স্থানীয় সংবাদ

জুলাই আন্দোলনের দিনগুলি-২৩

খুলনায় কার্ফিউ শিথিল, মর্গে থেকে মর্গে সমন্বয়ক আসিফের লাশ
খুঁজে না পেয়ে বাবার সংবাদ সম্মেলন

এম সাইফুল ইসলাম ঃ চব্বিশের ২৩ জুলাই মঙ্গলবার। কারফিউয়ের চতুর্থ দিন সকাল থেকে ঢাকার সড়কে মানুষ এবং যানবাহনের চলাচল কিছুটা বাড়লেও সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের টহল একইরকম ছিল। এদিন কোটার সংখ্যায় পরিবর্তনের প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। তবে এদিন বিভিন্ন জেলায় ভিন্ন ভিন্ন সময়ে কারফিউ শিথিল করে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন। এর মধ্যে ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে দুপুর ১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হয়। চট্টগ্রামে এ সময়সীমা ছিল সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। সকাল ১১টায় কারফিউ শিথিলের পর ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে যাত্রীবাহী কিছু বাস চলাচল শুরু করে। খুলনায় দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হয়। এছাড়া, কক্সবাজার, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বরিশাল, কিশোরগঞ্জ, পিরোজপুর, রাজশাহী, মুন্সীগঞ্জ, মাগুরা, ভোলা, নীলফামারী, নোয়াখালী গোপালগঞ্জ, পাবনা ও রংপুরেও কারফিউ শিথিল ছিল এদিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদকে ১৮ জুলাই থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পাঁচ দিন নিখোঁজের সময় মা-বাবা বোনসহ আসিফের পরিবারের সবার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। বন্ধ থাকে সবার খাওয়া-দাওয়া। এ লাশ ঘর থেকে আরেক লাশ ঘরে হন্য হয়ে পাঁচ দিন ছুটে বেড়ায় আসিফের পরিবার। পাঁচদিন পরে সন্তানের সন্ধান চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করে আসিফের শিক্ষক বাবা বিল্লাল হোসেন।
আসিফ মাহমুদ সবুজ ভূইয়ার বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরাবাজার থানাধীন আকুবপুর গ্রামে। তার বাবা মো. বিল্লাল হোসেন আকুবপুর ইয়াকুব আলী ভূইয়া পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তার মা রোকসানা আক্তার একজন গৃহিণী। আসিফ মাহমুদ তার বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। তার বড় একজন ও ছোট দুজন বোন রয়েছে।

আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন জানান, পরিবারের সদস্যদের না জানিয়েই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন আসিফ মাহমুদ। প্রথমদিকে পুলিশের গুলিতে কয়েকজন শিক্ষার্থী মারা যাওয়ার পর তার পরিবার জানতে পারে যে সে আন্দোলনের সমন্বয়ক। তখন আসিফ মাহমুদকে বাড়ি ফিরে আসতে অনুরোধ করেন বাবা-মা ও বোনেরা। পরিবারের সদস্যদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে আসিফ বলেন, আমার অনেক ভাই-বোন পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন। আমি আন্দোলন থেকে ফিরে আসব না। হয় গুলি খেয়ে মরব, না হয় আন্দোলন সফল করে ঘরে ফিরব। এরপর থেকেই আসিফ মাহমুদের পরিবারে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা শুরু হয়। বিল্লাল হোসেন বলেন, পাঁচ দিন নিখোঁজের সময় মা-বাবা বোনসহ পরিবারের সবার অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে যায়। বন্ধ থাকে সবার খাওয়া-দাওয়া। আমরা লাশ ঘরে গিয়েও তাকে খুঁজেছি। আন্দোলন সফল হওয়ায় অনেক ভালো লাগছে। আমরা চাই এমন খুনি, ফ্যাসিবাদী সরকার আর কখনো না আসুক। তিনি আরও বলেন, আসিফের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যাওয়ার সংবাদ পেয়ে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রতিদিন আসিফের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কিন্তু ১৯ জুলাই তার সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তারপর বিভিন্ন জায়গায় তাকে খোঁজ করেও পাইনি। ২৩ জুলাই ইত্তেফাক পত্রিকায় খবর প্রকাশ হয়, আসিফ মাহমুদকে গুম করা হয়েছে। তারপর আমরা শাহবাগ থানায় নিখোঁজের ডায়েরি করতে গেলে ওসি আমাদের জিডি নেননি। সেখান থেকে যাত্রাবাড়ী থানায় যাই, সেখানেও একইভাবে আমাদের ফিরিয়ে দেয় পুলিশ। তারপর ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ডে খোঁজ করি, কিন্তু আসিফের কোনো সন্ধান না পেয়ে হাসপাতালের লাশঘরে (মর্গ) গিয়ে খোঁজাখুঁজি করেও পাইনি। তারপর প্রেস ক্লাবে গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে আসিফের গুমের বিষয়টি দেশবাসীকে জানাই। বিল্লাল হোসেন বলেন, ২৪ জুলাই হাতিরঝিল এলাকায় আসিফ মাহমুদকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। এ সময় তাকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য নিলে সেখান থেকে ২৬ জুলাই পুলিশ পরিচয়ে আবারও তাকে তুলে নিয়ে যায়। ২৭ জুলাই ডিবি কার্যালয় থেকে ফোন করে জানায়, আপনার ছেলে ডিবি কার্যালয়ে আছে, দেখে যান। আমি আর আসিফের মা সেখানে গিয়ে দেখা করলে তাদের ছেড়ে দেবে বললেও পরে ছাড়েনি। তিনি আরও বলেন, আসিফ ছোটবেলা থেকেই একরোখা ছিল। যেখানে অন্যায় দেখত, সেখানেই প্রতিবাদ করত। ছেলেটার একরোখা স্বভাব তাকে আজ সরকারের উপদেষ্টা বানিয়েছে। একজন বাবা হিসেবে আমি অনেক গর্বিত।
জানা গেছে, আসিফ মাহমুদ ২০১৩ সালে কুমিল্লার আকবপুর ইয়াকুব আলী ভূইয়া পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৮ম শ্রেণি পাস করেন। পরে ঢাকার তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়া এলাকার হোসেন আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরে চলে যান ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। সেখানে উচ্চ মাধ্যমিকের গ-ি পার করেন। সব ক্লাসেই ভালো ফল পাওয়া আসিফ প্রথমবারেই চান্স পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে। পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সবুজ ভূইয়া পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছেন। পেয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button