জাতীয় সংবাদ

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভেঙে পড়ছে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা!

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সাইরেন বাজলে যখন দক্ষিণ ইসরায়েলের অনেক বাসিন্দা বেজমেন্টে আশ্রয় নেন, ৫৪ বছর বয়সী ডেভিড আজরান তখন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ান। আকাশজুড়ে আলোর অজস্্র রেখা দেখা যায়। ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থেকে ছোড়া ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের বিচ্ছুরণ দেখেন তিনি। কাঁধে একটি অ্যাসল্ট রাইফেল ঝুলিয়ে খালি পায়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে আজরান বলেন, ‘আমি সাধারণ কোনো লোক নই।’ তবে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর তাঁর যে অগাধ আস্থা ছিল, তা এখন টলে গেছে। তিনজন মার্কিন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ওপর হামলার প্রথম দুই দিনেই পেন্টাগন ৫৬০ কোটি ডলার মূল্যের গোলাবারুদ খরচ করেছে। গত শনিবার রাতে প্রায় তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আরাদ ও ডিমোনার দুটি আবাসিক এলাকায় আঘাত হানে। এতে আজরান ও তাঁর প্রতিবেশীদের অনেকের ঘরের জানালা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই হামলায় ১১৫ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত ব্যাখ্যা দেয়নি, ঠিক কী কারণে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাটি ব্যর্থ হলো। এই হামলা নতুন করে কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। ইসরায়েলের কাছে পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি দেখা দিয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ডিমোনায় একদল কিশোরকে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ির সামনে ড্রাম বাজিয়ে গান গাইতে দেখা যায়। তারা এই হামলায় হতাহতদের প্রতি এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গান গাইছিল। সেই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের আশঙ্কায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় সেনাবাহিনী এই ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাশ্রয় বা সংরক্ষণ করছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ কিছুটা বাড়িয়ে বললেও তাঁর মতে, সুরক্ষিত ডিমোনায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ইসরায়েলের ব্যর্থতা বড় মোড় পরিবর্তনকারী একটি ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের আকাশ এখন অরক্ষিত।’ আক্রমণ করার ক্ষমতা কমলেও বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রদর্শন করে তেহরান এখনো ভয় দেখানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ইসরায়েলি প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে পারে এমন উদ্বেগ থেকেই মূলত ইরানের ওপর নতুন করে হামলা শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে ১২ দিনের সংঘাতের সময় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি ও লঞ্চার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের মজুতের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার থেকে কমে ১ হাজার ৫০০-এর নিচে নেমে আসে। তিনজন মার্কিন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ওপর হামলার প্রথম দুই দিনেই পেন্টাগন ৫৬০ কোটি ডলার মূল্যের গোলাবারুদ খরচ করেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, আইডিএফ নিশ্চিত করেছিল যে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চালিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের কাছে ‘পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর’ মজুত রয়েছে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান দ্রুতই তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনব্যবস্থা আবারও সচল করেছে। বর্তমান যুদ্ধ শুরুর আগেই তাদের অন্তত ২ হাজার ৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত ছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরের একটি বার্থে ১ মার্চ ইন্টারসেপ্ট করা একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন ধরে যায়। স্যাটেলাইট থেকে তোলা এই ছবিতে সেই আগুনের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরের একটি বার্থে ১ মার্চ ইন্টারসেপ্ট করা একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন ধরে যায়। ইসরায়েলের একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, তাঁদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পক্ষে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত সহ্য করা সম্ভব নয়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এক বছরের মধ্যেই ইরান এই সংখ্যা ছাড়িয়ে যেতে পারে। সামরিক স্পর্শকাতরতার কারণে তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, তাঁদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছে। তবে আইডিএফের কর্মকর্তারা এ-ও স্বীকার করেছেন, কোনো ব্যবস্থাই আসলে শতভাগ কার্যকর নয়। আইডিএফের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধের প্রথম ২৩ দিনে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সাফল্যের হার ছিল প্রায় ৯২ শতাংশ। চোখের পলকে সিস্টেমটিকে নিজের যাত্রাপথ সংশোধন করে নিতে হয়। ওই অর্থে এটি একটি অত্যন্ত মেধাবী প্রযুক্তি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি অনেকটা আপনার দিকে ধেয়ে আসা একটি বুলেটকে নিজের পিস্তল দিয়ে গুলি করে থামানোর মতো।’ ইসরায়েলি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক কমান্ডার রান কোচাভ দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, হামলা প্রতিহত করতে না পারার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে।
রান কোচাভ বলেন, এর অন্যতম কারণ হলো ইসরায়েলি কমান্ডারদের একটি সুনির্দিষ্ট নীতি মেনে চলতে হয়। তাঁদের তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, নির্দিষ্ট কোনো হুমকির মোকাবিলায় কোন ইন্টারসেপ্টরটি সবচেয়ে জুতসই হবে। সাবেক ইসরায়েলি কমান্ডার বলেন, অ্যারো, থাড ও আয়রন ডোমের মতো ব্যবস্থাগুলোর মধ্য থেকে সঠিকটি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত লক্ষ্য থাকে। লক্ষ্যটি হলো একটি সাধারণ রকেট ধ্বংস করতে গিয়ে যেন দামি ক্ষেপণাস্ত্রের অপচয় না হয় কিংবা যা অন্য কোনো ছোট ব্যবস্থা দিয়ে ঠেকানো সম্ভব, সেটির পেছনে যেন দামি ইন্টারসেপ্টর নষ্ট না হয়। ‘আমাদের ইন্টারসেপ্টরের মজুতের হিসাব রাখতে হয় এবং যুদ্ধের ময়দানে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়।’
তিনজন মার্কিন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের ওপর হামলার প্রথম দুই দিনেই পেন্টাগন ৫৬০ কোটি ডলার মূল্যের গোলাবারুদ খরচ করেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধের পরিকল্পনা করার সময় আইডিএফ নিশ্চিত করেছিল, দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চালিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের কাছে ‘পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টর’ মজুত রয়েছে।
তবে কোচাভ বলেন, জনবহুল এলাকা বা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ কোনো স্থাপনার দিকে কোনো হুমকি ধেয়ে আসতে দেখলে ইন্টারসেপ্টরের আর্থিক মূল্য বিবেচ্য বিষয় নয়। তাঁর মতে, দীর্ঘ সময় ধরে দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সচল রাখার জন্য তাঁরা এখন ইন্টারসেপ্টরের সহজলভ্যতা বা মজুতের বিষয়টিকেই একমাত্র সম্পদ হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট’-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো জেসন এইচ ক্যাম্পবেল বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা যদি আগের ধারণার চেয়ে বেশি হয়, তবে পেন্টাগনকে দ্রুত তাদের কৌশল পরিবর্তন করতে হবে। ক্যাম্পবেল বলেন, ‘এটি বর্তমান হুমকির ধরন বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো মিত্রদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াকে বদলে দেবে। বর্তমান ইরান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকলে তাদের নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকির মুখে পড়বে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।’ সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্টের পরিচালক টম কারাকো বলেন, ইরান সম্ভবত তাদের প্রচারের চেয়েও বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে। তিনি বলেন, ইরান ‘স্পেস লঞ্চ ভেহিকেল’ বা মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর যান তৈরি করছে। এটি মূলত ক্ষেপণাস্ত্রেরই একটি ধরন। কারাকো বলেন, ‘আপনার যদি কক্ষপথে কোনো ছোট বস্তু পাঠানোর ক্ষমতা থাকে, তাহলে বুঝে নিতে হবে আপনি দুই হাজার মাইলের বেশি দূরে কোনো কিছু ছুড়ে মারার সক্ষমতাও রাখেন।’

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button