নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী!

প্রবাহ রিপোর্ট : রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে দেশে নারীর ক্ষমতায়ন কার্যকরভাবে এগোচ্ছে না। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না, যার মূল কারণ দীর্ঘদিনের উপেক্ষা। রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের কেবল ব্যবহার করছে, অথচ জুলাই বিপ্লবে নারীরা প্রথম সারিতে থাকলেও বর্তমানে তাদের অবস্থার দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। নারী নেতৃত্ব বাড়ানোর বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিশ্চিত করতে হবে এমন মত দিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।
গতকাল বুধবার রাজধানীর সেন্টার অন ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক (সিরডাপ) মিলনায়তনে ‘নারী নেতৃত্ব, লৈঙ্গিক সমতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত অনুষ্ঠিত এই সংলাপে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা অংশ নেন। সংলাপে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট অঙ্গীকার এবং নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে নারীর নেতৃত্ব ও লৈঙ্গিক সমতা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়। সংলাপে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ নারী নেতৃত্ব জোটের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি নাসিম ফেরদৌস, রাজনীতিবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী, বাংলাদেশ নারী উদ্যোক্তা অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাসরিন ফাতেমা আউয়াল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. শাইখ ইমতিয়াজ, ট্রান্স ফেমিনিস্ট ও অধিকারকর্মী হো চি মিন ইসলাম, রাষ্ট্র সংস্কার ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি লামিয়া ইসলাম, গণ অধিকার পরিষদের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান, রবি আজিয়াটা করপোরেট সেলস ম্যানেজার ও ট্যাগরা বিডির প্রতিষ্ঠাতা তাহরিম খান জাহিদ, খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী মিনহাজুল আলম, অ্যাডভোকেট এলিনা খান এবং সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান। বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে নারীরা সব ধরনের সুযোগ পাবে। প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের বিষয়ে গবেষণার ফলাফল জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। সংসদে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা ও ট্রেড লাইসেন্স সহজ করা, স্বল্প সুদে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান জরুরি। পাশাপাশি জাতীয় নারী নেতৃত্ব একাডেমি ও মেন্টরশিপ কোর্স চালু, কর্মজীবী নারীদের জন্য ডে-কেয়ার ব্যবস্থা, সমান ছুটি ও বেতন এবং জাতীয় বাজেটে জেন্ডার রেসপন্সিভ বাজেট অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তারা। বক্তারা বলেন, আগামী নির্বাচনের পর নারীদের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. শাইখ ইমতিয়াজ বলেন, আমাদের সমাজে একটি সুস্পষ্ট শ্রেণিবিভাগ রয়েছে এবং গত ৩০ বছরে নারীরা আগের চেয়ে আরও বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। এটি একটি নীতিগত ব্যর্থতা। প্রায় ৭০ শতাংশ নারী নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না, যার মূল কারণ নারীদের উপেক্ষা। রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের ব্যবহার করছে। জুলাই বিপ্লবে নারীরা প্রথম সারিতে থাকলেও বিপ্লবের পর তাদের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বেশি হলেও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। আমরা কি সত্যিকার অর্থে ইনক্লুসিভিটি নিশ্চিত করতে পারছি? নারীদের পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এই সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব। বর্তমানে নারীরা বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। ফারুক হাসান বলেন, মানুষ যখন নিজেদের সংখ্যালঘু হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে, তখন সেটি নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। বাস্তবে আমরা সবাই মানুষ নারী বা পুরুষ নির্বিশেষে। রাজনীতির বাইরেও আত্মীয়তাবাদ বাড়ছে, যা একটি গুরুতর সমস্যা। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠানেই নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের নেতৃত্ব বা ক্ষমতায়ন রোধ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি বলেন, দুঃখজনকভাবে কিছু মানুষ ধর্মীয় গ্রন্থের অংশবিশেষ ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে ভিত্তিহীন ধারণা তৈরি করেছে, যা এসব বাধাকে আরও শক্তিশালী করছে। বহু বছর অগ্রগতির পর আমরা কতটুকু এগিয়েছি সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি থাকলেও বাস্তবতা হলো, অল্পসংখ্যক নারীই শীর্ষ ক্ষমতার আসনে পৌঁছাতে পেরেছেন। আমার স্বপ্ন এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে বৈষম্য ও সহিংসতার কোনো স্থান থাকবে না এবং লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাই নেতৃত্ব দেওয়ার ও সমাজে অবদান রাখার সুযোগ পাবে। নাসিম ফেরদৌস বলেন, রাজনীতিতে নারীদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব খুব কমই দেখা যায়। যারা প্রতিনিধিত্ব পেয়েছেন, তারাও নারীদের জন্য প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেননি। নারী হিসেবে আমাদের সমান সুযোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোকে এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে নারীদের অন্তর্ভুক্ত না করলে তারা এগোতে পারবে না। সিজিএসর সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে নারী জনসংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি হলেও নারীর নেতৃত্ব খুব কম দেখা যায়। নারীদের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সংকীর্ণ। এসডিজির লক্ষ্য অনুযায়ী নারীদের নিয়ে অনেক অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিকভাবেও নারীদের নেতৃত্ব নিরুৎসাহিত করা হয়, এমনকি পরিবার থেকেই বাধা আসে। ২০২৪ সালের বিপ্লবে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল ইতিহাসে বিরল, কিন্তু বিপ্লবের পর তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। তিনি বলেন, নতুন রাজনৈতিক দলগুলোতেও নারীদের অংশগ্রহণ কম। নারী বিষয়ক কমিশন গঠিত হলেও তার প্রতিবেদন আদৌ কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই নারীর ক্ষমতায়ন থমকে আছে। ভালো নির্বাচন হলেও ভালো সরকার নাও আসতে পারে। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন কার্যকর না হলে নারীর নেতৃত্ব বাড়বে না। মানসিক পরিবর্তন ছাড়া এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই নারীর অধিকার নিয়ে নারীদেরই আরও জোরালোভাবে কথা বলতে হবে। আগামী নির্বাচনে নারীরা যেন স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন-এটাই প্রত্যাশা। নাজমুল হক প্রধান বলেন, নারীদের নেতৃত্ব আইনগতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। নির্বাচনের আগে আমাদের চিন্তাভাবনাকে আরও বিস্তৃত করতে পারলেই নারীর নেতৃত্ব বৃদ্ধি পাবে। শামা ওবায়েদ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। নির্বাচনে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট আসন না থাকলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারী কমিশনকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে এবং এ বিষয়ে সরকারের কোনো স্পষ্ট বক্তব্য নেই। তৃতীয় লিঙ্গকে মূলধারায় আনতে হবে। নারী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ সমাজে পূর্ণ অংশগ্রহণ করতে পারলেই দেশের উন্নয়ন সম্ভব। নাসরিন ফাতেমা আউয়াল বলেন, নারীদের সমস্যা শুরু হয় পরিবার থেকেই। অনেক পরিবার নারীদের কর্মজীবনে দেখতে চায় না। সমাজেও নারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ নেই। ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন, তথ্যের অভাবে অনেক নারী উদ্যোক্তা হতে পারেন না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত না হলে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া বলেন, নারীরা যে ক্ষমতার আসনের যোগ্য, তা তাদের কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই দেওয়া উচিত। মানসিকতা পরিবর্তনের মাধ্যমেই নারীদের প্রাপ্য সুযোগ ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা সম্ভব। কাজী মিনহাজুল আলম বলেন, নারীদের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য একটি নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ অপরিহার্য। একজন মানুষকে পুরুষ বা নারী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবেই দেখা উচিত এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান সুযোগ দেওয়া উচিত। হো চি মিন ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে অনেক অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর প্রতিফলন দেখা যায় না। বিএনপি যখন রুমিন ফারহানার মতো সম্ভাবনাময় নেতৃত্বকে বাদ দেয়, তখন হতাশা তৈরি হয়। আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। লামিয়া ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনে নারীদের ব্যবহার করা হলেও বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে তাদের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান বদ্ধমূল ধারণার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে হবে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও নীতিনির্ধারণে নারীদের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে নারীদের অধিকার সুরক্ষিত হবে।



