জাতীয় সংবাদ

চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা ছাড়ালো ৩৬ ডিগ্রি

গলে যাচ্ছে রাস্তার পিচ

প্রবাহ রিপোর্ট : তীব্র দাবদাহে পুড়ছে সীমান্তঘেঁষা জেলা চুয়াডাঙ্গা। বৈশাখ আসার আগেই প্রকৃতি ধারণ করেছে রুদ্রমূর্তি। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এই জনপদে সূর্য যেন আগুন ঢালতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার চুয়াডাঙ্গায় বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই প্রচ- তাপে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে এক বিরল দৃশ্য তপ্ত রোদে রাস্তার পিচ গলে নরম হয়ে যাচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গায় গরমের তীব্রতা নতুন কিছু নয়, তবে এবারের বৃদ্ধিটা অস্বাভাবিক দ্রুত। গতকাল বুধবার জেলায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৩৬.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু মাত্র ২৪ ঘণ্টা পার হতেই আজ তা এক লাফে ৩৮.৫ ডিগ্রিতে গিয়ে ঠেকেছে। অর্থাৎ একদিনেই তাপমাত্রা বেড়েছে ২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। হঠাৎ এই মাঝারি তাপপ্রবাহের কবলে পড়ে নাভিশ্বাস উঠেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। বিশেষ করে দুপুরের দিকে বাইরে বের হওয়া সাধারণ মানুষের জন্য এক প্রকার দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তীব্র রোদে চুয়াডাঙ্গা শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়েছে। শহরের পৌরসভা সংলগ্ন এলাকা ও প্রধান বাণিজ্যিক মোড়গুলোতে দেখা গেছে, রাস্তার পিচ গলে আলকাতরার মতো তরল হয়ে গেছে। যানবাহন চলাচলের সময় গাড়ির টায়ারে এই আঠালো পিচ লেপ্টে যাচ্ছে, ফলে একদিকে যেমন রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে মোটরসাইকেল ও ছোট যানবাহনগুলো পিছলে গিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। পথচারীরা জানিয়েছেন, পিচ গলে নিচ থেকে যে তপ্ত ভাপ আসছে, তাতে চোখের পলক ফেলাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
তীব্র এই গরমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দিনমজুর, রিকশাচালক এবং খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষগুলো। কিন্তু এবারের বিপত্তি বেড়েছে শহরের জ্বালানি তেলের পাম্পগুলোতে। তেলের সংকটের কারণে তপ্ত রোদে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে মোটরসাইকেল চালকদের।
শহরের এক তেলের পাম্পে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সুমন হোসেন নামে এক চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সকাল থেকে এই আগুনের মতো রোদে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। মাথার ওপর সূর্য আর নিচ থেকে রাস্তার গরম ভাপ—শরীর আর সইছে না। তেলের জন্য দাঁড়িয়ে থেকে মানুষ এখন অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, আমাদের এখানে শীত যেমন বেশি, গরমও তেমন। কিন্তু এপ্রিলের শুরুতেই যদি পিচ গলে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়, তবে সামনে মে-জুন মাসে কী হবে, তা ভেবেই বুক কাঁপছে।
চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের সিনিয়র পর্যবেক্ষক জামিনুর রহমান আজকের পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, বর্তমানে জেলার ওপর দিয়ে একটি মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার দুপুর নাগাদ পারদ ৩৮.৫ ডিগ্রি ছুঁয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ কম থাকায় শরীর থেকে ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে এবং জ্বালাপোড়া বেশি অনুভূত হচ্ছে। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে এবং তাপমাত্রা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তীব্র গরমে হিট স্ট্রোক, ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ায় সতর্কবার্তা জারি করেছেন চিকিৎসকরা। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রোদে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শরীরের আর্দ্রতা ধরে রাখতে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি, ওরস্যালাইন ও তরল খাবার গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের এই সময়ে বাড়তি যতেœর প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
চুয়াডাঙ্গার এই অস্বাভাবিক দাবদাহ কেবল একটি আবহাওয়াগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তনের এক ভয়াবহ রূপ। ঋতুর শুরুতেই রাস্তার পিচ গলে যাওয়া প্রমাণ করে যে, ভূ-প্রকৃতির ভারসাম্য বিঘিœত হচ্ছে।
একদিকে কৃষিপ্রধান এই জেলায় সেচ কাজে বিঘœ ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে তীব্র তাপে জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে। দ্রুত বনায়ন এবং জলাশয় রক্ষা না করলে আগামীতে এই তাপমাত্রা জনবসতির অযোগ্য পর্যায়ে চলে যেতে পারে বলে পরিবেশবাদীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
আপাতত বৃষ্টির অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে চুয়াডাঙ্গাবাসী। এক পশলা বৃষ্টিই পারে এই তপ্ত জনপদে স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিতে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button