জাতীয় সংবাদ

‘ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে’ কতটা বাস্তবসম্মত-বাস্তবায়নযোগ্য?

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, স্বাস্থ্য ও মন্ত্রণালয়কে আমরা দুর্নীতিমুক্ত মন্ত্রণালয়ে রূপান্তরিত করব। দ্বিতীয়ত, মানুষকে যাতে ডাক্তারের পেছনে ঘুরতে না হয়, ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে, অর্থাৎ আমরা চিকিৎসাসেবা মানুষের দোর গোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, দুর্নীতি এবং সিন্ডিকেটমুক্ত একটি মন্ত্রণালয় গড়ে তোলা আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা জনগণের দোরগোঙায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। পাবলিক হেলথের দিকে সবচেয়ে বেশি আমাদের দৃষ্টি নিবন্ধিত হবে। সার্বজনীনভাবে একটা চিকিৎসাসেবা গঙার মন-মানসিকতা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। ইনশাল্লাহ। আমরা আশা করি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা সম্পূর্ণরূপে সফল হব। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে এ ধারণা কতটা কার্যকর ও বাস্তবসম্মত এবং বাস্তবায়নযোগ্য সেই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ মানুষকে যথাযথ চিকিৎসা দিতেই যেখানে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হয়, সেখানে মানুষের পেছনে ডাক্তারদের ঘোরার সময় ও প্রয়োজন কোনোটাই দরকার নেই। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এটা একটা রাজনৈতিক বক্তব্য। শুনতে বেশ চমক মনে হলেও বাস্তবতা বিবর্জিত। আবার কেউ বলছেন, রোগী সেবা নিতে চিকিৎসকের কাছে যাবে, এটাই নিয়ম। মানুষ অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছেই যাবে, ডাক্তার কোনোদিন রোগীর কাছে যাবে না। রোগী যেন যথাযথ চিকিৎসা সেবা পায় সেটা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল চিকিৎসাকর্মী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, মানসম্মত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় একজন চিকিৎসকের সঙ্গে অন্তত তিনজন নার্স ও পাঁচজন টেকনিশিয়ান প্রয়োজন। প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ২৩ জন চিকিৎসক প্রয়োজন।
সেই হিসাবে প্রতি হাজার মানুষের চিকিৎসার জন্য অন্তত দুজন চিকিৎসক দরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হেলথ বুলেটিনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৯৯। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ১০ লাখ বিবেচনায় প্রতি হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র শূন্য দশমিক ৮৩ জন। বাংলাদেশে জনসংখ্যা ও চিকিৎসকের এ অনুপাত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা ঃ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে ডা. তাসনিম জারা বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, মানুষ ডাক্তারের পেছনে ঘুরবে না, ডাক্তার মানুষের পেছনে ঘুরবেন। ভালো কথা, কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন কিভাবে? ওনার এই কথা আমরা দুইভাবে দেখতে পারি। একটা হতে পারে মন্ত্রী বোঝাতে চান যে দেশে এত ডাক্তার তৈরি করা হবে যে মানুষকে আর দূরে যেতে হবে না, কিন্তু এটা কি সম্ভব, তাহলে চলুন বাস্তবতা দেখি। বাংলাদেশে এখন প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র ৭ জন ডাক্তার আছেন। এটা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক, অনেক কম। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে আজ থেকেই মেডিকেল কলেজগুলোতে প্রচুর শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে হবে। কিন্তু এখানেই আসল সমস্যা। তিনি আরও বলেন, একজন শিক্ষার্থী যদি আজকে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন, তাকে ৫ বছর ধরে পড়তে হবে, তারপর ১ বছর ইন্টার্নশিপ করতে হবে। কমপক্ষে ৬ থেকে সাড়ে ৬ বছর এখানেই যাবে। আর বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হতে হলে এর ওপরে আরও ৫ থেকে ৮ বছর লাগবে। কিন্তু মন্ত্রী মহোদয়ের হাতে সময় আছে মাত্র ৫ বছর। তার মানে আজকে ভর্তি হওয়া কোনও শিক্ষার্থী এই সরকারের মেয়াদে ডাক্তার হয়ে একজন রোগীও দেখতে পারবেন না। সুতরাং ডাক্তারের সংখ্যা বাড়িয়ে এই মেয়াদে ফল পাওয়া সম্ভব না। ডাক্তার বাঙানোর ফল পেতে হলে আগামী দশ থেকে পনেরো বছরের পরিকল্পনা করতে হবে। সেই রকম দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা কি মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন? যদি বলে থাকেন, তাহলে সেটা স্পষ্ট করে জানান এবং সেই অনুযায়ী আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিন। জারা বলেন, আরেকভাবে আমরা ওনার কথাটা দেখতে পারি, যদি মন্ত্রীর উদ্দেশ্য হয় শুধু রোগ হলে চিকিৎসা না, বরং রোগ হওয়ার আগেই ডাক্তার মানুষের কাছে পৌঁছাবে, গ্রামে গ্রামে মানুষের কাছে যাবে, প্রতিরোধ কার্যক্রমে জোড় দেওয়া হবে। তাহলে এটা খুবই ভালো পরিকল্পনা। কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন কম নয়। আমাদের দেশে ৬৮ শতাংশ মানুষ গ্রামে থাকেন। অথচ প্রায় ৭৫ শতাংশ ডাক্তার থাকেন শহরে। যুগের পর যুগ ধরে এই অবস্থা চলে আসছে। কেন? একজন ডাক্তার ঢাকায় বসে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করলে মাসে যা আয় করেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি চাকরি করলে তার থেকে অনেক কম উপার্জন করেন। গ্রামে সন্তানের জন্য ভালো স্কুল নেই, পেশাগত উন্নতির সুযোগ কম, দক্ষতা বাঙানোর সুযোগ কম, নিরাপত্তার ঝুঁকি আছে। এসব কারণে অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পদ অনুমোদিত থাকলেও সেই পদে ডাক্তার নেই। তিনি আরও বলেন, তাহলে মন্ত্রী যদি সত্যিই ডাক্তারকে মানুষের দোরগোঙায় নিয়ে যেতে চান, শুধু নির্দেশ দিলে হবে না। মানসম্পন্ন সরকারি বাসস্থান দিতে হবে, গ্রামে কাজ করলে পদোন্নতিতে সেটা বিবেচনায় নিতে হবে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, প্রয়োজনে বিশেষ গ্রামীণ ভাতা দিতে হবে। শুধু ডাক্তার নয়, নার্স, মিডওয়াইফ, প্যারামেডিক, টেকনোলজিস্ট, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী সবার জন্য সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এসব বাস্তবায়নের পথ রেখা কি? সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কি আছে? কতদিন সময় লাগবে? স্বাস্থ্যমন্ত্রী বক্তব্যে প্রসঙ্গে হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের পরিচালক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, চিকিৎসা সেবার জন্য একটি মেডিকেল টিম প্রয়োজন। সেই টিমে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স, পাঁচজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকবে। অর্থাৎ মোট ১০ জনের একটি টিম। বাংলাদেশে এই চিত্রটা উল্টো। দেশে একজন চিকিৎসকের বিপরীতে নার্স রয়েছেন ০.৭ জন। টেকনোলজিস্টের সংখ্যা আরও কম। বাংলাদেশে যে পরিমাণ চিকিৎসক দরকার তার থেকে অনেক কম চিকিৎসক রয়েছে। এ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, সব মিলে দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা রয়েছে এক লক্ষ ৪০ হাজারের মতো। যার মধ্যে একটি অংশ দেশের বাইরে আছে। কেউ আবার মৃত্যুবরণ করেছেন। আবার অনেকে নন ক্লিনিক্যাল পেশায় রয়েছেন। অর্থাৎ সব মিলে রোগী দেখে এমন ডাক্তারের সংখ্যা ৮৫ থেকে ৯০ হাজারের বেশি হবে না। তাহলে ১৮ কোটি মানুষের জন্য দেশে ৯০ হাজার চিকিৎসক রয়েছেন। দেশে এখনো প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক তৈরি হয় নাই। সেই ক্ষেত্রে ডাক্তার রোগীর পেছনে ঘুরবে, এটি অতি কল্পনা। তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য হচ্ছে একটি বিশেষায়িত স্থান। স্বাস্থ্যসেবা আর চিকিৎসা সেবা এক না। স্বাস্থ্য হচ্ছে একজন মানুষকে সামগ্রিকভাবে ভালো রাখার জন্য সেবা। সেখানে রয়েছে প্রোমোটিভ, প্রিভেন্টিভ, কিউরেটিভ (মেডিকেল), রিহ্যাবিলিটেশন এবং প্যালিয়েটিভ কেয়ার। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব হচ্ছে দেশের জনগণ যেন পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারে সেই ব্যবস্থা করা। কিন্তু উনি চিকিৎসা সেবার সাথে, ডাক্তারের সাথে স্বাস্থ্যসেবাকে গুলিয়ে ফেলেছেন। যেটা একেবারে যথার্থ না। লেলিন বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, উনি সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন, প্রথম কাজটি হবে স্বাস্থ্যসেবা বলতে কি বোঝানো হয় সেটা আত্মস্থ করা, এরপর স্বাস্থ্য সেবার যে স্তম্ভগুলো রয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করা এবং এর সাথে মেডিকেল কেয়ার বা চিকিৎসা সেবাকে যুক্ত করা। চিকিৎসা মানেই যদি পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা উনি বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে তিনি একেবারেই অসম্পূর্ণ জায়গায় রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button