বাতিল হচ্ছে গণভোটসহ ১৬টি!

অন্তর্ববর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ :
২০টি বাতিলের সুপারিশ সংসদীয় কমিটির
প্রবাহ রিপোর্ট : গণভোট, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশসহ অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের জারি করা ১৬টি অধ্যাদেশ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদে উত্থাপিত হচ্ছে না। ফলে সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা ‘ল্যাপস’ হয়ে যাচ্ছে। তবে জাতীয় সংসদ কর্তৃক গঠিত বিশেষ কমিটি এগুলো এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও যাচাই-বাছাই করে নতুন করে উত্থাপনের সুপারিশ করেছে।
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশ জারির পর পরবর্তী সংসদ অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে তা উত্থাপন করতে হয়। উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত না হলে অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা লোপ পায়। সেই হিসেবে আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে এই ১৬টি অধ্যাদেশ ল্যাপস হয়ে যাবে। ১২টি অধ্যাদেশের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর তিন সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও গাজী নজরুল ইসলাম ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত দিয়েছেন।
গতকাল (বুধবার) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া অধিবেশনে বিশেষ কমিটির রিপোর্টটি উত্থাপন করেন কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন।
অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ বর্তমান আকারেই পাসের জন্য সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি। অবশিষ্ট ১৫টি সংশোধিত আকারে এবং ৪টি অধ্যাদেশ রহিতকরণ ও হেফাজতের জন্য এখনই বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই সংসদে না পাঠিয়ে আরও সময় নিয়ে যাচাই-বাছাইয়ের পক্ষে মত দিয়েছে কমিটি।
এই তালিকায় রয়েছে- গণভোট অধ্যাদেশ-২০২৫; জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৫গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ-২০২৫; দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫; তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬; রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ-২০২৫ (ও সংশোধন); মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫; কাস্টমস (সংশোধন) ও আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫; বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬; বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৬; মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ-২০২৫ এবং মাইক্রো ফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ-২০২৬।
জামায়াতের সদস্যরা জেলা পরিষদ, উপজেলা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা সংশোধন সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশের বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। রিপোর্টে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের ‘কুদরত-ই-ইলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায়ের আলোকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ সংবিধানবিরোধী ও বেআইনি।
১৩৩ অধ্যাদেশ যাচাই, ২০টি বাতিলের সুপারিশ সংসদীয় কমিটির : অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। প্রতিবেদনে ২০টি অধ্যাদেশ বিলুপ্ত বা বাতিল করার সুপারিশ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এ প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা ও সংশোধনের বিষয়ে বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।
সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পর্যালোচিত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ কোনো পরিবর্তন ছাড়াই বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। ১৫টি অধ্যাদেশ প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে কার্যকর রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ২০টি অধ্যাদেশ বিলুপ্ত বা বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিটি যে ২০টি অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করেছে, সেগুলোর বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ১. ১৬টি অধ্যাদেশ বর্তমানে এগুলো বিলুপ্ত হলেও পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করবে। ২. ৪টি অধ্যাদেশ এগুলো স্থায়ীভাবে বাতিল ও সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিরোধীদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা আপত্তি : প্রতিবেদনটি সর্বসম্মত হলেও ২০টি অধ্যাদেশের বিষয়ে কমিটির বিরোধী দলীয় সদস্যরা দ্বিমত পোষণ করেছেন এবং ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রদান করেছেন। তাদের আপত্তির জায়গাগুলো হলো, অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করা ৪টি অধ্যাদেশ।সংশোধনের সুপারিশ করা ২টি অধ্যাদেশ। বাতিল করে পুনরায় বিল আকারে আনার তালিকায় থাকা ১১টি অধ্যাদেশ। স্থায়ীভাবে বাতিলের তালিকায় থাকা ৩টি অধ্যাদেশ।
সংসদীয় কমিটির এই প্রতিবেদনটি এখন হাউসে আলোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য গৃহীত হবে। অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের আইনি পদক্ষেপগুলোকে স্থায়ী রূপ দিতেই এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৩ সদস্যের এই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি পরপর তিনটি বৈঠকে ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের কাজ সম্পন্ন করে।



