জাতীয় সংবাদ

মানবতাবিরোধী অপরাধে ইনুর ১০ বছরের কারাদ-

রায়ে মোটেই সন্তুষ্ট নই : চফ প্রসিকিউটর

প্রবাহ রিপোর্ট : জুলাই বিপ্লবে সারা দেশে হত্যাকা-সহ কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদ- দিয়েছে আদালত। মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন।
প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন— বিচারক মঞ্জুরুল বাছিত ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবির। রায় ঘোষণা বাংলাদেশ টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করবে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। গত ২২ জুন রায়ের জন্য এ দিন ধার্য করে ট্রাইব্যুনাল। গত ১৪ মে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে ট্রাইব্যুনাল।
এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘হাসানুল হক ইনু ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের একজন সহযোগী পার্টনার ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সব কর্মকা-ে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৯ ও ৪ আগস্ট তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কিছু বিষয় নিয়ে ফোনে কথা বলেছেন। সেই সব কথাবার্তার মধ্য দিয়ে কারফিউ জারি এবং জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে ‘জঙ্গি কার্ড’ খেলার পরামর্শ দিয়েছেন। জুলাই আন্দোলনকে দুই ভাগে বিভক্ত করে এক ভাগকে জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো—এসব বিষয় তার কথোপকথনের মধ্যে ছিল।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমরা এই মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে ১০ জন সাক্ষী উপস্থাপন করেছি এবং কথোপকথনের ভিডিও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছি। সেখানে আমরা পরিষ্কারভাবেই এটি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি এবং আমরা তথ্য-প্রমাণ দিয়েছি যে, জনাব ইনু সাহেব একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেশপ্রেমিক জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষকে জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে তাদের ওপরে নিপীড়ন চালানোর জন্য নানা কৌশল বা নানা পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। যার ফলে বহু লোকের জীবনে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। আমরা আশা করছি তার সর্বোচ্চ শাস্তি হবে।’
গত ২ এপ্রিল ইনুর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন তার আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। টানা ৯ কার্য দিবস যুক্তিতর্ক তুলে ধরেন তিনি। এরপর প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে যুক্তি তুলে ধরা হয়।
গত বছরের ১ ডিসেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ১০ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। ১০ জন সাক্ষী ইনুর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে এসে জবানবন্দি দেন। গত ২ নভেম্বর ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বিচার কাজ শুরুর আদেশ দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল।
এ রায়ে মোটেই সন্তুষ্ট নই, ইনুর সাজা নিয়ে চিফ প্রসিকিউটর : মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে দেওয়া ১০ বছরের কারাদ-ের রায়ে সন্তুষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে নিজ কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ প্রতিক্রিয়া জানান।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকা-ের আটটি অভিযোগ ছিল। এর মধ্যে প্রসিকিউশনের তিনটি চার্জ (অভিযোগ) তথা ৩, ৬ ও ৭ নম্বর প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। আর বাকিগুলো প্রমাণিত হয়নি। প্রমাণিত তিনটি চার্জের প্রতি চার্জে ১০ বছর করে সাজা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২। একইসঙ্গে ৬ ও ৭ নম্বর চার্জে এক লাখ করে দুই লাখ টাকা জরিমানা করেছেন। তবে আমরা এ রায়ে মোটেই সন্তুষ্ট নই।
আটটি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ইনুর বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ হলো ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে হওয়া সিদ্ধান্তে একাত্মতা পোষণ করেছিলেন। অর্থাৎ ওই বৈঠকে কারফিউ জারির মধ্য দিয়ে ‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশনা এবং আন্দোলন দমনের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াতকে নির্মূল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অন্যতম শরিক নেতা হিসেবে ইনুও সেই বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। এছাড়া ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের ‘জঙ্গি ট্যাগ’ দিয়েছিলেন তিনি। শেখ হাসিনার সঙ্গেও একাধিকবার ফোনালাপ করেছেন। ফোনালাপে অপরাধমূলক কর্মকা-ে সায় দেন জাসদ সভাপতি। ‘জঙ্গি কার্ড’ খেলার মধ্য দিয়ে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বিভিন্ন রকমের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা খুব পরিষ্কারভাবে বলতে চাই যে, ১০ জন সাক্ষীর জবানবন্দিতে এসব অভিযোগ প্রমাণ করেছেন। অডিও-ভিডিওর মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন তারা। এছাড়া সাফাই সাক্ষ্যে দেওয়া লিখিত বক্তব্যেও ইনু স্বীকার করেছিলেন। তার স্বীকারোক্তির পরও অন্যান্য চার্জ প্রমাণিত হবে না, এটা আমাদের কাছে বোধগম্য মনে হয়নি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, অপরাধমূলক কর্মকা-ের জন্য ইনুকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে ট্রাইব্যুনাল যে সাজা দিয়েছেন, এটা একেবারেই স্বেচ্ছামূলক। তারা যথাযথভাবে সাক্ষীর সাক্ষ্য পর্যালোচনা করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে আমরা মনে করি। আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে অবশ্যই আপিল করবো। একইসঙ্গে তিনটি চার্জে দেওয়া শাস্তিও অপ্রতুল। অতএব এ সাজা বাড়াতেও আমরা আপিল করবো। রায়ের কপি পেলেই উচ্চ আদালতে যাবো।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button