জাতীয় সংবাদ

জোরালো হচ্ছে জাপা নিষিদ্ধের দাবি

জাতীয় পার্টিকেও নিষিদ্ধ চায় জামায়াত-হেফাজত
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক

প্রবাহ রিপোর্ট : ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে জাতীয় পার্টিকেও নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে গণঅধিকার পরিষদের আন্দোলন এবং দলটির প্রধান ভিপি নূরের ওপর হামলার পর থেকে দেশব্যাপী জাপা নিষিদ্ধেও দাবিতে তৎপর দলটির নেতা-কর্মীরা। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে জাপা কার্যালয়ে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চাপে পড়ে তাদের ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দলের খেতাব পাওয়া জাতীয় পার্টিও। কারণ, শেখ হাসিনার পাতানো নির্বাচন যখন সব বড় দলগুলো বর্জন করেছে, তখন তারা ভোটে গিয়ে বিরোধী দল হয়েছে এবং কার্যত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ‘হাতের পুতুল’ হয়ে সংসদে থেকেছে। ফলে গত বছরের ৫ আগস্টের পর অর্ন্তর্বতী সরকার দায়িত্ব নিলে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবির সঙ্গে দলটির দোসর হিসেবে জাতীয় পার্টির নেতাদের বিচারের দাবিও উঠতে শুরু করে। বিক্ষিপ্ত ভাবে ওঠে তাদের নিষিদ্ধের দাবিও। পরে সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে জাপা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যায়। তবে হঠাৎ করে আবারও বিতর্কের কেন্দ্রে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ফের চাপে দলটি। এবারের চাপটা প্রবল, সঙ্গে পতিত আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে জোরেশোরে উঠেছে তাদের নিষিদ্ধের দাবি। রাজনীতির মাঠসহ সামাজিক মাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক শোরগোল।
যে কারণে জাপা নিষিদ্ধের দাবি জোরালো হচ্ছে : জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন এই দলটি ‘গণহত্যাকারী’র তকমা পাওয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ। গণঅভ্যুত্থানের আগে চুপচাপ সমর্থন জানালেও গত এক বছর ধরে দলটি দাবি করছে, তারা হাসিনার দুঃশাসনের প্রতিবাদ করেছিল এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছিল।
অন্যদিকে আবার জাপার চেয়ারম্যান বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রতিবাদও করছেন। পাশাপাশি টানা ১৬ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে না দিলে সেটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না বলেও মন্তব্য করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। এমন দ্বিচারিতার জন্য জাপা নিষিদ্ধের দাবি আগে থেকেই ছিল, নুরের ওপর হামলার পর সেটি আরও জোরালো হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠকে আগামী জাতীয় নির্বাচন ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় উঠে আছে। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় বৈঠক শেষে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে ব্রিফ করেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করার জন্য করণীয় এবং ষড়যন্ত্র মোকাবিলা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন- সংস্কার, বিচার এবং সুষ্ঠু নির্বাচন। তাহের বলেন, একটা নীলনকশার নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি কিনা, এমন প্রশ্ন উঠেছে। লন্ডনে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা- এটি নজিরবিহীন। সরকারের নিরপেক্ষতা ক্ষুণœ হয়েছে। পরিকল্পিত নির্বাচন হলে গণতন্ত্রকামী মানুষদের পক্ষে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সংকুচিত হয়ে যাবে। নির্বাচনের তারিখের ব্যাপারে দ্বিমত নেই, দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই জানিয়ে তিনি বলেন, তবে নির্বাচনের কার্যকারিতার ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেছি। ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করা ৩১টি দলের মধ্যে ২৫টি দল পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন চায় জানিয়ে তিনি বলেন, কেউ শুধু উচ্চকক্ষে চায়, জামায়াতসহ অনেকে উভয়কক্ষে পিআর চায়। কেন্দ্র দখল ঠেকাতে এই নতুন পদ্ধতিতে নির্বাচন জরুরি। মেজরিটিকে অবজ্ঞা করে কারও চাপে নির্বাচনে গেলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আমাদের জন্য নির্বাচনে যাওয়া সংকুচিত হয়ে যাবে। দুয়েকটি দল জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে অভিযোগ করে তাহের বলেন, প্রধান উপদেষ্টার কাছে আইনি ভিত্তির দাবি জানিয়েছে জামায়াত। জুলাই সনদের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। বাস্তবায়ন না হলে জুলাই শহীদদের প্রতি বিশ^াসঘাতকতা করা হবে। এই সরকার দখলদারদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিতে পারেনি জানিয়ে তিনি বলেন, আগে এক গ্রুপ বাসস্ট্যান্ড দখলে নিয়েছে। এখন আরেক গ্রুপ নিয়েছে। এই সরকার কীভাবে নির্বাচন করবে, তা নিয়ে শঙ্কিত, কিছুটা উদ্বিগ্ন। মনে হচ্ছে, সরকার হাত-পা ছেড়ে দিয়েছে। সরকারকে এখন আরও কঠোর হতে হবে। এখনও এর থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব। জুলাই সনদ নিয়ে একটি দলই বাধা দিচ্ছে উল্লেখ করে তাহের বলেন, জুলাই সনদ, পিআর নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়া উচিত। তারা গণভোটে সিদ্ধান্ত নেবে। সরকারের উচিত স্টেকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। রাজনৈতিক দলগুলোকেও নিজেদের মধ্যে আলোচনা করা উচিত। নুরুল হক নুরের ওপর হামলার ঘটনায় দোষীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, নুরের ওপর হামলার ষড়যন্ত্র গভীরে। সবার বিচার হতে হবে। আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে জাতীয় পার্টি কাজ করেছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, জাতীয় পার্টির ব্যাপারেও একই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বৈঠকে ফ্যাসিবাদের দালালদের প্রশাসন থেকে সরানোর দাবি জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রেস ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন- জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও ড. হামিদুর রহমান আযাদ।
জাপা নিষিদ্ধে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছেন রাশেদ : জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করতে অর্ন্তর্বতী সরকারকে ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান। শনিবার (৩০ আগস্ট) দলের কার্যালয়ের সামনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই দাবি জানিয়েছেন।
রাশেদে বলেছেন, ‘শুক্রবারের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ করতে হবে। এছাড়া আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করতে হবে।’
একই ইচ্ছা হেফাজতে ইসলামেরও : ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশও। শনিবার (৩০ আগস্ট) বিকালে এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটির মহাসচিব মাওলানা সাজেদুর রহমান ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব এ দাবি জানান।
নেতৃদ্বয় নুরের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানান এবং বলেন, ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদের চিহ্নিত এজেন্ট জাতীয় পার্টিকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষিদ্ধ করতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাই। জাতীয় পার্টিকে ঘিরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদ পুনর্বাসনের অপচেষ্টা সফল হতে দেওয়া হবে না, ইনশাআল্লাহ।’
নিষিদ্ধের ব্যাপারে অ্যাটর্নি জেনারেল যা বলছেন : বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের সব বিতর্কিত নির্বাচন ও জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগের দমন-পীড়নে জাতীয় পার্টি সহযোগিতা করেছে বলে অভিযোগ অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের। তিনি বলেছেন, ‘জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের যে দাবি উঠেছে, এর আইনগত দিক যাচাই-বাছাই করে কী করা যায় দেখব।’
শনিবার (৩০ আগস্ট) ঝিনাইদহে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কার্যালয় উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের প্রশ্ন, ‘গণহত্যা, সন্ত্রাস ও ফ্যাসিবাদের কারণে যদি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হতে পারে, তবে জাতীয় পার্টি কেন নিষিদ্ধ হবে না?’ তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টি ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেশের মানুষের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছে, মানুষের রক্ত নিয়ে খেলেছে।’
এদিকে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোই নয়, জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবি তুলেছে নেটমাধ্যমের বহু মানুষ। ফলে এই মুহূর্তে দারুণ বেকায়দায় জিএম কাদেররা। একে তো দলের মধ্যে দফায় দফায় ভাঙন, সেইসঙ্গে ‘মড়ার উপর খাড়ার ঘা’ হিসেবে চারিদিক থেকে নিষিদ্ধের দাবি। অদূর ভবিষ্যতে কী আছে দলটির ভাগ্যে, সেদিকেই তাকিয়ে গোটা দেশ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button