স্থানীয় সংবাদ

বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে চীন ও পাকিস্তান

রাষ্ট্রপতিকে চীন সফরের আমন্ত্রণ
৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের বার্তা
জে-১০সিই যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও ড্রোন কেনার উদ্যোগ

প্রবাহ ডেস্ক : চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের সামরিক যোগাযোগ বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর প্রধানেরা সম্ভাব্য জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনাসহ প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মহাকাশ-প্রযুক্তি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, জে-১০সিই কেনার বিষয়টি শুধু সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন ও আঞ্চলিক কৌশলগত হিসাবও জড়িত। চীনা যুদ্ধবিমান তুলনামূলক কম খরচে আধুনিক সক্ষমতা দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর সঙ্গে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় এবং বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে, চীনের জে-১০সিই কেনার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে এটি হবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অন্যতম বড় প্রতিরক্ষা ক্রয়। একই প্যাকেজে হেলিকপ্টার ও ড্রোন যুক্ত হওয়ায় বিমানবাহিনীর সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানোর একটি বড় উদ্যোগ হিসেবেও এটি বিবেচিত হচ্ছে। চীনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। ৪.৫ প্রজন্মের এই বহুমুখী যুদ্ধবিমান কেনার জন্য প্রস্তুত করা খসড়া প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় বাজেট চলতি অর্থবছরে পাওয়া গেলে কেনাকাটার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। তা সম্ভব না হলে পরবর্তী অর্থবছরে এ প্রক্রিয়া নেওয়া হবে। প্রস্তাবিত প্যাকেজে জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি চীনা অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি পরিবহন হেলিকপ্টার ও ড্রোন কেনার বিষয়ও রয়েছে।
জে-১০সিই হলো চীনের চেংদু জে-১০সি যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ। এক ইঞ্জিনের এই যুদ্ধবিমান আকাশযুদ্ধের পাশাপাশি স্থল লক্ষ্যবস্তুতে হামলা, নজরদারি ও দূরপাল্লার মিশনে ব্যবহার করা যায়। এর সর্বোচ্চ গতি প্রায় মাখ ১.৮ থেকে ২। আধুনিক রাডার ও বিভিন্ন ধরনের আকাশ থেকে আকাশ এবং আকাশ থেকে স্থল ক্ষেপণাস্ত্র বহনের সক্ষমতা রয়েছে।
বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তের পেছনে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে জে-১০ যুদ্ধবিমানের কথিত সাফল্যও প্রভাব ফেলেছে। ওই সংঘাতে পাকিস্তানের জে-১০সিই ও পিএল-১৫ দূরপাল্লার আকাশযুদ্ধের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বাংলাদেশ গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছে বলে জাহেদুর রহমান জানিয়েছেন। তবে ওই সংঘাতে ঠিক কতটি ভারতীয় রাফাল ভূপাতিত হয়েছিল এবং কোন অস্ত্র কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল—এসব নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিমান কেনার সংখ্যা ও মোট চুক্তিমূল্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে এর আগে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০টি চীনা জে-১০ কেনার একটি প্রাথমিক পরিকল্পনার সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ২২০ কোটি ডলার ধরা হয়েছিল। এর মধ্যে বিমান কেনার পাশাপাশি খুচরা যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ, পরিবহন, বিমা ও অন্যান্য সরঞ্জামের ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
জে-১০সিই কেনার উদ্যোগ বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে বিমানবাহিনীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যুদ্ধবিমান চীনা প্রযুক্তির পুরোনো প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল। নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান যুক্ত হলে আকাশ প্রতিরক্ষা, দূরপাল্লার আকাশযুদ্ধ এবং বহুমুখী সামরিক অভিযানে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়বে।
সূত্র: ডন, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, আনাদুলু এজেন্সি ও রয়টার্স
রাষ্ট্রপতিকে চীন সফরের আমন্ত্রণ, ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের বার্তা : রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে চীনা কোম্পানিগুলোর বড় বিনিয়োগ ও প্রায় এক লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুরে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পক্ষ থেকে এ আমন্ত্রণ জানান রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
সাক্ষাতে রাষ্ট্রদূত জানান, চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে (সিইআইজেড) প্রায় ৩০টি চীনা কোম্পানি প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্থানীয় জনগণের জন্য আনুমানিক এক লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বৈঠকে রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের বিভিন্ন অগ্রগতি সম্পর্কেও রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন। তিনি জানান, সফরের অংশ হিসেবে সিইআইজেডের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, মোংলা বন্দর আধুনিকায়নে বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর এবং মোংলা এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠায় সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফর দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও সুদৃঢ় করবে।
সাক্ষাতে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। এর মধ্যে তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প, পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ দ্রুত শুরু এবং প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের ‘২+২’ কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা সংলাপ চালুর উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে চীনে কাঁঠাল, আম ও পেয়ারা রপ্তানি, সৌরশক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন সংযোজন কারখানা স্থাপন, চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ ও চীনের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র সম্প্রসারণের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন উভয় পক্ষ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button