জাতীয় সংবাদ

ইসরায়েল কোনো বাস্তব অর্জন করতে পারেনি

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ এদিকে দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননে ইসরায়েলের হামলার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, এসব হামলার লক্ষ্য হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি। তবে এই অভিযান চলবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। আগামী শুক্রবার পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য শান্তি আলোচনায় ইসরায়েলের অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে ব্রেগম্যানের মতে, লেবাননে হামলা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের স্বাধীনতা নির্ধারিত হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানে অবস্থানরত হিজবুল্লাহর মিত্রদের অবস্থানের ওপর। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে নিউইয়র্কে ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কনসাল জেনারেল অ্যালোন পিনকাস বলেন, যদি এই যুদ্ধবিরতি দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে টিকে থাকে, তাহলে বলা যায় ইসরায়েল বাস্তবে প্রায় কোনো অর্জনই করতে পারেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি নিয়ে ভাবতে বসেছে ইসরায়েল। তবে এই ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের চোখে দেশটি কিছুটা দুর্বল অবস্থানে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। মঙ্গলবার রাতে ঘোষিত এই যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান এখনো টিকে আছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত কমে এসেছে এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। এদিকে, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এই যুদ্ধবিরতির খবর প্রকাশের পর নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে ইংরেজিতে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। সেখানে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছে ইসরায়েল। বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, ইরান এখন আর যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, আরব প্রতিবেশী এবং বিশ্বের জন্য কোনো পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র বা সন্ত্রাসী হুমকি নয়। বিশ্লেষকদের মতে, এমন দাবি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তবে এই যুদ্ধবিরতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তও ছিল। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ঘোষণা করেছিল, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের হামলাও বন্ধ থাকবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দেন, এই যুদ্ধবিরতিকে তিনি লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মনে করেন না। অন্তত আপাতত, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চলার শর্তে লেবাননে এই অভিযান অব্যাহত রাখতে সম্মতি দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেতানিয়াহুর এই অবস্থানের প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এই যুদ্ধবিরতিকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় ‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে শুরুতে জোরালো সমর্থন দিয়েছিলেন লাপিদ। যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় ইসরায়েলকে রাখা হয়নি বলে তিনি তোপ দাগেন। লাপিদ বলেন, এই আলোচনায় ইসরায়েলকে সম্পৃক্তই করা হয়নি। সামরিক সাফল্য থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়েছেন, কৌশলগতভাবে ব্যর্থ হয়েছেন এবং নিজে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তার একটিও অর্জন করতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ‘অহংকারের’ কারণে দেশের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে ইসরায়েলের বহু বছর সময় লাগবে। সমালোচনার ঝড় আরও জোরালো হতে বেশি সময় লাগেনি। বামপন্থী হাদাশ পার্টির নেতা ওফের ক্যাসিফও নেতানিয়াহুকে কটাক্ষ করেন। তিনি বলেন, ঘোষণাটি ইংরেজিতে হওয়ায় আমি অবাক হইনি। তিনি অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলের জনগণের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী নন। তিনি খুব কমই জনগণের সামনে আসেন এবং প্রায় কখনোই টেলিভিশন বা রেডিও স্টুডিওতে প্রবেশ করেন না। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর নিজের যুদ্ধের লক্ষ্য জনগণের সামনে তুলে ধরতেও দুই সপ্তাহ সময় নেন নেতানিয়াহু। ক্যাসিফের বলেন, তিনি সম্ভবত জানেন, যারা তাকে সমর্থন করেন তারা যেকোনো অবস্থাতেই তা করবেন। আর যারা বিরোধিতা করেন তারা সেটাই চালিয়ে যাবেন। তাই তিনি যখন কথা বলেন, তখন মূলত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের জন্য এবং নিজের সমর্থকদের আশ্বস্ত করতেই বলেন। নেতানিয়াহুর যুদ্ধের লক্ষ্য ঃ বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘোষিত যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে ইরানের জনগণ ‘নির্মম স্বৈরশাসন’ থেকে মুক্ত হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো নতুন কিছু নয়; বরং ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোরই পুনরাবৃত্তি। আসলে ১৯৯০’র দশক থেকেই নেতানিয়াহু দাবি করে আসছেন, ইরান খুব শিগগিরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে যাচ্ছে। তবে গত ৪০ দিনের হামলায় উল্লেখযোগ্য সামরিক সাফল্য অর্জন সত্ত্বেও এই দুই লক্ষ্যই অর্জিত হয়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কিংস কলেজ লন্ডনের ওয়ার স্টাডিজ বিভাগের সিনিয়র টিচিং ফেলো আহরোন ব্রেগম্যান বলেন, ইসরায়েলিরা যুদ্ধবিরতি নিয়ে গভীরভাবে হতাশ, কারণ যুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলোর একটিও অর্জিত হয়নি। ইরানের সরকার এখনো টিকে আছে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি খুব দ্রুত পুনর্গঠন করা সম্ভব এবং তাদের কাছে এখনো ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতার প্রায় ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা দিয়ে ১০টি বোমা তৈরি করা সম্ভব। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, আকাশসীমার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো, শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত হওয়া; যার মধ্যে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও যুদ্ধের প্রথম দিনেই নিহত হন। এমন বড় ধরনের ক্ষতির পরও ইরান এক ধরনের বিপরীতধর্মী শক্তি অর্জন করেছে। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, সামরিকভাবে বড় ধাক্কা খেলেও কৌশলগত দিক থেকে ইরানই শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ব্রেগম্যানের বলেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র অনেক কৌশলগত জয় পেয়েছে। তারা সামরিকভাবে জিতেছে, কিন্তু কৌশলগতভাবে ইরানই স্পষ্ট বিজয়ী। কৌশলগত ভুল? ঃ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের টানা সামরিক হামলার মুখেও ইরান সরকারের টিকে থাকাকে অনেকেই বড় কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখছেন। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার সিদ্ধান্ত। চলমান আলোচনার প্রেক্ষাপটে এখন এই প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা কার্যত ইরান ও তার প্রতিবেশী ওমানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০১৮ সালে নেতানিয়াহুর উৎসাহে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের যে আন্তর্জাতিক চুক্তি ছিল, তা থেকে একতরফাভাবে সরে আসেন ট্রাম্প। এরপর থেকেই কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে ছিল ইরান। তবে এখন অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে চলাচলের জন্য জাহাজগুলোর ওপর নতুন আরোপিত ফি থেকে ইরান অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। পাশাপাশি, যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক শিথিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ট্রাম্প। আহরোন ব্রেগম্যান বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ট্রাম্পকে ভারসাম্যহীন করে দেয়, যেখান থেকে তিনি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদরা এই সিদ্ধান্তকেই যুদ্ধের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে দেখবেন। কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই যুদ্ধে ইসরায়েলের পদক্ষেপ উল্টো ইরান সরকারকেই আরও শক্তিশালী করেছে। তেহরানের শরিফ ইউনিভার্সিটি, যেটি গত জানুয়ারিতে ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের কেন্দ্র ছিল, ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button