জাপানের সঙ্গে চুক্তি, ৭ হাজারের বেশি পণ্য রপ্তানিতে মিলবে শুল্কমুক্ত সুবিধা

প্রবাহ রিপোর্ট : জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কোনো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি সই করল। ইপিএ চুক্তির ফলে বাজারটিতে তৈরি পোশাকসহ প্রায় ৭ হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ পাবে। জাপানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির মাধ্যমে শুধু শুল্কমুক্ত বাজারই নয়- বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, সেবা বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার নতুন দুয়ার খুলে গেল। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতায় এই চুক্তিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী অর্জন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে গতকাল শুক্রবার জাপানের রাজধানী টোকিওতে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে এই চুক্তি সই হয়েছে। চুক্তি সই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে অংশ নেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চার জন কর্মকর্তা। তারা হলেন- অতিরিক্ত সচিব ও মুক্তবাণিজ্য চুক্তি অনুবিভাগের প্রধান আয়েশা আক্তার, যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ, উপসচিব মাহবুবা খাতুন মিনু এবং সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ হাসিব সরকার। বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন এবং জাপানের পক্ষে দেশটির পররাষ্ট্র বিষয়ক স্টেট মিনিস্টার হোরি আইওয়াও স্থানীয় সময় বিকাল ৩টায় চুক্তিতে সই করেন। স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পর বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান টেলিফোনে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় গেজেট প্রকাশের পরই ইপিএ কার্যকর হবে। শনিবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। বাণিজ্য সচিব বলেন, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি অনন্য অর্জন। প্রথমবারের মতো আমরা জাপানের মতো একটি উন্নত দেশের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ ইপিএ সই করলাম। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ আরও বাড়ানো। তিনি আরও বলেন, এটি একই সঙ্গে জাপানের পক্ষ থেকেও কোনও স্বল্পোন্নত দেশের সঙ্গে প্রথম ইপিএ। এর আগে বাংলাদেশের সঙ্গে কেবল প্রতিবেশী ভুটানের একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) কার্যকর ছিল, যা ২০২০ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয়। জাপানের সঙ্গে সদ্য স্বাক্ষরিত ইপিএ বাংলাদেশের বাণিজ্য ইতিহাসে নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদ-ে তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই এই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির যাত্রা শুরু হয় ২০২২ সালে, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে গঠিত একটি যৌথ সমীক্ষা দলের মাধ্যমে। ওই সমীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল- দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে কীভাবে কাঠামোবদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি করা যায়, তার রূপরেখা তৈরি করা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যৌথ সমীক্ষা দলের সুপারিশ জমা দেওয়ার পর আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর পথ তৈরি হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১২ মার্চ দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি আলোচনা শুরু করে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ঢাকা ও টোকিওতে মোট সাত দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, বিনিয়োগ সুরক্ষা, সেবা খাত, মেধাস্বত্ব, শ্রম ও পরিবেশ মান এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সহযোগিতাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। দীর্ঘ ও নিবিড় আলোচনার পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হয়। দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং আলোচক দলের দক্ষতার ফল হিসেবেই এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে প্রথম দফা: ১৯-২৩ মে ২০২৪, ঢাকা, দ্বিতীয় দফা: ১০-১৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ঢাকা, তৃতীয় দফা: ১৯-২০ ডিসেম্বর ২০২৪, টোকিও, চতুর্থ দফা: ২-৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ঢাকা, পঞ্চম দফা: ২০-২৬ এপ্রিল ২০২৫, টোকি, ষষ্ঠ দফা: ২১-২৬ জুন ২০২৫, ঢাকা, সপ্তম ও চূড়ান্ত দফা: ৩-১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, টোকিওতে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। গত ২২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যৌথভাবে আলোচনা সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চুক্তি কার্যকর হওয়ার প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশ ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্যে জাপানের বাজারে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অপরদিকে জাপান পাবে ১ হাজার ৩৯টি পণ্যে বাংলাদেশের বাজারে একই সুবিধা। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। পাশাপাশি পোশাক খাতে এক ধাপ উৎপাদন রূপান্তর সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকায় প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চুক্তির আওতায় সেবা খাতেও উভয় দেশ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার করেছে। বাংলাদেশ জাপানের জন্য ৯৭টি উপখাত উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। অপরদিকে জাপান বাংলাদেশের জন্য ১২০টি উপখাত চারটি পদ্ধতিতে উন্মুক্ত করবে। এর ফলে জাপানি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে নতুন গতি আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাপান থেকে বাংলাদেশে পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ১৮৭ দশমিক ৪৫ কোটি ডলার। একই সময়ে বাংলাদেশ জাপানে পণ্য রফতানি করেছে ১৪১ দশমিক ১৫ কোটি ডলারের। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে জাপানের পুঞ্জীভূত প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৬ দশমিক ৯৬ কোটি ডলার। পাশাপাশি ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত জাপানের প্রতিশ্রুত ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৩২ কোটি ডলার, যার মধ্যে ছাড় হয়েছে ২ হাজার ২৩৬ কোটি ডলার। যৌথ সমীক্ষা দলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ শিগগিরই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ করবে। এতে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। এই প্রেক্ষাপটে জাপানের মতো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বাংলাদেশের রফতানি খাতকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠনের সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, মাত্র চার বছরে একটি উন্নত দেশের সঙ্গে এমন জটিল ও বড় চুক্তি সম্পন্ন হওয়া প্রমাণ করে- সুস্পষ্ট কৌশল, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং লক্ষ্যভিত্তিক আলোচনা থাকলে বাংলাদেশ দ্রুত সময়ের মধ্যেই উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারে। তার মতে, এই চুক্তি শুধু বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে না, বরং ভবিষ্যতে অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে অনুরূপ চুক্তির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে একটি সক্ষম ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করবে।



