জাতীয় সংবাদ

গণভোট ইস্যুতে সরকারকে হুঁশিয়ারি ১১ দলীয় ঐক্যের

প্রবাহ রিপোর্ট : গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারি অবস্থানের প্রতিবাদ ও তা অবিলম্বে বাস্তবায়নের দাবিতে রাজধানীতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ১১ দলীয় ঐক্য। শনিবার (৪ এপ্রিল) বিকেলে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে মিছিল পূর্ব সমাবেশে ঐক্যের নেতারা দাবি করেন, সংস্কার এবং গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সরকার ফ্যাসিবাদ হয়ে উঠছে। এ সময় তারা হুঁশিয়ারি দেন, ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে গেলে অতীত সরকারের মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে বিএনপিকে।
দুপুরের পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতা-কর্মীরা খ- খ- মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে জড়ো হতে থাকেন। এ সময় তাদের হাতে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চাই’, ‘গণভোট মানতে হবে’-এমন নানা দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। নেতা-কর্মীরা গণভোটের পক্ষে ও সরকারের অবস্থানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
১১ দলীয় ঐক্য ঢাকা মহানগরী আয়োজিত এই বিক্ষোভ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম। সমাবেশে জোটের শীর্ষস্থানীয় নেতারা পর্যায়ক্রমে বক্তব্য রাখেন।
বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, সরকার জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে তোয়াক্কা না করে গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা করে তারা বলেন, অবিলম্বে এই রায় বাস্তবায়ন না করলে কঠোর আন্দোলনের ডাক দেয়া হবে। জনগণের ভোটাধিকার ও মতামতের প্রতিফলন নিশ্চিত করতে সংবিধান সংস্কারের ওপরও জোর দেন বক্তারা।
সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক বাংলাদেশে বিএনপির রাজনীতি মুনাফেকি আর সুবিধাবাদের রাজনীতি বলে মন্তব্য করে বলেন, জুলাই বিপ্লবের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন এই বাংলাদেশে এ ধরনের রাজনীতি এ দেশের মানুষ আর সহ্য করবে না।
বিক্ষোভোত্তর সমাবেশে মামুনুল হক বলেন, সরকারের প্রবর্তিত যেসব অধ্যাদেশ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, সেগুলো বিএনপির খুব পছন্দ। কিন্তু যেসব প্রস্তাবনা জাতির কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করে, সেগুলোই তাদের কাছে অপছন্দ। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে বিএনপি জনসম্মুখে এক কথা বললেও নেপথ্যে ভিন্ন আচরণ করেছে।
বিএনপি প্রধানের উদ্দেশে তিনি বলেন, “তলে তলে এক কথা আর প্রকাশ্যে আরেক কথা বলাকে আমাদের দেশে মুনাফেকি বলা হয়। বিএনপির রাজনীতির দুটি বুনিয়াদ আজ জাতির সামনে স্পষ্ট– এক মুনাফেকি আর অন্যটি সুবিধাবাদ।”
মামুনুল হক আরও বলেন, “জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে যদি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেন এবং গণরায়কে হাইকোর্ট দেখান, তবে এ দেশের মানুষ রাজপথে আপনাদের মোকাবিলা করবে। ৭০ শতাংশ জনগণের বিপক্ষে গিয়ে ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকা যাবে না।”
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সন্তানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, “জনতার বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো বিশেষ কায়দায় নির্বাচন করার চেষ্টা করলে তার পরিণাম আপনাদেরই ভোগ করতে হবে। অতীতে আপনাদের ভুলের খেসারত আমাদের ২৫ বছর ধরে দিতে হয়েছে, গুম-খুন ও হত্যার শিকার হতে হয়েছে। আমরা চাই আপনারা সুন্দরভাবে দেশ পরিচালনা করুন এবং জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুন।”
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, এনসিপির সদস্যসচিব আকতার হোসেন এমপি এবং লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান প্রমুখ।

সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বায়তুল মোকাররম থেকে শুরু হয়ে নাইটিঙ্গেল মোড় হয়ে কাকরাইলে গিয়ে শেষ হয়।
অপরদিকে, নির্বাচনে জয়লাভের পর বিএনপি বদলে গেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। শনিবার (৪ এপ্রিল) বিকেলে রাজধানীর দক্ষিণ পীরেরবাগে আয়োজিত ঈদ পুনর্মিলনী ও গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্যকালে এমন অভিযোগ করেন তিনি।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ইতোমধ্যে জাতীয় জীবনে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। যে জুলাই আজকের এই পরিবেশ আমাদের দিলো, যে জুলাই ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এনে দিলো, সেই জুলাই একসঙ্গে দু’টি নির্বাচন দিয়েছিল। একটি সংসদ নির্বাচন এবং অন্যটি গণভোটের নির্বাচন। দুই নির্বাচনেই জনগণ তাদের মূল্যবান রায় দিয়েছে। প্রথমটিতে যেভাবেই হোক একটি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে এবং সরকার গঠন করেছে। কিন্তু গণভোটে সংস্কারের পক্ষে সংবিধানের যেসব আইনের কারণে এতদিন জনগণ অধিকার হারাচ্ছিল, ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল, সেই জায়গাগুলো পরিবর্তন করে ৬৮ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ সংস্কার করার পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু এই গণভোটের গণরায় ইতোমধ্যে সরকারি দল অস্বীকার করেছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমি যেমন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছেন। গণভোটের এই দাবি আমরা বলার আগে তাদের নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথমে দাবি জানিয়েছিলেন যে, গণভোটের মাধ্যমে এই সংস্কারের রায়কে আইনি বৈধতা দিতে হবে। আমরা সেটি সমর্থন করেছিলাম। ভোটের দিন পর্যন্ত আমাদের অবস্থান এক ছিল। কিন্তু ভোটের রেজাল্ট হওয়ার পর তারা বদলে গেছে। যে ম্যাকানিজমেই হোক, যখনই তারা দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে, এরপরই তারা অতীতের সব ওয়াদা ভুলে গেছেন।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা তাদের দলীয় ৩১ দফার কথা বলেন। ওই দফার প্রথম দফাই হচ্ছে- তারা যদি সরকার গঠন করে, তাহলে তারা একটি সংস্কার কমিশন গঠন করে সংবিধানের ওইসব ধারাগুলো সংস্কার করবেন, যে ধারাগুলো অতীতে সরকারকে ফ্যাসিবাদী বানিয়েছে। কিন্তু আমরা এখন যখন সংস্কারের কথা বলি, সরকারি দল তখন বলে সংবিধানে কোনো সংস্কারের কথা নেই।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, জনগণের অধিকারের চৌকিদারি করা, পাহারাদারি করা আমাদের দায়িত্ব। বিরোধী দলের দ্বারা জনগণের অধিকার লঙ্ঘিত হয় না, লঙ্ঘিত হয় সরকারের দ্বারা। সরকার যদি কোনো জায়গায় জনগণের অধিকার লঙ্ঘন করে, ইতিবাচকভাবে আমরা সেটি ধরিয়ে দিয়ে সহযোগিতা করব। আমাদের সহযোগিতা যদি সরকার গ্রহণ করে আমরা তাদের ধন্যবাদ দেবো। আর যদি আমরা সহযোগিতার চেষ্টার পরও সরকার আমাদের সহযোগিতা গ্রহণ না করে, সংশোধন না হয়, মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে ক্ষতি করতেই থাকে, তবে আমরা প্রতিবাদ করব। প্রয়োজনে প্রতিরোধ করব। এটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
অপরদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, এখন যারা ক্ষমতায় গিয়েছেন একমাসও হয়নি। তারা ১৮০ ডিগ্রি উল্টো ঘুরে গিয়েছে। তারা অন্তবর্তীকালীন সরকারের গণভোটের অধ্যাদেশ বাতিল করার জন্য ব্যবস্থা করছে। মানুষ আস্তে আস্তে ভুলে যায়, আস্তে আস্তে উল্টো চলে। কিন্তু তারা একমাসেই উল্টো চলছে।
শনিবার (৪ এপ্রিল) দুপুরে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলা মিনি স্টেডিয়াম মাঠে আয়োজিত জামায়াত প্রার্থীর নির্বাচনী সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, দেশের মানুষ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রত্যাশা করে। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত হলেই প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই ৯ এপ্রিলের নির্বাচনে জনগণকে সচেতন হয়ে সঠিক প্রার্থীকে বেছে নিতে হবে। দাঁড়িপাল্লা প্রতীক ন্যায়বিচার ও ইনসাফের প্রতীক-এ প্রতীকের পক্ষে গণসমর্থন দিন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপি-জামায়াতসহ ৩৩টি দল ফ্যাসিস্ট আমলের বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সংস্কারের জন্য সাংবিধানিক, রাজনৈতিক, আইনি, প্রশাসনিক ৮৪টি সংস্কারের বিষয়ে একমত হয়েছিলাম। তার মধ্যে ৪৭টি সংস্কার ছিল সাংবিধানিক পরিবর্তন। এখন যারা ক্ষমতায় গিয়েছেন একমাসও হয়নি। তারা ১৮০ ডিগ্রি উল্টো ঘুরে গিয়েছে। তারা অন্তবর্তীকালীন সরকারের গণভোটের অধ্যাদেশ বাতিল করার জন্য ব্যবস্থা করছে। মানুষ আস্তে আস্তে ভুলে যায়, আস্তে আস্তে উল্টো চলে। কিন্তু তারা একমাসেই উল্টা চলছে।
নির্বাচনী সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্ম আজ পরিবর্তন চায়। দুর্নীতি, দুঃশাসন ও অবিচারের বিরুদ্ধে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ৯ এপ্রিলের নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখুন।
ঝিনাইগাতী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মো. নুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি মো. ফরহাদ হোসেনের সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন আহমেদ, কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদের সদস্য মো. মনজুরুল ইসলাম ভূঁইয়া, শেরপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা হাফিজুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি গোলাম কিবরিয়া ভিপি, সাবেক সেক্রেটারি মাওলানা জাকারিয়া মো. আব্দুল বাতেন, জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী আলহাজ্ব মাসুদুর রহমান মাসুদ প্রমুখ।
বক্তারা আসন্ন নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে বক্তব্য তুলে ধরেন। সভায় কেন্দ্রীয়, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দসহ বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী অংশ নেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button