জাতীয় সংবাদ

ঈদ যাত্রায় দুর্ঘটনার কবলে লঞ্চ-ট্রেন

বগুড়ায় নীলসাগর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত : আহত শতাধিক
সদরঘাটে দু’ লঞ্চের সংঘর্ষ : নিহত ১, নিখোঁজ ২

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। সবাই নাড়ির টানে ফিরছেন ঘরে। উদ্দেশ্য প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা। কিন্তু ঈদ যাত্রায় বুধবারের লঞ্চ-ট্রেন দুর্ঘটনায় অনেকেই হতাহত হয়েছেন। তাদের আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়েছে।

ঢাকা থেকে নীলফামারীগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের নয়টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। এতে প্রায় অর্ধশত যাত্রী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। বুধবার (১৮ মার্চ) দুপুর আড়াইটার দিকে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার তিলকপুরে এ ঘটনা ঘটে। এতে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। সান্তাহার রেলওয়ে থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মাহফুজুর রহমান বলেন, নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢাকা থেকে ছেড়ে এসে বেলা ২টার দিকে সান্তাহার স্টেশনে বিরতি দেয়। স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই ট্রেনটির নয়টি বগি লাইনচ্যুত হয়। ট্রেনের ছাদে অনেক মানুষ থাকায় ছাদ থেকে পড়ে অনেকে আহত হয়েছেন। বগিগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। আদমদীঘি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান জানান, নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের নয়টি বগি লাইনচ্যুত হওয়ায় বেশ কয়েকজন যাত্রী হতাহত হয়েছেন। তবে এখনও আহতদের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। বিস্তারিত পরে জানানো হবে। সান্তাহার রেলওয়ে থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মাহফুজুর রহমান জানান, ট্রেনের ছাদে অতিরিক্ত যাত্রী থাকায় লাইনচ্যুত হওয়ার সময় অনেকেই ছিটকে পড়ে আহত হয়েছেন। তবে কোনো যাত্রীর মৃত্যুর খবর এখনো পাইনি। দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধার কাজ শুরু হয়েছে এবং লাইনচ্যুত বগিগুলো সরানোর চেষ্টা চলছে। সান্তাহার রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার খাদিজা খাতুন বলেন, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী নীলসাগর ট্রেনটি আদমদীঘির ছাতিয়ান গ্রামে পৌঁছার পর ট্রেনটির বগিগুলো লাইনচ্যুত হয়। এতে আহত হন অনেক যাত্রী। তবে নিহত হওয়ার কোনো খবর নেই। লাইনচ্যুত হওয়া বগিগুলো উদ্ধারের জন্য পাবনার ইশ্বরদী ও দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে দুটি উদ্ধারকারী ট্রেন রওনা হয়েছে।
বগুড়া রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশর মাস্টার সাজেদুর রহমান সাজু বলেন, ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লাগতে পারে।
রেললাইনে কাজের কারণে টানানো ছিল লাল পতাকা, খেয়াল না করায় দুর্ঘটনা ঃ বগুড়ার আদমদিঘি উপজেলার ছাতিয়ানগ্রাম তিলকপুর নামক স্থানে লাইনচ্যুত হওয়া নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের নয়টি বগি উদ্ধারের চেষ্টা করছে উদ্ধারকারী ট্রেন। বুধবার (১৮ মার্চ) সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় পাবনার ঈশ্বরদী থেকে আসা উদ্ধারকারী ট্রেন এসে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে সান্তাহার রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার খাদিজা খাতুন বলেন, আরও একটি উদ্ধারকারী ট্রেন দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে আসছে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি। এর আগে বুধবার দুপুর আড়াইটায় ওই ট্রেনটির নয়টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এ সময় ট্রেনটির ছাদে থাকা যাত্রীদের অনেকে নিচে পড়ে, আবার অনেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হন। বগিগুলো লাইনচ্যুত হওয়ায় উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলা নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও জয়পুরহাটের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দিনাজপুরের রেল যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তবে ঢাকা-রংপুর-লালমনিটরহাট লাইনে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে৷স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যেখানে ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়েছে, ওই স্থানে রেললাইনের মেরামত কাজ চলছিল। লাল পতাকা টানানো ছিল। তবে চালক খেয়াল না করায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর ট্রেনের চালক ও স্টাফরা পালিয়েছেন। ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার সময় ট্রেনের ছাদে থাকা ও ভেতরে থাকা অর্ধ শতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। তাদের স্থানীয় হাসপাতাল ছাড়াও নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সান্তাহার রেলওয়ে থানার পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, এখানে রেললাইনে মেরামতের কাজ চলছিল এবং সামনে লাল পতাকা দেওয়া ছিল। কিন্তু চালক দ্রুতগতিতে আসায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রেনটির নয়টি বগি লাইনচ্যুত অবস্থায় আছে। এখনও পর্যন্ত মৃত্যুর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ট্রেনের ছাদে অনেক মানুষ থাকায় ছাদ থেকে পড়ে অনেকে আহত হয়েছেন। তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনার পর ট্রেনের কোনো স্টাফকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি।
নওগাঁ ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক রেজাউল করিম বলেন, আমরা দুপুর সোয়া ২টার দিকে দুর্ঘটনার খবর পাই। আমাদের চারটি ইউনিট উদ্ধার কাজ করছে। আমরা প্রত্যেকটা বগি তল্লাশি করছি। ৪৭ জনকে উদ্ধার করে নওগাঁ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। একজনের অবস্থা গুরুতর। এছাড়া স্থানীয়রাও কয়েকজনকে হাসপাতালে নেন।
সদরঘাটে দু’ লঞ্চের সংঘর্ষ : নিহত ১, নিখোঁজ ২ : ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে এক লঞ্চে ধাক্কা দিয়েছে আরেক লঞ্চ। এতে একজন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এছাড়া আরও একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। বুধবার (১৮ মার্চ) বিকেল ৫টার দিকে টার্মিনালের ১৪ নং পন্টুনের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ‘আসা যাওয়া-৫’ (ঢাকা ইলিশা) লঞ্চে ট্রলার দিয়ে যাত্রী তোলার সময় সেটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় ‘এম ভি জাকির সম্রাট-৩’ (ঢাকা-দেউলা-ঘোষেরহাট) নামে আরেক লঞ্চ। তখন ধাক্কা দেওয়া লঞ্চের সামনের অংশের আঘাতে অপেক্ষমান লঞ্চের ওই যাত্রী দুজন পিষ্ট হন। এর মধ্যে এক নারী গুরুতর আহত অবস্থায় পানিতে পড়ে যান। আরেকজন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেলেও পুলিশ তা নিশ্চিত করতে পারেনি। পানিতে পড়ে যাওয়া নারীর নাম বোরা আক্তার (২০)। পুলিশ জানায়, বোরা আক্তার বরিশালের কাশিপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে লঞ্চে উঠেছিলেন। এ সময় পাশাপাশি থাকা দুটি লঞ্চের ঘষাঘষির মধ্যে হঠাৎ তিনি নদীতে পড়ে যান। ঘটনার পরপরই আশপাশের লোকজন দ্রুত তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ ফয়সাল আহমেদ বলেন, দুই লঞ্চের ঘষাঘষিতে সেই নারী পানিতে পড়ে যান। তার অবস্থা গুরুতর, তবে সর্বশেষ তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক মুহম্মদ মোবারক হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, আসা যাওয়া- ৫’ লঞ্চের সঙ্গে ট্রলারের সংঘর্ষে সম্ভবত একজন যাত্রী নিহত হয়েছেন বলে শুনেছি। আরেকজন আহত হয়েছেন। তাকে উদ্ধার করে মেডিকেলে পাঠানো হয়েছে। সদরঘাট ১৪ নং পণ্টুনের কাছেই এই ঘটনা ঘটেছে। আমরা আপাতত এটুকুই জানতে পেরেছি। বিস্তারিত আমরা জানলে আপনাদের জানাতে পারবো। নৌপুলিশ সদস্য ইশতিয়াক আহমেদ প্রবাহকে বলেন, ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা নৌপুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন স্পটে যাই। সেখানে গিয়ে শুধু লঞ্চের গায়ে রক্ত লেগে থাকতে দেখেছি। আরেকজনকে নদী থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসি। তবে তিনি জীবিত নাকি মৃত সেটা বলকে পারবো না। তাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন। সদরঘাটে যাত্রীর ঢল ঃ প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঈদের ছুটির আগে শেষ কর্মদিবস হওয়ায় আজ সদরঘাটে যাত্রীসংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ফলে টিকিট সংগ্রহ ও লঞ্চে ওঠার ক্ষেত্রে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। প্রতিটি লঞ্চ যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়ে ছেড়ে যাচ্ছে, লঞ্চের ছাদেও যাত্রী নিতে দেখা গেছে। যদিও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) কঠোর নজরদারিতে রেখেছে, যেন কোনো লঞ্চ অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে না ছাড়ে।
নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক মুহম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, আজকে যাত্রীদের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দুপুরের পর থেকেই যাত্রীদের এমন চাপ। বারবার মাইকে প্রচার করা হচ্ছে যে নৌকা বা ট্রলারে করে কেউ লঞ্চে ওঠার চেষ্টা করবেন না। আমাদের নৌপুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, র‌্যাব, বিজিবিসহ সবাই প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে যাত্রীদের নিরাপদ ঈদ যাত্রা দিতে। জানা গেছে, নতুন সরকারের আমলে যাত্রীসেবায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বিআইডব্লিউটিএ। সদরঘাটকে আরও সুশৃঙ্খল ও পরিচ্ছন্ন করার পাশাপাশি চালু করা হয়েছে একগুচ্ছ নতুন সুবিধা। ঈদের আগে পাঁচ দিন ও পরে পাঁচ দিন মোট ১০ দিনের জন্য যাত্রীদের জন্য ফ্রি কুলি (পোর্টার) সেবা দেওয়া হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএ নিজস্ব অর্থায়নে কুলিদের মজুরি দিয়ে নিয়োগ করায় যাত্রীরা কোনো হয়রানির শিকার হচ্ছেন না। মালামাল বহনে সুবিধার জন্য বিমানবন্দর থেকে আনা হয়েছে ১০০টি ট্রলি, যা যাত্রীরা নিজেরাই ব্যবহার করতে পারবেন। অসুস্থ, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য হুইলচেয়ারের সংখ্যা বাড়িয়ে ২০টি গেটে মোট ৪০টি রাখা হয়েছে। ক্যাডেট সদস্যরা এতে সহায়তা করছেন। এছাড়া চাপ সামলাতে অতিরিক্ত দুটি ঘাট চালু করা হয়েছে। এছাড়া লঞ্চ মালিকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদ উপলক্ষে ভাড়া ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে, যা যাত্রীদের জন্য অতিরিক্ত স্বস্তি যোগ করেছে। লঞ্চ টার্মিনালে ট্রাফিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের অফিসের বার্থিং সারেং মো. মামুন বাংলানিউজকে বলেন, আজ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ঢাকা থেকে ছেড়ে গেছে ৮০ টি লঞ্চ ও ঢাকাতে এসেছে ৭৫টি লঞ্চ। আজ রাতে সব মিলিয়ে ১২০টির ওপরে লঞ্চ দেশের ৩৭টি রুটে ছেড়ে যাবে। ২৫ পন্টুনে আজকে তিল পরিমাণ জায়গা নেই। গতকাল ঢাকা থেকে ১০০টি ছেড়ে গেছে এবং ঢাকাতে এসেছে ৭৫টি লঞ্চ।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button