যমগুলোও পড়ে বিপাকে। ইন্টারনেট না থাকায় মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকরা নিয়মিতভাবে ঢাকার অফিসে সংবাদ পাঠাতে পারছিলেন না। অনেক ক্ষেত্রে মুঠোফোনে ফোন করে খবর পড়ে শোনানো হতো, আর স্টুডিওর উপস্থাপক তা সম্প্রচার করতেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তীব্র উত্তেজনার মধ্যে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। রায়ে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে এবং মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা রাখা হয়। তবে আদালতের এই রায়ের দিনেও দেশ ছিল কার্যত অচল। দেশজুড়ে জারি ছিল কারফিউ। কারফিউয়ের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়েন শ্রমজীবী মানুষ। আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিম্নআয়ের পরিবারগুলোতে দেখা দেয় তীব্র সংকট। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অনেকেই খাবার ও বাসস্থানের সংকটে পড়েন। একই সঙ্গে ছিন্নমূল মানুষের মধ্যেও দেখা দেয় খাদ্যাভাব। এমন পরিস্থিতিতে খুলনায় খুব গোপনে ও কৌশলে মানুষের পাশে দাঁড়ায় সামাজিক সংগঠন স্বপ্নপূরী। সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবকেরা ঝুঁকি নিয়ে দরিদ্র, ছিন্নমূল ও সংকটে থাকা মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেন। কারফিউ ও অচলাবস্থার মধ্যে এই মানবিক উদ্যোগ অনেক মানুষের জন্য হয়ে ওঠে আশার আলো। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হাসিনা সরকারের অন্যতম সমালোচিত সিদ্ধান্ত ছিল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই প্রথমবারের মতো সারা দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পর ১৯ জুলাই দিবাগত রাত ১২টা থেকে জারি করা হয় কারফিউ। আন্দোলন দমন এবং দেশবাসীকে তথ্যের অন্ধকারে রাখার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। তখন দেশজুড়ে চলছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। ধীরে ধীরে কোটাবিরোধী আন্দোলন রূপ নিচ্ছিল সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে। ১৮ জুলাই হঠাৎ করে সারাদেশের ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়ার পর ১৯ জুলাই রাত থেকে কারফিউ জারি করা হয়। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় মানবাধিকার লঙ্ঘন, হত্যা ও হামলার অনেক তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে দেশ-বিদেশে পৌঁছাতে পারেনি। তথ্যপ্রবাহ বন্ধ থাকার এই সময়টিকে পরবর্তী সময়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়। এর মধ্যেই এক সপ্তাহের মধ্যে নিহতের সংখ্যা দুইশ ছাড়িয়ে যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। পাশাপাশি চলতে থাকে ব্যাপক ধরপাকড়। নানা মহলের চাপ ও সমালোচনার মুখে কয়েক দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে ইন্টারনেট সেবা ফিরতে শুরু করে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ রাখা হয়। প্রায় ১০ দিন পর মোবাইল ইন্টারনেট চালু হলে মানুষ জানতে শুরু করেন আন্দোলন দমনের নামে সংঘটিত হত্যা ও হামলার ভয়াবহ সব তথ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে থাকে গুলিতে নিহত ও আহত মানুষের ছবি, ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা। এসব দৃশ্য দেশবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্ম দেয়। ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে শুরু করেন সাধারণ মানুষও। ইন্টারনেট ফিরে আসার পর বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আবারও সংগঠিত হতে থাকেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। অনলাইনে দেওয়া হতে থাকে নতুন কর্মসূচি ও আন্দোলনের দিকনির্দেশনা। ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। একদিকে আদালতের রায়ে ৯৩ শতাংশ মেধাভিত্তিক নিয়োগের সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ, হত্যা ও ধরপাকড়Ñসব মিলিয়ে ২১ জুলাইয়ের বাংলাদেশ ছিল এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশ। তবে তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত আন্দোলনকে থামাতে পারেনি। বরং একের পর এক হত্যাকা- ও দমন-পীড়নের খবর প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সমাজের সর্বস্তরে। সেই ক্ষোভই পরবর্তী সময়ে হাসিনা সরকারের পতনের আন্দোলনকে আরও বেগবান করে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button