সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে গুজব-অপপ্রচার চলছে: গভর্নর

প্রবাহ রিপোর্ট : সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে দেশে পরিকল্পিত গুজব ও অপপ্রচার চলছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল টাকা দিয়ে মানুষকে উসকানি দিচ্ছে, তবে এসব অপচেষ্টা টিকবে না। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমরা গণতান্ত্রিক চর্চায় বিশ্বাস করি। প্রতিবাদের অধিকার সবার আছে। কিন্তু কাজের মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করতে চাই- গ্রাহকদের আমরা সন্তুষ্ট করতে পেরেছি। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের মুনাফা দেওয়া প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, সরকার সবকিছু একা বহন করতে পারে না। পৃথিবীর সব জায়গায়ই বেয়ার্ডেন শেয়ারিং হয়। তিনি বলেন, কিছু আমানতকারী দুই বছরের জন্য মাত্র ৪ শতাংশ মুনাফা পেয়েছেন, কিন্তু এর আগের বছরগুলোতে তারা ১২ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা পেয়েছেন। সামনের দিনগুলোতেও তারা ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করে মুনাফা পাবেন। তাহলে প্রশ্ন হলো- আর কী চাই? গভর্নর বলেন, সরকার জনগণের টাকায় এই ব্যাংককে অস্বাভাবিকভাবে সহায়তা করেছে।আমার প্রত্যাশার তুলনায় সরকার অনেক বেশি সহায়তা দিয়েছে। এজন্য আমানতকারীদের সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। চট্টগ্রাম অঞ্চলের কিছু শাখায় বিশৃঙ্খলা ও ভিডিও ধারণ করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার অভিযোগের বিষয়ে গভর্নর বলেন, বিষয়টি নজরে রয়েছে। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া হবে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের উদ্বোধন নির্ধারিত তারিখে না হওয়ার কারণেও এসব অপতৎপরতাকে দায়ী করেন তিনি। ইসলামী ব্যাংকিংয়ে মুনাফা বিতরণ নিয়ে আউফি (এএওআইএফআই) স্ট্যান্ডার্ডের প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, এটি কোনো নতুন স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণের বিষয় নয়। তিনি বলেন, এটি একটি চলমান ব্যাংকের সমস্যা সমাধানের বিষয়। ব্যাংক না থাকলে মুনাফা দেবে কে? তাই বিষয়টি বাস্তবতার আলোকে দেখতে হবে। নিজের ছুটি ও পদত্যাগ নিয়ে ছড়ানো গুজব সরাসরি নাকচ করে দেন গভর্নর আহসান ড. এইচ মনসুর। তিনি বলেন, আমি কোনো ছুটির দরখাস্ত দেইনি, ছুটি মঞ্জুরও হয়নি, ছুটির কোনো ইচ্ছাও নেই। আমি প্রতিদিন রাত ১০টার আগে বাসায় যেতে পারি না। ছুটি নেওয়ার সময় কোথায়? গভর্নর দাবি করেন, গত এক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংক যে পরিমাণ সংস্কার করেছে, তা গত ১৪-১৫ বছরেও হয়নি। তিনি বলেন, আমরা অপ্রয়োজনীয় রেগুলেটরি হস্তক্ষেপ কমাচ্ছি। ব্যাংকের শাখা অনুমোদন, ভাড়া, স্কয়ার ফিট- এসব আমাদের কাজ না। আমাদের কাজ ফরেন এক্সচেঞ্জ মার্কেট, ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্ট, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট ডেভেলপ করা। সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর সাধারণ মানুষকে গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারা নিজেরা ব্যাংকে গিয়ে দেখুন, শুনুন, বুঝুন। অন্যের কথায় বিশ্বাস করবেন না। বাংলাদেশে গুজবের কোনো শেষ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতের ওপর ১ জানুয়ারি থেকে বাজারভিত্তিক নতুন সুদের হার কার্যকর করা হয়েছে। তিনি বলেন, এক বছর বা তার বেশি মেয়াদের আমানতে সর্বোচ্চ ৯.৫ শতাংশ এবং ছয় মাস থেকে এক বছর মেয়াদে ৯ শতাংশ সুদ দেওয়া হবে। তাছাড়া ডিপোজিটের বিপরীতে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত তাৎক্ষণিক ঋণের সুযোগ আছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর এসব কথা বলেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর করতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গভর্নর বলেন, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বড় অঙ্কের আমানতকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডিপোজিটের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত তাৎক্ষণিক ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যাতে আমানতকারীদের তারল্য সংকট দ্রুত সমাধান হয়। এ ব্যাংককে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা হয়েছে। তবে এর পেছনে বড় কোনো গোষ্ঠীর সমর্থন নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন। আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমানতকারীদের মূল আমানত পুরোপুরি সুরক্ষিত, তবে তা পর্যায়ক্রমে উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গভর্নর বলেন, কিছু গ্যাপ বা অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছিল। সেগুলো পরিষ্কার করতেই আজকের এই সভা। আগে আমরা একটি রেজুলেশন প্ল্যান দিয়েছিলাম, কিন্তু বাস্তবায়নের সময় কিছু জটিলতা দেখা দেয়। সেগুলো আমরা প্রতিদিন পাঁচটি ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করে সমাধান করছি। তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিদিন সংশ্লিষ্ট পাঁচটি ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। গুজব ছড়ানোর চেষ্টা, তবে বড় কোনো সমর্থন নেই। গভর্নর আরও বলেন, কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করেছেন। তবে এর পেছনে বড় কোনো সমর্থন আছে বলে আমরা মনে করি না। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমানতকারীদের ভুল বোঝাবুঝি দূর করতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন। কেন একসঙ্গে টাকা তোলা যাচ্ছে না? হঠাৎ করে সব গেট খুলে দিলে ‘স্ট্যাম্পিড উইথড্রল’ হয়ে যেতে পারে। এটা সুইস গেটের মতো- আস্তে আস্তে খুলতে হয়। তাই নিয়ন্ত্রিতভাবে আমানত উত্তোলনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গভর্নর জানান, শুরুতে ডিমান্ড ডিপোজিট, কারেন্ট অ্যাকাউন্ট এবং স্বল্পমেয়াদি দুটি স্কিমের টাকা প্রথমে উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আমানতকারীরা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা তুলতে পারছেন। এর কম থাকলে পুরো টাকাই তুলতে পারছেন। এখন সব স্কিম থেকে টাকা তোলার সুযোগ। কম্পিউটার ও সুদ হিসাবসংক্রান্ত কিছু জটিলতার কারণে দেরি হলেও এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। তিনি বলেন, ফিক্সড ডিপোজিট, মানি স্কিমসহ সব ধরনের স্কিম থেকেই এখন টাকা তোলা যাচ্ছে। গত বুধবার থেকেই এই সুবিধা চালু হয়েছে। বর্তমানে যে কোনো স্কিম থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করা যাবে। মেয়াদ পূর্তির ক্ষেত্রে আমানত রোলওভার হবে এবং সুদ পর্যায়ক্রমে তোলা যাবে। গভর্নর জানান, ১ জানুয়ারি থেকে বাজারভিত্তিক সুদের হার কার্যকর করা হয়েছে। এক বছর বা তার বেশি মেয়াদের আমানতে সর্বোচ্চ ৯.৫ শতাংশ, ছয় মাস থেকে এক বছর মেয়াদে ৯ শতাংশ সুদ দেওয়া হচ্ছে। বড় আমানতকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা বিষয়ে বলেন, যেসব আমানতকারীর বড় অঙ্কের টাকা রয়েছে কিন্তু পুরোটা তুলতে পারছেন না, তাদের জন্য বিশেষ সুবিধার কথা জানান গভর্নর। তিনি বলেন, ডিপোজিটের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত তাৎক্ষণিক ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় কারও যদি ২০ কোটি টাকা জমা থাকে, তাহলে তিনি চাইলে ৮ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। এতে লিকুইডিটির সমস্যা অনেকটাই সমাধান হবে। গভর্নর বলেন, পাঁচটি ব্যাংকের অনলাইন সিস্টেম একীভূত করা সময়সাপেক্ষ। সব ভেন্ডরের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে। ধাপে ধাপে অনলাইন সেবা, আরটিজিএস ও এটিএম কার্যক্রম স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব শিগগির সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সব কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।



