জীবিকা হারাচ্ছে উপকূলবাসী

প্রবাহ রিপোর্ট : জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে দক্ষিণ পশ্চিম অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। প্রতিবছর সিডর আইলা ও আম্ফানের মত শক্তিশালী ঝড় তছনছ করছে গোটা উপকূলবাসীকে। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও খরায় জীবিকা হারানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চার কোটি মানুষ। ফলে ২০৫০ সালে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দেড় কোটিতে উন্নীত হতে পারে। একটি বিশেষ গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই তথ্য।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে এর অভিঘাত অধিকতর দৃশ্যমান। পুরুষ-নারী-শিশু সবাই এর প্রত্যক্ষ শিকার। বিশেষ করে নারীরা অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নারী-পুরুষ-শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ বহুমাত্রিক সামাজিক-পারিবারিক সংকট বাড়ছে। অপ্রতুল শিক্ষা, অসচ্ছলতা, অসচেতনতা ইত্যাদিও সংকটের ছায়া গাঢ় করছে। খুলনা উপকূলীয় এলাকার ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে সম্প্রতি বাদাবন সংঘ একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে। সমীক্ষায় প্রকাশ, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের চার কোটির বেশি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের নানানরকম ঝুঁকিতে পড়েছে। তথ্যমতে, যাদের ৮০ শতাংশই নারী। অর্থাৎ, দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠীই ঝুঁকিতে রয়েছে। আরেকটি সমীক্ষায় প্রকাশ, ২০৫০ সালের মধ্যে জিডিপির প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে কমারও আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোয় বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে। মারাত্মক অভিঘাত লাগছে জনস্বাস্থ্যে। বাড়ছে উদ্বাস্তুর সংখ্যা। উপকূলীয় অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানিতে বাড়ছে লবণাক্ততা। এ লবণাক্ততা বৃদ্ধিরও বিরূপ প্রভাব লক্ষণীয়। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মুখ্য পেশা মাছ ধরা। অর্থাৎ, তাদের বড় অংশই মৎস্যজীবী। উপকূলবাসীর জন্মনিরোধ ওষুধ ব্যবহারের প্রবণতা বেশি হওয়ায় প্রজননস্বাস্থ্যও সংকটের মুখে। সেইসঙ্গে বাড়ছে অন্য নানা রোগব্যাধিও।
মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাধার ভরাট, বন ধ্বংস, অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণ ইত্যাদি কর্মকা- দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ নষ্ট করেছে। দেশে বনভূমি ও জলাভূমির পরিমাণ ক্রমেই কমেছে। একটি আদর্শ শহরে প্রায় ২৫ শতাংশ বনভূমির কথা বলা হলেও এ দেশের কোনো শহরেই তা নেই। বিশ্বব্যাপী আশির দশক থেকেই শিল্পায়ন ও গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণকে কেন্দ্র করে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। নব্বইয়ের দশকে বিষয়টি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে।
বিষয়টি নিয়ে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বছরের পর বছর আলোচনা হলেও সমাধান মেলেনি। কিছু প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদির মেঘা টেকসই প্রকল্প। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ সূত্রিতা পরিহার ও দুর্নীতিমুক্ত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
এই দুর্যোগ মোকাবেলায় দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণ ও জলবায়ু ন্যায্যতা নিশ্চিত করার দাবিতে সম্প্রতি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘জলবায়ু ন্যায্যতা সমাবেশ-২০২৫’ অনুষ্ঠিত হয়। ১৪টি দেশের অন্তত ১৫ জন বিশিষ্ট পরিবেশবিদ, গবেষক, নীতিনির্ধারক ও সামাজিক আন্দোলনের নেতার উপস্থিতিতে সম্মেলনে সারা দেশ থেকে সহস্রাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত ৩০ বছরে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে, যার পেছনে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। একের পর এক ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, বন্যাসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা দুর্যোগে ভিটেমাটি, সহায়-সম্বল হারাচ্ছে মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার দেশের উপকূলীয় নারী-শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। উপকূলে ‘জীবনের লড়াই’ ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। পাশাপাশি অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
দুর্যোগকবলিত মানুষ লবণাক্ততার আগ্রাসন, নদ-নদী ও জলাশয় দখল ও দূষণসহ নানা কারণে পেশা হারাচ্ছে। অনেকে নিরুপায় হয়ে এক জেলা থেকে আরেক জেলা, রাজধানী অথবা দেশের বড় শহরগুলোতে আশ্রয় নিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রায় ৬০ শতাংশ ঢাকা, ২০ শতাংশ চট্টগ্রাম নগরী ও ২০ শতাংশ আন্তঃজেলায় অভিবাসী হয়েছে।
বাগেরহাটের রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, স্বাস্থসেবা প্রার্থীরা যে সেবা পান তা একেবারেই অপ্রতুল। উপকূলীয় অঞ্চলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর অনেকেই দায়িত্ব পালনে অনাগ্রহী। উপকূলীয় অঞ্চলের আরেক মানবিক সমস্যা বাল্যবিয়ে। এজন্য অর্থাভাব ও অসচেতনতাই মুখ্য দায়ী। এর ফলে পারিবারিক ও সামাজিক সংকটও প্রকট হচ্ছে। ২০২৪ সালে একটি সংস্থার সমীক্ষায় প্রকাশ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের কারণে উপকূলে বাল্যবিয়ের হার বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বাল্যবিয়ের হার কমলেও উপকূলে এ হার বাড়ছে দ্রুত। আর্থসামাজিক পরিস্থিতি এর জন্য দায়ী।



