শিক্ষাঙ্গনে যৌন হয়রানি নির্মূলে কঠোর হচ্ছে সরকার

নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় গাইডলাইন
প্রবাহ রিপোর্ট : দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি নির্মূলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক আদেশের আলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) একটি গাইডলাইন প্রস্তুত করেছে, যা বর্তমানে মন্ত্রণালয়ের নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রস্তাবিত নতুন গাইডলাইনে শারীরিক স্পর্শের গ-ি পেরিয়ে ইমেল-এসএমএস বা সোশ্যাল মিডিয়ায় উত্যক্ত করা, ব্ল্যাকমেইল কিংবা প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হুমকি দেওয়াকেও এই প্রথম গুরুতর অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রফেসর বি. এম. আব্দুল হান্নান জানান, নারীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে দেশে এই প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন প্রণীত হতে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘গাইডলাইনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পাঠিয়েছি। এটি অনুমোদিত হলে মাউশির আওতাধীন সারা দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোর কর্তৃপক্ষকে বাধ্যতামূলকভাবে নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’
মহাপরিচালক আরও বলেন, এই গাইডলাইনটি শুধু নারীরা কর্মক্ষেত্রেই নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেয়ে শিক্ষার্থী, নারী শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুরক্ষা দেবে।
সরকারি এক নথি অনুযায়ী, গত বছরের ১২ নভেম্বর গাইডলাইনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদেনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের সহকারী পরিচালক কামরুন নাহার বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনার আলোকে আমরা একটি সময়োপযোগী গাইডলাইন প্রস্তুত করেছি। প্রণীত এই গাইডলাইনটি মন্ত্রণালয়ের নীতিগত অনুমোদন পেলে দেশের মাঠ পর্যায়ের সকল শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
তিনি জানান, এই গাইডলাইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাউশির অধীন দেশের বিভিন্ন শিক্ষা দপ্তর, সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিনের ভয়ের সংস্কৃতি দূর হবে এবং একটি নারীবান্ধব শিক্ষা প্রশাসন ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
মাউশির তৈরিকৃত প্রস্তাবিত গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নারী প্রধান পাঁচ সদস্যের বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন, ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার কঠোরতা এবং অপরাধীকে সাময়িক বরখাস্তের মতো কঠোর প্রশাসনিক বিধান যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে খসড়া গাইডলাইন নীতিতে স্রেফ শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই নয়, বরং ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা, এমনকি মহাপরিচালক বরাবর আপিলের সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত গাইডলাইনে যৌন হয়রানির সংজ্ঞাকে সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক বিস্তৃত করা হয়েছে। শুধু শারীরিক স্পর্শই নয়, বরং ফোন, ইমেইল, এসএমএস বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপত্তিকর বার্তা পাঠানো, পর্নোগ্রাফি প্রদর্শন এবং ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যে ভিডিও ধারণ করাকেও যৌন হয়রানি হিসেবে গণ্য করা হবে।
গাইডলাইন অনুযায়ী, যৌন আবেদনমূলক উক্তি, শিস দেওয়া, অশালীন ভাষা বা মন্তব্যের মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করা। ফোন, এসএমএস, ই-মেইল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি, কার্টুন বা বার্তা পাঠানো। চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে স্থির বা ভিডিও চিত্র ধারণ, সংরক্ষণ বা প্রচার করা। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা বা প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হুমকি প্রদান। যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণে রাজি না হওয়ায় পরীক্ষায় নম্বর কমিয়ে দেওয়া বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করাকেও অপরাধের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গাইডলাইন মতে, যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা তদন্তে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পাঁচ সদস্যের একটি শক্তিশালী ‘অভিযোগ কমিটি’ গঠন করা বাধ্যতামূলক। এই কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য হতে হবে নারী। সম্ভব হলে কমিটির প্রধান বা আহ্বায়ক হবেন একজন নারী। প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকে দুইজন বিশেষজ্ঞ সদস্য (বিশেষ করে যারা জেন্ডার ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন) অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমান স্থানে একটি ‘অভিযোগ বক্স’ স্থাপন করতে হবে।
গাইডলাইন অনুযায়ী, ভুক্তভোগী নিজে বা আইনজীবীর মাধ্যমে ঘটনার ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ (ফরম ‘ক’ অনুযায়ী) জমা দিতে পারবেন। তদন্তের ক্ষেত্রে কমিটি নিচের নিয়মগুলো অনুসরণ করবে। এর মধ্যে, অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগকারী ও অভিযুক্তের পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখতে হবে। কমিটিকে অভিযোগ পাওয়ার ৩০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
তবে বিশেষ ক্ষেত্রে যা সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো যাবে। অডিও-ভিজ্যুয়াল ডিভাইসের মাধ্যমে সাক্ষ্য রেকর্ড করা যাবে। তবে ভুক্তভোগীকে কোনো অপমানজনক প্রশ্ন করা যাবে না। কেউ যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে, তবে তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হবে।
গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক কমিটিতে বিচার না পেলে বা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে ভুক্তভোগীর জন্য উচ্চতর পর্যায়ে আবেদনের সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থ্যাৎ কলেজ পর্যায়ের জন্য আঞ্চলিক পরিচালক এবং স্কুলের জন্য আঞ্চলিক উপ-পরিচালক বরাবর আপিল করা যাবে। সর্বশেষ ধাপ হিসেবে ভুক্তভোগী সরাসরি মাউশি মহাপরিচালক বরাবর অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন।
প্রস্তাবিত নির্দেশিকায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে। গাইডলাইন অনুযায়ী, অভিযোগের তদন্ত চলাকালীন এবং অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে (ছাত্র ব্যতিরেকে) সাময়িকভাবে বরখাস্ত করবেন। অভিযুক্ত যদি শিক্ষার্থী হয়, তবে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী তাকে নিয়মিত ক্লাস করা থেকে বিরত রাখা হবে।
যৌন নিপীড়নের অভিযোগকে ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। সকল সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের শৃঙ্খলা বিধি অনুসারে, কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ প্রাপ্তির ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যদি কোনো অভিযোগ দ-বিধি বা দেশের প্রচলিত অন্য কোনো আইনের আওতায় গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, তবে ভুক্তভোগী পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট আদালতের দ্বারস্থ হয়ে আইনি লড়াই চালানোর পূর্ণ অধিকার পাবেন।
গাইডলাইনে কেবল বিচারের কথা বলা হয়নি, বরং প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠান প্রধানদের প্রতি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রথমত: নারী ও পুরুষ সহকর্মীদের মধ্যে নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত: শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ বা কর্মসূচির আয়োজন করা। তৃতীয়ত: যৌন হয়রানির নেতিবাচক প্রভাব ও বিদ্যমান আইন সম্পর্কে নিয়মিত কাউন্সেলিং ও সচেতনতা সভা করতে হবে। চতুর্থত: সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারসমূহ সহজ ভাষায় নোটিশ বোর্ডে টাঙিয়ে রাখতে হবে।
এ ছাড়া তাৎক্ষণিক সহায়তার জন্য জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ (নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ), ৯৯৯ (পুলিশি সহায়তা) এবং ১৬৪৩০ (আইনি সহায়তা) নম্বরগুলো ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।



