খানজাহান আলীর মাজারে কুমিরের কুকুর টেনে নেওয়ার নেপথ্যে…

মৃত কুকুরের নমুনা সংগ্রহ, ঘটনা তদন্তে কমিটি
প্রবাহ রিপোর্ট : বাগেরহাটের হজরত খানজাহান (রহ.)-এর মাজার-সংলগ্ন দিঘির ঘাট থেকে একটি কুকুরকে কুমির টেনে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কুকুরটিকে পা বেঁধে কুমিরের সামনে খাওয়ানের জন্য ফেলা হয়েছে, মাজারের খাদেমরা কুমিরকে কুকুর খাওয়ান—ফেসবুকে অনেকেই এমন ক্যাপশনে ভিডিওটি শেয়ার করেছেন। তবে মাজার কর্তৃপক্ষ, প্রত্যক্ষদর্শী এবং সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
তারা জানান, ঘটনাটি গত বুধবার (৮ এপ্রিল) বিকেলের। কুকুরটি অসুস্থ ছিল। সেদিন কুকুরটি শিশুসহ কয়েকজনকে কামড় দেয়। পরে মাজারের নিরাপত্তাপ্রহরী ফোরকানকে কামড়ায়। তিনি পা ঝাড়া দিলে কুকুরটি ঘাটে পড়ে যায়। সিঁড়ি পিচ্ছিল হওয়ায় আর ওপরে উঠতে পারেনি। একপর্যায়ে কুমির কুকুরটিকে ধরে টেনে পানির নিচে নিয়ে যায়। ফেসবুকে এই অংশটুকু ভাইরাল হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার বিকেলে অন্যান্য দিনের মত মাজার-সংলগ্ন দিঘীর প্রধান ঘাটে দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের ভিড় ছিল। তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন মাজারের খাদেমদের নিয়োগকৃত নিরাপত্তাপ্রহরী ফোরকান হাওলাদার। হঠাৎ নারীদের ঘাটের দিক থেকে একটি কুকুর দৌড়ে এসে ফোরকানের পায়ে কামড় দেয়। তিনি পা ঝাড়া দিলে কুকুরটি ঘাটে পড়ে যায়। একপর্যায়ে কুমির এসে কুকরটিকে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে কুকুরটির মরদেহ পাওয়া গেলে মাজারের খাদেমরা সেটিকে মাটি চাপা দেন।
নিরাপত্তাকর্মী ফোরকান হাওলাদার বলেন, “সেদিন ঘাটের কাছাকাছি কুমিরটি অবস্থান করছিল। অনেকে দাঁড়িয়ে কুমির দেখছিলেন। সম্প্রতি ডিম পাড়ায় কুমিরটি একটু হিংস্র হয়ে গেছে। নিরাপত্তার জন্য তাই ঘাটেই ছিলাম। হঠাৎ নারীদের ঘাট থেকে দৌড়ে এসে একটি কুকুর আমার পায়ে কামড় দেয়। পা ঝাড়া দিলে সেটি ঘাটে পড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই কুমির এসে কুকুরটিকে ধরে পানির নিচে নিয়ে যায়। প্রায় আধঘণ্টা পর কুকুরটি দিঘির অন্য পাশে ভেসে উঠলে উদ্ধার করে মাটি চাপা দেওয়া হয়।”
মাজারের নারীদের ঘাটের পাশের দোকানি বিনা আক্তার বলেন, “দোকানের সামনেই কুকুরটি শিশুসহ কয়েকজনকে কামড় দেয়। এছাড়া, তিনটি মুরগির বাচ্চাও মেরে ফেলেছে।”
মাজারের খাদেমদের দাবি, দিঘির ঘাট থেকে কুমিরের কুকুর নিয়ে যাওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনগড়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। কুকুরটি অসুস্থ ছিল, কয়েকজনকে কামড় দিয়েছে।
প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরালের নেশায় ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, যা দুঃখজনক। নানা ধরণের ভুল তথ্য ছাড়ানোর প্রেক্ষিতে আমরা এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়রি (জিডি) করেছি। আমরা যেটা শুনেছি, কুকুরটি নিজে থেকে ঘাটে গেছে। কেউ তাকে বেঁধে বা ঠেলে দিঘিতে ফেলেনি।”
স্থানীয় যুবক মেহেদী হাসান বলেন, “কুমিরটি কয়েকদিন আগে ডিম পেড়েছে। ডিম পাড়লে মা কুমির হিংস্র হয়ে যায়। আর কুমিরের মুখের সামনে থেকে কুকুর ছিনিয়ে আনবে কে? এত সাহস কার আছে।”
এদিকে, কুকুরের মৃত্যুর ঘটনার বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আতিয়া খাতুনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন- বাগেরহাট সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি।
শনিবার (১১ এপ্রিল) বিকেলে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তত্ত্বাবধায়নে মাটি খুঁড়ে কুকুরটি তুলে ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। কুকুরটি মাথা ঢাকার সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরিতে (সিডিআইএল) পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে প্রতিবেদন পেলে কুকুরটি অসুস্থ ছিল কি না জানা যাবে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাহেব আলী এসব তথ্য জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সদস্য শেখ মোহাম্মাদ নূর আলম বলেন, “মাজারের দিঘিতে কুমির যে কুকুরটিকে নিয়েছে বিষয়টি হৃদয়বিদারক। কেউ যদি আনন্দ পাওয়ার জন্য বা ভিউ বাণিজ্যের জন্য কুকুরটিকে ধরে কুমিরের মুখে দেয় তাহলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, “ফেসবুকে ছড়ানো হচ্ছে, কুমিরকে কুকুর খাওয়ানো হয়। এটা ভিত্তিহীন। অনেক সময় ভক্তরা চান, তাদের মুরগি কুমিরের জন্য ছুঁড়ে দিতে। মুরগি ছুঁড়ে দিলে কিন্তু আমার পাড়ে চলে আসে। এ ধরণের জীবিত প্রাণী ছুঁড়ে দেওয়া কুসংস্কার বন্ধ করা দরকার। খাদেমসহ যারা মাজারের দেখাশুনার দায়িত্বে আছেন তাদেরকে নির্দেশনা দিয়েছি, কুমিরের খাবার হিসেবে যেন কোনো জীবন্ত প্রাণী দিঘিতে না ফেলা হয় এবং এ বিষয়ে যেন তারা সতর্ক থাকেন।”
তিনি আরো বলেন, “কুকুরের শরীরে কুমিরের আঘাত ছাড়া আর কোন আঘাত আছে কি না তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত কমিটির দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমরা ব্যবস্থা নেব।”
এ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানোর বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার অনুরোধ করেন এই কর্মকর্তা।
খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার-সংলগ্ন দিঘিতে খানজাহান প্রথম কুমির ছেড়েছিলেন। তবে তার সেই রেখে যাওয়া কুমির এখন আর নেই। ২০০৫ সালে ভারতের মাদ্রাজ থেকে আনা ৫টি কুমিরের মধ্যে এখন মাত্র একটি কুমির আছে।



