‘স্বাভাবিক স্বাভাবিক’ বললেও পাম্পের পরিস্থিতি অস্বাভাবিক

দেশে জ্বালানি তেল সংকট
তেল সরবরাহে পেট্রোল পাম্পে চলছে ‘অলিখিত রেশনিং’
প্রবাহ রিপোর্ট ঃ জ্বালানি তেল সরবরাহে রেশনিং পদ্ধতি তুলে নেওয়া হলেও ডিপো থেকে পেট্রোল পাম্পে তেল সরবরাহে চলছে ‘অলিখিত রেশনিং’। সম্প্রতি পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি জানিয়েছিল, গতকাল অর্থাৎ শনিবারের (২৮ মার্চ) মধ্যে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে। কিন্তু মাঠের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। বর্তমানে অনেক পাম্পেই তেল নেই, থাকলেও দেওয়া হচ্ছে সীমিত আকারে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ফলে দেশের বাজারে অস্বাভাবিকভাবে জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়ে যায়। অনেকে আবার ‘প্যানিক বায়িং’ করতে থাকেন। অর্থাৎ প্রয়োজন না থাকলেও বেশি বেশি তেল কিনছিলেন। এ অবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত ৬ মার্চ জ্বালানি তেলে রেশনিং প্রক্রিয়া আরোপ করে সরকার। এতে করে নির্দিষ্ট সীমার বাইরে জ্বালানি তেল ক্রয়ের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি ডিপো থেকে পেট্রোল পাম্পে তেল সরবরাহ ২৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৫ মার্চ থেকে এই রেশনিং তুলে নেওয়া হয়। সরকার কর্তৃক রেশনিং ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার পরও এখন চাহিদামাফিক তেল পাচ্ছে না অনেক ফিলিং স্টেশন। পাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ৩-৪ গাড়ি তেল পেলেও বর্তমানে তা নেমে দাঁড়িয়েছে এক গাড়িতে। খুব অল্পসংখ্যক পাম্প চাহিদার কাছাকাছি তেল পাচ্ছে। সরবরাহে রেশনিংয়ের পাশাপাশি পাম্পে জ্বালানি তেল মজুত করে রাখার প্রবণতাও বেড়েছে। বাড়তি মুনাফার আশায় অনেক পাম্প মালিক পেট্রোল-অকটেন মজুত করে রাখছেন। এতে করেও গ্রাহকরা চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ফিলিং স্টেশনের মালিক প্রবাহকে বলেন, জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে তেল সরবরাহে কোটা সিস্টেম করে দেওয়া হয়েছে। কোন পাম্প কতটুকু তেল পাবে, তা ওখান থেকেই ঠিক করে দেওয়া হয়। চাইলেও বেশি তেল নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমার কয়েকটা পে-অর্ডার অগ্রিম করা থাকলেও তেল আসবে কি না তার নিশ্চয়তা নেই। প্রভাব ভোক্তাপর্যায়ে ঃ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি কর্তৃক জ্বালানি তেলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রকাশ করা হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। রোববার (আজ) রাজধানীর অনেক পাম্পেই দেখা মেলেনি তেলের। কিছু পাম্প চাহিদামাফিক দিলেও কোনো কোনো পাম্প নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে তেল দিচ্ছে। অর্থাৎ রেশনিং করছে। গাবতলি মাজার রোডে অবস্থিত ডেনসো ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ৩০০ টাকার বেশি তেল বাইকে দেওয়া হচ্ছে না। রেশনিং ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও অনেক গ্রাহক প্রয়োজনীয় তেল নিতে এসে নির্দিষ্ট সীমা দেখে হতাশ হচ্ছেন। ডেনসো ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মো. তুহিন বলেন, পাঁচদিন পর স্টেশনে সাড়ে ৪ হাজার লিটার অকটেনের সরবরাহ এসেছে। অথচ এর চাইতে বেশি তেলের জন্য পে অর্ডার করা আছে। তেলের তুলনায় গ্রাহকের চাপ অনেক বেশি। সবাই যেন অন্তত তেল পায়, তাই ৩০০ টাকার করে দিচ্ছি। যদিও এই তেল টিকবে সর্বোচ্চ ১ দিন। এখন সরকারের উচিত মাঠপর্যায়ে তেল খরচ কমানোতে একটা পরিকল্পনা করা। সরকারি গাড়িগুলো যাতে কম চলে, সরকারি অফিসগুলো ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ করা, স্কুল-কলেজ যাতে অনলাইনে ক্লাস করে- এভাবেও কিছু জ্বালানি তেল সাশ্রয় করা সম্ভব।
ইজাজ হোসেইন, জ্বালানি বিশেষজ্ঞঃ কল্যাণপুরের খালেক ফিলিং স্টেশনের এক কর্মী বলেন, এক গাড়ি তেল এসেছে। তাতে ডিজেল দিয়েছে ৯ হাজার লিটার আর অকটেন দিয়েছে ৪ হাজার লিটার। যা যথেষ্ট নয়। এর বেশি তেল ডিপো থেকে মিলছে না। একই রোডে অবস্থিত সাহিল ফিলিং স্টেশনে তেলের দেখা মেলেনি। আরেক পাম্প এসপি ফিলিং স্টেশনেও তেল নেই। তবে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো দেখা যায় আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে। সেখানে আগত প্রতিটি বাহনকেই চাহিদামাফিক তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। পাম্প সংশ্লিষ্টরা জানান,চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ পাওয়ায় সবাইকেই তেল দেওয়া হচ্ছে। যদিও এর ঠিক বিপরীত দিকের পি ডব্লিউ ফিলিং স্টেশন ছিল তেলশুন্য। দেশে জ্বালানি তেলের মজুত বেশি দিনের নেই। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে নিয়মিত উৎস থেকে তেল কেনাও কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকার বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানির চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে বিপিসি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে জিটুজি ও আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবানের বাইরে গিয়ে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতির মাধ্যমে তেল কিনতে ১১টি দেশের সাথে আলোচনা করেছে। এর মধ্যে দুটি দেশ থেকে সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেও বাকি দেশগুলো থেকে এখনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এছাড়া নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ আসা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে সরবরাহ পরিস্থিতি সামলাতে বিপিসি ডিপো থেকে তেল সরবরাহে কৃচ্ছতা সাধন করছে বলেন জানান সংশ্লিষ্টরা। বেড়েছে অবৈধ মজুত ঃ সরবরাহে রেশনিংয়ের পাশাপাশি পাম্পে জ্বালানি তেল মজুত করে রাখার প্রবণতাও বেড়েছে। বাড়তি মুনাফার আশায় অনেক পাম্প মালিক পেট্রোল-অকটেন মজুত করে রাখছেন। এতে করেও গ্রাহকরা চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না। অবৈধ মজুত ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করাসহ দেশের প্রতিটি রিফুয়েলিং স্টেশনে ট্যাগ অফিসার নিয়োগের পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ট্যাগ অফিসাররা ফিলিং স্টেশনের দৈনিক মজুত রেকর্ড করবেন। পাশাপাশি ডিপো থেকে সরবরাহকৃত জ্বালানি তেল ফিলিং স্টেশনে উপস্থিত হয়ে পরিমাপপূর্বক গ্রহণ করবেন এবং ফিলিং স্টেশনের পে-অর্ডার ও ডিপোর চালান/ রিসিটের সাথে তেলের পরিমাণ মিলিয়ে দেখবেন। এছাড়া ডিপ রডের মাধ্যমে সরবরাহকৃত জ্বালানি তেল বুঝে নেওয়ার পাশাপাশি ফিলিং স্টেশনে সংরক্ষিত রেজিস্ট্রারে ডিপো থেকে দৈনিক জ্বালানি তেল গ্রহণের হিসাব লেখা হয়েছে কি না, সেসবও মনিটর করবেন। সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে জিটুজি ও আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবানের বাইরে গিয়ে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতির মাধ্যমে তেল কিনতে ১১টি দেশের সাথে আলোচনা করেছে। এর মধ্যে দুটি দেশ থেকে সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া গেলেও বাকি দেশগুলো থেকে এখনো সাড়া পাওয়া যায়নি। কী বলছে মালিক সমিতি? ঃ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির আহবায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, যাদের পে অর্ডার আগে করা হয়েছে, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দিচ্ছে সরকার। কিন্তু বেশি চাহিদার কারণে সকালে পাম্পে তেল গেলে বিকেলেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা আশা করছি, আগামী ৫ দিনের মধ্যে এই সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন ঢাকা পোস্টকে বলেন, তেল সরবরাহের সার্বিক অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, বিপিসি রেশনিংটা করছে। কারণ, বেশিরভাগ পাম্পমালিকরা বলছেন তারা চাহিদামাফিক তেল পাচ্ছেন না। ছোট পাম্পগুলো তো একেবারেই পাচ্ছে না। তিনি বলেন, এইযে ‘কৃচ্ছতা’ সাধন, এটা অনেক দেশই বড় আকারে করছে। এখন সরকারের উচিত মাঠপর্যায়ে তেল খরচ কমানোতে একটা পরিকল্পনা করা। সরকারি গাড়িগুলো যাতে কম চলে, সরকারি অফিসগুলো ওয়ার্ক ফ্রম হোম করা, স্কুল-কলেজ যাতে অনলাইনে ক্লাস করে- এভাবেও কিছু জ্বালানি তেল সাশ্রয় করা সম্ভব।



