এবার পার্বত্য তিন জেলাতেই অবরোধের ঘোষণা, নতুন ৮ দাবি

খাগড়াছড়িতে সহিংসতায় সেনাবাহিনীর বিবৃতি
প্রবাহ রিপোর্ট : খাগড়াছড়িতে চলমান অবরোধ কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের বাকি দুই জেলা রাঙামাটি ও বান্দরবানকে। এবার তিন পার্বত্য জেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে জুম্ম ছাত্র-জনতা ফ্রন্ট। এ ফ্রন্টের ব্যানারে তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তিন জেলায় অবরোধের বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। তবে এটিতে স্বাক্ষর নেই কোনো ছাত্র নেতার। শুধু অবরোধের আওতা বাড়েনি, নতুন বিজ্ঞপ্তিতে বাড়ানো হয়েছে দাবির সংখ্যাও। এর আগে একটি ধর্ষণ সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করলেও অবরোধ পালনকারী জুম্ম ছাত্র-জনতা ফ্রন্ট এবার সেখান থেকে সরে এসে আট দফা দাবি উপস্থাপন করেছে। দাবিগুলো হলো-
১। আলোচনার প্রারম্ভকাল থেকে পরবর্তী সময়ে পর্যন্ত যেকোনো প্রকার হামলা, সহিংসতা বা ভীতি প্রদর্শন রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনিভাবে বাধ্য থাকবে এবং সেই নিশ্চয়তা প্রদান করবে।
২। ধর্ষণ মামলার অবশিষ্ট দুই আসামিকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে। ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার আসামি চয়ন শীলের বিচার ত্বরান্বিত করে দ- কার্যকর করা ও তা সরকারি গেজেটে বিজ্ঞাপন করে প্রকাশ করতে হবে। ভুক্তভোগীকে পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
৩। ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি ও গুইমারায় ঘটে যাওয়া সেনা-ও-সেটলারদের দ্বারা লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও গুলিবর্ষণের ঘটনাসহ সমস্ত ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ সংবেদনশীল আইনি তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। এই বিষয়ে একটি অফিসিয়াল তদন্ত প্রতিবেদন আমাদেরকে ৩০ দিনের মধ্যে প্রদান করতে হবে।
৪। নিরীহ ও নিরস্ত্র জুম্ম ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত বর্বরোচিত হামলা, দোকানপাট ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগে সৃষ্ট ক্ষতির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ প্রদান রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আহত সবার সুচিকিৎসার দায়ভার জেলা/রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ বহন করবে।
৫। শান্তিপূর্ণ অবরোধ ক্ষুণ্ন করা, সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় বিনা উসকানিতে আক্রমণ এবং জুম্ম আদিবাসীদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত করা হলে সে সবের পূর্ণ ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়সঙ্গত প্রতিকার দিতে হবে।
৬। চলমান আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আটক সব জুম্ম ছাত্র-জনতাকে অবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। একইসঙ্গে ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর সংঘটিত হামলাসমূহের স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত সম্পন্ন করে দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৭। আলোচনার টেবিলে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি ছাত্র-জনতা প্রতিনিধির এবং অন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৮। ১৪৪ ধারা বাতিল করতে হবে।
উপরোক্ত দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হলে তারা আরও কঠোর এবং সুসংগঠিত আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে জুম্ম ছাত্র ফ্রন্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) থেকে খাগড়াছড়িতে তারা শান্তিপূর্ণ অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ সততার সঙ্গে পালন করে আসছিল। কিন্তু গত কয়েকদিনে খাগড়াছড়ি শহরজুড়ে সেনাবাহিনীর ব্যাপক তল্লাশি, মারধর ও ধারপাকড়ের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে- যা কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। তদুপরি গুইমারায় জুম্ম ছাত্র-জনতার ওপর সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণ এবং সেটলারদের দ্বারা দোকানপাট ও বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের নির্মম প্রতিবেদন এসেছে।
সেনা ও সেটলারদের হামলায় ‘চার জন নিহত’ এবং বহু জন আহত হয়েছেন দাবি করে এই বর্বরতা ও ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতির কঠোরভাবে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন অবরোধকারীরা। তারা প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, তাদের বোনের প্রতি হওয়া ন্যায়হীনতা, সাম্প্রদায়িক উৎপাত, সেনাবাহিনীর গুলিতে হত্যা অথবা সেটলারদের নির্মমতাগুলো সুস্থ বিচার না হওয়া পর্যন্ত লড়াই জারি রাখবেন এবং তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলায় তাদের সড়ক অবরোধ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হলো এবং সব পর্যটন কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ থাকবে।
১৪৪ ধারা বলবৎ: এদিকে খাগড়াছড়ি জেলার দুই উপজেলায় (সদর ও গুইমারা) জারি করা ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার হয়নি। ফলে দোকানপাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ আছে। অনেক বিসিএস পরীক্ষার্থী, যাদের ঢাকায় ভাইভা পরীক্ষা চলছে তারাসহ অনেক পর্যটক খাগড়াছড়িতে আটকে আছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যস্ত থাকলেও ভুক্তভোগীদের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসক এ বি এম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার।
নিহত ৩ জনের লাশ মর্গে: গত রোববার (২৮ সেপ্টেম্বর) অবরোধ চলাকালে গুইমারার রামসু বাজার ও আশপাশের এলাকায় নিহত তিন জনের লাশ খাগড়াছড়ি আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে আছে মর্মে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের। তবে তিনি তাদের নাম-ঠিকানা ও পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি। গতকাল সোমবার লাশগুলোর ময়নাতদন্ত হবে বলে জানিয়েছেন।
অস্ত্র উদ্ধার: গত রোববার বিকালে বান্দরবান থেকে কাপ্তাই ও রাঙামাটি হয়ে খাগড়াছড়ি যাওয়ার পথে কাপ্তাই বিজিবি কর্তৃক ওয়াগ্গাছড়া চেকপোস্টে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা পুলিশ সুপার আরেফিন জুয়েল। তিনি জানান, পার্বত্য চুক্তি বিরোধী সংগঠন ইউপিডিএফ এসব দেশীয় অস্ত্র, বিশেষ করে ধারালো রামদা খাগড়াছড়ি নিয়ে যাচ্ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়ের চলমান পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করা। এ ঘটনায় উদ্ধার অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে প্রক্রিয়া চলছে।
স্থবির জনজীবন: খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলায় অবরোধ সম্প্রসারিত হওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। বাজার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সংকটে পড়েছে সাধারণ মানুষ। অফিস আদালত খোলা থাকলেও উপস্থিতি নেই বললেই চলে। থমথমে পরিস্থিতি চারদিকে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সুপার আরেফিন জুয়েল। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টার রোববারের দেওয়া নির্দেশনার আলোকে প্রতিটা পয়েন্টে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে অবরোধ শিথিল: খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য জেলায় জুম্ম ছাত্র-জনতার ব্যানারে ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে শিথিল করা হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুর ১২টা থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অবরোধ শিথিল ঘোষণা করেছে জুম্ম ছাত্র-জনতা। সকালে জুম্ম ছাত্র-জনতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের অফিসিয়াল পেজ থেকে এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক বাদে বাকি সব জায়গায় নিয়মিত অবরোধ চলবে বলেও বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয়। অবরোধ শিথিল হওয়ার পর থেকেই খাগড়াছড়ির বিভিন্ন টিকিট কাউন্টারে যাত্রীদের ভিড় লক্ষ করা যায়। শহর থেকে দূরপাল্লার বাস, মাইক্রোবাসসহ অন্যান্য গাড়ি দুপুর ১২টার পর থেকে ছেড়ে যেতে শুরু করেছে। যাত্রীদের মধ্যে বেশিরভাগই খাগড়াছড়ি, সাজেকসহ বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণে আসা পর্যটক। তিন দিন ধরে আটকে থাকা সুলতান আহমেদ, রাজীব রহমান, নাজিম উদ্দিনসহ আরও বেশকিছু পর্যটক তারা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে খাগড়াছড়ি ও সাজেকে ভ্রমণের জন্য আসলে অবরোধের কারণে আটকে যান। সাজেক থেকে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় খাগড়াছড়িতে এসেছেন। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় নিজ গন্তব্যে যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছেন। তবে যেকোনো ধরনের ভোগান্তি এড়াতে, পাহাড়ের শান্তি, সম্প্রীতি, পর্যটন, অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য অবরোধ ও সহিংসতায় না জড়িয়ে সবার সমন্বয়ে শান্তি স্থাপন করার অনুরোধ জানান তারা। জেলা পুলিশ সুপার মো. আরেফিন জুয়েল জানান, খাগড়াছড়ির শহর, পৌর শহরসহ প্রতিটি উপজেলায় যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তৎপর রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অবরোধের কারণে যে সমস্ত পর্যটক ও যানবাহন আটকা পড়েছিল, তাদেরকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
অপরদিকে, খাগড়াছড়ি ও গুইমারায় সহিংসতা নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। গত রোববার রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে জানায়, গত ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে মোটরসাইকেল চালক মামুন হত্যাকে কেন্দ্র করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) মূল এবং অঙ্গসংগঠনগুলো দীঘিনালা ও রাঙামাটিতে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ফলশ্রুতিতে তিন জন নিহত সহ বেশ কিছু এলাকাবাসী আহত হয়। এতে বলা হয়, গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর এর ঘটনার এক বছর পূর্তি হিসাবে এই বছর ইউপিডিএফ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিল এর আয়োজন করে এবং অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা করে। আইএসপিআর জানিয়েছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে খাগড়াছড়ির সিঙ্গিনালা এলাকায় এক স্কুলছাত্রীর ধর্ষণের অভিযোগকে আমলে নিয়ে ইউপিডিএফ (মূল) এর দাবি করা সন্দেহভাজন শয়ন শীলকে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় গত ২৪ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করা হয় এবং পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে নেওয়া হয়। ঘটনাটির সত্যতা বিচারে আইনি প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। শয়ন শীলকে গ্রেপ্তার করা সত্ত্বেও ইউপিডিএফ-এর অঙ্গসংগঠন পিসিপি-এর নেতা উখ্যানু মারমা ‘জুম্ম ছাত্র জনতার’ ব্যানারে গত ২৪ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ মিছিল এবং প্রতিবাদী মানববন্ধনের ডাক দেয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৫ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফ-এর আহ্বানে খাগড়াছড়িতে অর্ধবেলা হরতাল পালন হয়। একই সময় দেশে বিদেশে অবস্থানরত ব্লগার এবং পার্বত্য অঞ্চলের কিছু দায়িত্বশীল ব্যাক্তিরা অনলাইনে বাঙালিদের উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন রকম অপপ্রচার ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফ-এর কর্মী উখ্যানু মারমার নেতৃত্বে এবং সামাজিক মাধ্যমে দেশি ও প্রবাসী ব্লগারসহ পার্বত্য জেলার কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তির উস্কানিমূলক প্রচারণার প্রভাবে সমগ্র খাগড়াছড়িতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অবরোধ চলাকালে এক পর্যায়ে ইউপিডিএফ-এর প্ররোচনায় উশৃঙ্খল এলাকাবাসী টহলরত সেনাদলের ওপর ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। ফলশ্রুতিতে তিন জন সেনা সদস্য আহত হয়। সার্বিক পরিস্থিতি এবং উসকানির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সেনাবাহিনী অত্যন্ত ধৈর্য্য, সংযম ও মানবিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে এবং বল প্রয়োগ থেকে বিরত থাকে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ইউপিডিএফ এবং অঙ্গ সংগঠনের কর্মীরা আবারো দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টির চেষ্টা চালায় এবং বিভিন্ন স্থানে বাঙালি সহ সাধারণ মানুষের উপর গুলি, ভাঙচুর, অ্যাম্বুলেন্সে আক্রমণ এবং রাস্তা অবরোধসহ নাশকতা করে সমগ্র খাগড়াছড়ি পৌরসভা এলাকার আইনশৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটায়। এদিন দুপুর নাগাদ সামগ্রিক বিষয়টি পাহাড়ি-বাঙালির একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপ নেয়। অবস্থা বিচারে জেলা প্রশাসন খাগড়াছড়ি ও গুইমারা এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। এমতাবস্থায়, সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী চরম ধৈর্য্যের সঙ্গে সারা রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এবং একটি অবশ্যম্ভাবী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিহত করা সম্ভবপর হয়। খাগড়াছড়ি পৌরসভা এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির অপচেষ্টা ব্যর্থ হবার পর ইউপিডিএফ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো ২৮ সেপ্টেম্ব সকাল থেকে খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা উপজেলার রামসু বাজার এলাকায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সাধারণ জনগণকে উস্কে দিয়ে রাস্তা অবরোধ করে গুইমারা-খাগড়াছড়ি রাস্তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়। সকাল সাড়ে ১০টায় ইউপিডিএফ কর্মী এবং সন্ত্রাসীরা এলাকার বাঙালি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়াতে লিপ্ত হয়। এই পর্যায়ে সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে তারা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র, ইট-পাটকেল, গুলতি ও লাঠিসোটা নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে সেনাবাহিনীর ওপর হামলা চালায়। এতে সেনাবাহিনীর ৩ জন অফিসারসহ ১০ জন সদস্য আহত হয়। একই সময় তারা রামগড় এলাকায় বিজিবির গাড়ি ভাঙচুর করে এবং বিজিবি সদস্যদের আহত করে। সংঘর্ষ চলাকালীন আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে রামসু বাজারের পশ্চিম দিকে অবস্থিত উঁচু পাহাড় থেকে ইউপিডিএফ (মূল) সশস্ত্র দলের সদস্যরা ৪ থেকে ৫ বার অটোমেটিক অস্ত্র দিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত পাহাড়ি, বাঙালি এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত সেনাসদস্যদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ১০০ থেকে ১৫০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। এতে, ঘটনাস্থলে সংঘর্ষে লিপ্ত এলাকাবাসীর মধ্যে অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়। এমতাবস্থায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনীর টহল দল দ্রুত সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ধাওয়া করার লক্ষে সেই এলাকায় যায়। সেনাবাহিনীর তৎপরতায় সশস্ত্র দলটি দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে। সমসাময়িক সময়ে রামসু বাজার এবং ঘরবাড়িতে ইউপিডিএফ (মূল) এর বহিরাগত দুষ্কৃতিকারীরা অগ্নিসংযোগ করে এবং বাঙালিদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় লিপ্ত হয়। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রামসু বাজার এবং গুইমারা এলাকায় অতিরিক্ত সেনাদল নিয়োগ করা হয় এবং বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। আইএসপির আরও জানায়, বিগত কয়েকদিনের ঘটনা পর্যবেক্ষণে এটি স্পষ্ট যে, ইউপিডিএফ এবং তার অঙ্গসংগঠনগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে এলাকার মহিলা এবং স্কুলগামী কোমলমতি শিশুদের বিভিন্ন পন্থায় তাদের নাশকতামূলক কর্মকা-ে অংশগ্রহণে বাধ্য করছে। একই সঙ্গে পার্বত্যাঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠনের জন্য বহিরাগত সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রসহ পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে আসার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিকালে বিজিবির কাপ্তাই ব্যাটালিয়নের স্থাপিত চেকপোস্টে ইউপিডিএফ-এর সন্ত্রাসী সংগঠনের পরিবহন করা বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র যাত্রীবাহী বাস থেকে জব্দ করা হয়। বিগত ১৯ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত খাগড়াছড়ি এবং গুইমারা এলাকায় বিভিন্ন ঘটনাকে পুঁজি করে আইনের আশ্রয় না নিয়ে পার্বত্য অঞ্চলকে অস্থিতিশীল এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংগঠনের বিষয়টি একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ বলে প্রতীয়মান হয়। এই বিষয়ে বিভিন্ন প্রমাণাদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সংরক্ষিত আছে। বিগত কয়েকদিনের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পার্বত্য অঞ্চলের সব জাতিগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দলের নেতারা ও জনসাধারণকে সংযত আচরণ করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সেনাবাহিনীসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগীতা করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। সব ধরণের অপপ্রচার, মিথ্যা প্রচারণা, উস্কানিমূলক কর্মকা- সত্ত্বেও সেনাবাহিনী বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য এই অংশের অখ-তা রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। পার্বত্য চট্টগ্রামের সব জাতিগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাবাহিনী যে কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।



