জাতীয় সংবাদ

ডিজিটাল মাধ্যমে হেনস্তা করলেও ‘যৌন হয়রানি’

যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ অনুমোদন
হবে দ্রুত বিচার ও পাবে ক্ষতিপূরণ

প্রবাহ রিপোর্ট : শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে ‘কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’ এবং নারী ও শিশুর সুরক্ষায় ‘পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর চূড়ান্ত ও নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। অধ্যাদেশ দুটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে। ‘কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে সংঘটিত হেনস্তাকেও ‘যৌন হয়রানি’র আওতায় আনা হয়েছে এবং তা শাস্তির যোগ্য বলে গণ্য হবে।
যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ : কী আছে এতে? : ‘কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর মূল লক্ষ্য হলো— “ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, লিঙ্গ, জেন্ডার পরিচয় বা জন্মস্থান নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করা।”
অধ্যাদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং এর পরিধি সমগ্র বাংলাদেশে বিস্তৃত হবে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত সরকারের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমুহের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য হবে।
এই অধ্যাদেশে যৌন হয়রানির একটি বিস্তৃত সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে, যেখানে শারীরিক, মৌখিক, অ-মৌখিক, ডিজিটাল ও অনলাইন আচরণসহ জেন্ডারভিত্তিক সকল অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপমানজনক কার্যকলাপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল, মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ও অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘটিত হয়রানিকেও এর আওতায় আনা হয়েছে।
অধ্যাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি (আইসিসি) গঠন বাধ্যতামুলক করা। সব প্রযোজ্য কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটি অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, তদন্তকালীন সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং উপযুক্ত শাস্তির সুপারিশ করতে পারবে। শাস্তির মধ্যে রয়েছে তিরস্কার থেকে শুরু করে পদাবনতি, চাকুরিচ্যুতি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার পর্যন্ত।
অভিযোগকারীর নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষায় অধ্যাদেশটি সার্ভাইভার-কেন্দ্রিক পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। অভিযোগের কারণে কোনও ধরনের প্রতিশোধমূলক আচরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রে সুবিচার নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট সুরক্ষাব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা নিরুৎসাহিত না হন।
অধ্যাদেশে অসংগঠিত খাত, যেখানে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি গঠন সম্ভব নয়, সেখানে স্থানীয় অভিযোগ কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এই কমিটি গঠিত হবে, যাতে সব নাগরিক অভিযোগ জানানোর কার্যকর সুযোগ পান। অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের আর্থিক সহায়তা, পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা ও সচেতনতা কার্যক্রমের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকার বিশ্বাস করে, এই অধ্যাদেশ কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী আইনি ভিত্তি প্রদান করবে এবং একটি সম্মানজনক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ: দ্রুত বিচার ও ক্ষতিপূরণ : ‘পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর মূল লক্ষ্য হলো পরিবারকে নিরাপদ পরিসর হিসেবে সুরক্ষিত রাখা, এবং সহিংসতার শিকার নারী ও শিশুর জন্য দ্রুত সুরক্ষা, নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, আইনগত সহায়তা এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
নারী ও শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক সহিংসতায় সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন, দ্রুত বিচার, এবং ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক প্রতিকার ব্যবস্থা কার্যকর করার লক্ষ্যে এই অধ্যাদেশ প্রণীত হয়েছে। এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ রহিত করে অধিক পরিপূর্ণ ও সময়োপযোগী একটি আইনি কাঠামো প্রবর্তন করা হলো।
অধ্যাদেশে “পারিবারিক সহিংসতা”কে বিস্তৃতভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে— শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন, যৌন আচরণ/নির্যাতন ও আর্থিক নির্যাতন— সবই এর আওতাভুক্ত। মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষুণ্ণ করার মতো আচরণকে মানসিক নির্যাতনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত মানসিক নির্যাতনের বিষয়েও প্রাসঙ্গিক আইনি সংযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। এতে পারিবারিক সহিংসতার আধুনিক রূপগুলোকে সমন্বিতভাবে মোকাবেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অধিকার সুরক্ষায় অধ্যাদেশটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে আছে-অংশীদারী বাসগৃহে বসবাসের অধিকার— সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি যাতে বাসস্থান থেকে বঞ্চিত না হন। আদালতের মাধ্যমে দ্রুত সুরক্ষা আদেশ— সহিংসতা, হুমকি, যোগাযোগ, কর্মস্থল/শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশসহ নির্দিষ্ট আচরণে নিষেধাজ্ঞা। বসবাস আদেশ— বেদখল রোধ, বিকল্প বাসস্থান/ভাড়া প্রদানের নির্দেশ, প্রয়োজন হলে প্রতিপক্ষকে সাময়িক উচ্ছেদ, এবং ব্যক্তিগত কাগজপত্র ও সম্পদ উদ্ধার নিশ্চিতকরণ।
ক্ষতিপূরণ আদেশ ও ভরণপোষণ, শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির জন্য ক্ষতিপুরণ এবং এককালীন বা মাসিক ভরণপোষণের বিধান, প্রয়োজনে বেতন/মজুরি থেকে কর্তনের মাধ্যমে আদায়। শিশুর সাময়িক তত্ত্বাবধান— শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে নিরাপদ তত্ত্বাবধান নিশ্চিত।
মামলা চলাকালে অন্তর্র্বতীকালীন আদেশ এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিং ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে নির্ধারিত সময়সীমা নিরুপণ করা হয়েছে; অধিকাংশ আবেদন ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে, সুরক্ষা বা বসবাস বা ক্ষতিপূরণ আদেশসহ আদালতের আদেশ লঙ্ঘনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে কারাদন্ড ও অর্থদ-ের বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োগকারী কর্মকর্তা ও পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা অবহেলার ক্ষেত্রে জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা হয়েছে।
সরকার বিশ্বাস করে, এই অধ্যাদেশ পরিবারে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ—যা নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button