জাতীয় সংবাদ

গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কমিটি ঘোষণা

# কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে পালটাপালটি স্লোগান, বিক্ষোভ, হাতাহাতি, মারামারি #
# আহ্বায়ক সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার, মুখপাত্র সমন্বয়ক আশরেফা খাতুন ও সদস্য সচিব জাহিদ আহসান #
# ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আহবায়ক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ও সদস্য সচিব সমন্বয়ক মহির আলম #

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখা শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ’ নামে নতুন ছাত্র সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘোষণা করা হয়েছে। এই সংগঠনটির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার ও সদস্য সচিব হিসেবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দপ্তর সম্পাদক জাহিদ আহসানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সমন্বয়ক আশরেফা খাতুনকে। এ ছাড়া সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে রিফাত রশীদ, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৌহিদ মোহাম্মদ সিয়াম, মুখ্য সংগঠক হিসেবে সমম্বয়ক তাহমীদ আল মোদাসসীর চৌধুরী দায়িত্ব পেয়েছেন। বুধবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েল মধুর ক্যান্টিন প্রাঙ্গণে এই নতুন ছাত্র সংসদ আত্মপ্রকাশ করেছে। গতকাল গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটিও প্রকাশ করা হয়েছে। এতে আহ্বায়ক হিসেবে সমন্বয়ক আব্দুল কাদের ও সদস্য সচিব হিসেবে সমন্বয়ক মহির আলমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
কী নিয়ে বিক্ষোভ, মারামারি ঃ কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে পালটাপালটি স্লোগান, বিক্ষোভ, হাতাহাতি এবং পরে অন্তত দুই দফা মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। বুধবার বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসব ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থী ও নতুন সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন সংগঠনের শীর্ষ পদ নিয়ে বিরোধের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নতুন ছাত্রসংগঠনের কমিটিতে তাদের ‘সঠিক প্রতিনিধিত্ব’ চান। তারা বলছিলেন, কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা সাবেক সমন্বয়ক রিফাত রশীদকে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার দাবি করছিলেন। রিফাত রশীদকে নতুন ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব করা হয়েছে। আজ বিকাল তিনটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কমিটি ঘোষণার কথা ছিল। এই কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ করতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা যথাসময়ে ক্যান্টিনের সামনে এসে অপেক্ষা করছিলেন। মধুর ক্যান্টিনের সামনে সংবাদ সম্মেলনের জন্য চেয়ার-টেবিলও আগেই পাতা হয়েছিল। কিন্তু নতুন ছাত্রসংগঠনের মূল উদ্যোক্তারা নির্ধারিত সময়ে সেখানে যাননি। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ভবনে অবস্থান করছিলেন৷ এমন পরিস্থিতির মধ্যে বিকাল চারটার কিছু পরে মধুর ক্যান্টিনের সামনে যান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। তারা ‘উত্তরাতে বৈষম্য, চলবে না চলবে না’, ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’, ‘আমাদের অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘ঢাবির সিন্ডিকেট, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ প্রভৃতি স্লোগান দিতে থাকেন। তারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক রিফাত রশীদের পক্ষেও স্লোগান দেনÍ‘রিফাত রশীদ ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’, ‘রিফাত রশীদ এগিয়ে চলো, আমরা আছি তোমার সাথে’৷
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তরিকুল ইসলাম নাহিদ নিজেকে ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেসের (ইউআইটিএস) শিক্ষার্থী বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। নতুন ছাত্রসংগঠনেও একধরনের পাবলিকীকরণ করা হচ্ছে । আমরা এই কমিটিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঠিক প্রতিনিধিত্ব চাই৷’ তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়ক রিফাত রশীদকে কমিটি থেকে মাইনাস (বাদ) করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আমরা সেটারও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’ আধঘণ্টা স্লোগান দেওয়ার পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মধুর ক্যান্টিনের সামনে থেকে চলে যান। তারা চলে যাওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশটি ক্যান্টিনের সামনে ‘শিক্ষা ঐক্য, মুক্তি মুক্তি’, ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দেন। তারা সংবাদ সম্মেলন শুরু করার প্রস্তুতি নিলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে আবার সেখানে ফিরে আসেন। তারা ‘প্রাইভেট ছাড়া কমিটি, মানি না মানব না’ বলে স্লোগান দিতে দিতে আসেন। ক্যানটিনের সামনে গিয়ে তারা ‘ঢাবির সিন্ডিকেট, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ বলে স্লোগান দেন। মধুর ক্যানটিনের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীর সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে সেখানে ধস্তাধস্তি হয়। পরে পাঁচটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশটি মধুর ক্যান্টিনের ভেতরে ঢুকে যায়। ক্যান্টিনের ভেতরে গিয়ে তারা কিছুক্ষণ স্লোগান দেয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ক্যান্টিনের ভেতরে ঢুকে পড়ে নানা স্লোগান দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও পালটা স্লোগান দেন। এমন উত্তেজনার মধ্যেই মধুর ক্যান্টিনে সাংবাদিকদের সামনে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কমিটি ঘোষণা করা হয়। সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে আবু বাকের মজুমদার, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক পদে তৌহিদ মোহাম্মদ সিয়াম, সদস্যসচিব পদে জাহিদ আহসান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব পদে রিফাত রশীদ, মুখ্য সংগঠক হিসেবে তাহমিদ আল মুদাসসির চৌধুরী ও মুখপাত্র পদে আশরেফা খাতুনের নাম ঘোষণা করা হয়। নতুন ছাত্রসংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কমিটির আহ্বায়ক পদে আব্দুল কাদের, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক পদে লিমন মাহমুদ হাসান, সদস্যসচিব পদে মহির আলম, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব পদে আল আমিন সরকার, মুখ্য সংগঠক পদে হাসিব আল ইসলাম ও মুখপাত্র পদে রাফিয়া রেহনুমা হৃদিকে মনোনীত করা হয়। কমিটি ঘোষণার পর বিকাল সোয়া পাঁচটার দিকে মধুর ক্যানটিনের পশ্চিম পাশের ফটক দিয়ে মিছিল বের করেন নতুন কমিটির পক্ষের নেতা-কর্মীরা। তারা ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ, জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দিচ্ছিলেন। মিছিলটি আইবিএর (ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট) সামনের সড়ক দিয়ে অগ্রসর হয়।

এ সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মধুর ক্যান্টিনের সামনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট করে প্রাইভেটকে মাইনাস করে দিচ্ছে।’ তারা সেখানে ‘ঢাবির সিন্ডিকেট, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ বলে স্লোগানও দেন।

কমিটির পক্ষের নেতা-কর্মীদের মিছিলটি সামনে অগ্রসর হলে মল চত্বর এলাকায় প্রথম দফায় দুই পক্ষের মারামারি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মধুর ক্যানটিনের দিকে ধাওয়া দেন। মারামারির পর ক্যাম্পাসে উত্তেজনা তৈরি হয়।

সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের সামনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আরেক দফা মারামারি হয়। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারামারি থামানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়। নতুন সংগঠনের কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সন্ধ্যা ছয়টার দিকেও ক্যাম্পাসে উত্তেজনা চলছিল। তবে রাতে পরিস্তিতি শান্ত ছিল।

এ ছাড়া সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক লিমন মাহমুদ, সিনিয়র সদস্য সচিব আল আমিন সরকার, মুখ্য সংগঠক হাসিব আল ইসলাম এবং মুখপাত্র হিসেবে রাফিয়া রেহনুমা হৃদি দায়িত্ব পেয়েছেন।

গত বছরের জুলাইয়ে কোটাবিরোধী ও পরে সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তাদের অব্যাহত আন্দোলনে নির্বিচার গুলির মুখেও দমেননি সংগঠনের শিক্ষার্থীরা। তাদের বিভিন্ন দাবির মুখে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। শেখ হাসিনা আশ্রয় নেন ভারতে।

সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের একটি অংশ নতুন একটি ছাত্র সংগঠনের গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা জানান, জুলাই-আগস্টে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা যুক্ত হয়েছিলেন। এখন সবাই নিজেদের সংগঠনে ফিরে গেছেন। এর বাইরে সাধারণ শিক্ষার্থী যারা যুক্ত ছিলেন, তাদের নিয়েই নতুন সংগঠন করবেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে বেরিয়ে ছাত্র সংগঠন করার ঘোষণা দেন একাংশের ছাত্রনেতারা। তারা বলেন, নতুন সংগঠনটির মূল কাজ হবে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা করা।

ওই সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার বলেন, ‘বাংলাদেশের সংগ্রাম ও স্বাধীনতার ইতিহাসকে স্বীকার করে এবং সাতচল্লিশ, বায়ান্ন, বাষট্টি, ছেষট্টি, আটষট্টি, উনসত্তর, একাত্তর, নব্বই এবং চব্বিশের সব গণআন্দোলন এবং ছাত্র-জনতার সংগ্রামী চেতনাকে ভিত্তি করে ছাত্র রাজনীতি আমরা সক্রিয় করব।’

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button