জাতীয় সংবাদ

পুশ ইন, সীমান্ত হত্যা নিয়ে বিএসএফ মহাপরিচালকের অসত্য তথ্য

# বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে সম্মেলন #

প্রবাহ রিপোর্টঃ বাংলাদেশে অবৈধভাবে পুশ ইন, সীমান্তে শিশু, নারীসহ নিরীহ মানুষ হত্যাসহ সীমান্তের নানা সমস্যা নিয়ে অসত্য তথ্য ও অস্বীকারের নজির স্থাপন করে গেলেন মহাপরিচালক দালজিৎ সিং চৌধুরী। আত্মরক্ষার্থে বিএসএফ মারণাস্ত্র ব্যবহার করছে বলে বক্তব্য দিলে বিএসএফ মহাপরিচালকের এই বক্তব্যের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে দ্বিমত পোষণ করেন বাংলাদেশ (বিজিবি)’র মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী।রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অবৈধভাবে পাঠানোর বিষয়টিও রীতিমত অস্বীকার করেন বিএসএফ মহাপরিচালক দালজিৎ সিং চৌধুরী।চার দিনব্যাপী ৫৬ তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন উভয় মহাপরিচালক। বৃহস্পতিবার বিজিবি সদর দপ্তরের যৌথ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। গত ২৫ আগস্ট শুরু হওয়া সীমান্ত সম্মেলন যৌথ আলোচনার দলিল স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) মহাপরিচালক বলেছেন, আত্মরক্ষার্থে সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহার করে বিএসএফ। তাৎক্ষণিক দ্বিমত পোষণ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, শিশুরাসহ নিরীহ মানুষজন কিভাবে ভারতের বিএসএফের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে একটি মেকানিজমের আওতায় পাঠানো হচ্ছে বলে দাবি করেন বিএসএফ পরিচালক। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের পাঠানোকে রীতিমত জায়েজ করলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে বি এস এফ মহাপরিচালক প্রশ্নের জবাবেপুশইন শব্দটি একবারের জন্যও উচ্চারণ করেননি। বরং তিনি বলেছেন বসবাসরত বাংলাদেশীদের নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় লোকাল এজেন্সি গুলোর হাতে তুলে দেওয়া হয়। তারাই আইনগত প্রক্রিয়া অবলম্বন করে বাংলাদেশে পাঠায়। অথচ বর্তমান অন্তর্র্বতী সরকার ক্ষমতা আসার পর থেকে ২০০০ মানুষকে বাংলাদেশের অবৈধভাবে প্রসন করেছে ভারত।সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী এর নেতৃত্বে ২১ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, সড়ক বিভাগ, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর, যৌথ নদী কমিশন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও প্রতিনিধিত্ব করেন।অপরদিকে, বিএসএফ মহাপরিচালক দালজিৎ সিং চৌধুরী এর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধিদল সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ভারতীয় প্রতিনিধিদলে বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও ভারতের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তারাও অন্তর্ভূক্ত ছিলেন।সম্মেলনের আলোচ্য বিষয়ের উপর ভিত্তি করে আলোচনার লিখিত সারসংক্ষেপে বলা হয়, বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্তে বিএসএফ ও ভারতীয় নাগরিক কর্তৃক নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকদেরকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা ও আহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জবাবে বিএসএফ মহাপরিচালক সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রাতের বেলায় টহল জোরদার করে সীমান্ত হত্যার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সে ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি পূনর্ব্যক্ত করেন। উভয় পক্ষ যৌথভাবে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচি গ্রহণ, সীমান্তের অলঙ্ঘনীয়তা সম্পর্কে প্রেষণা প্রদান এবং অপরাধীদের আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম প্রতিরোধের মাধ্যমে এ ধরনের আক্রমণ, নির্যাতন ও হামলার ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনার বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়। বিজিবি মহাপরিচালক বিএসএফ অবৈধভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি, ভারতীয় নাগরিক ও বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক (ঋউগঘ) বাংলাদেশে পুশইনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানান। বিএসএফ মহাপরিচালক ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদেরকে পারস্পরিকভাবে সম্মত প্রক্রিয়া অনুযায়ী ফেরত পাঠানোর আশ্বাস দেন। সীমান্ত দিয়ে মাদক, অস্ত্র-গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক দ্রব্য, স্বর্ণ, জাল মুদ্রা নোট (ঋওঈঘ) এবং অন্যান্য চোরাচালান প্রতিরোধে ‘সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (ঈড়ড়ৎফরহধঃবফ ইড়ৎফবৎ গধহধমবসবহঃ চষধহ-ঈইগচ)’এর গুরুত্ব তুলে ধরে উভয় পক্ষ পাচার ও পাচারকারীদের রিয়েল-টাইম তথ্য শেয়ার এবং অধিক সতর্কতার মাধ্যমে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সতর্ক ও দৃঢ় থাকার বিষয়ে একমত হয়। উভয় পক্ষ সীমান্তবর্তী জনগণকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, মানবপাচার, সীমান্ত স্তম্ভ উপড়ে ফেলা ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ থেকে বিরত রাখার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে একমত হয়। সার্বিকভাবে উভয় পক্ষ সীমান্তের অলঙ্ঘনীয়তা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। উভয় পক্ষ সীমান্ত শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে পূর্ব অনুমোদন ছাড়া কোনো উন্নয়নমূলক কাজ না করার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকায় চলমান উন্নয়নমূলক কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে একমত হয়। এছাড়া যৌথ নদী কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ সহজতর করা এবং সীমান্তবর্তী অভিন্ন নদীগুলোতে অননুমোদিত কাজ বন্ধ রাখার ব্যাপারে একমত হয়। ‘কানেক্টেড বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় তিনবিঘা করিডরের মাধ্যমে দহগ্রামকে সংযুক্ত করার জন্য অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে বিএসএফ মহাপরিচালক ভারতের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/সংস্থার কাছে উপস্থাপন করে তা সমাধানের আশ্বাস দেন। উভয় প্রতিনিধিদল আন্তঃসীমান্তে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী অবস্থান করলে সে ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন এবং রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে তাদের সন্ত্রাসী কর্মকা- প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে একমত হন। বিজিবি মহাপরিচালক ফেনীর মুহুরীর চর এলাকায় স্থায়ী সীমান্ত পিলার নির্মাণ এবং ইছামতি, কালিন্দী, রায়মঙ্গল ও হারিয়াভাঙ্গা নদী এলাকায় সীমান্ত রেখা নির্ধারণের কাজ সম্পন্নের ব্যাপারে জোর তাগিদ দেন। বিএসএফ মহাপরিচালক এ বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/সংস্থার কাছে উপস্থাপন করে তা সমাধানের আশ্বাস দেন। উভয় পক্ষ কোনো ধরনের আকাশসীমা লঙ্ঘন না করার বিষয়ে একমত হয়। ভবিষ্যতে যাতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি না ঘটে সেজন্য পূর্বনির্ধারিত ফ্লাইট সম্পর্কে রিয়েল-টাইম তথ্য শেয়ারের মাধ্যমে পরস্পরকে অবহিত করার বিষয়ে সম্মতি জানায়। উভয় পক্ষ নিজ নিজ দেশের গণমাধ্যমে পরস্পর বিরোধী বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার /গুজব ছড়িয়ে সীমান্তে যাতে কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি না হয় সে ব্যাপারে উভয় দেশের গণমাধ্যমকে পরামর্শ প্রদানের বিষয়ে একমত হয়।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button