জাতীয় সংবাদ

সাঈদীর সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে অপহরণকারী এএসপি ফজলু গ্রেফতার : কারাগারে প্রেরণ

ট্রাইব্যুনালের গেট থেকে অপহরণ করা হয়

প্রবাহ রিপোর্ট : ২০১২ সালে হাইকোর্ট এলাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে অপহরণের পর গুমের ঘটনায় সরাসরি জড়িত ছিলেন তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ফজলুর রহমান। এ তথ্য জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম।
শুক্রবার (৩ জুলাই) বিকেলে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) থেকে পাঠানো রিকুইজিশনের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাত ১০টার দিকে রাজধানীর বাড্ডায় নিজ বাসা থেকে ফজলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আদালতের আদেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা জানতে পেরেছি, আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মামলার সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে অপহরণের ঘটনায় তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন।
তিনি আরও জানান, ঘটনার সময় ফজলুর রহমান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একজন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনার দিন সুখরঞ্জন বালী হাইকোর্ট এলাকায় গাড়ি থেকে নামার পর ফজলুর রহমান তাকে থাপ্পড় মারেন এবং শার্টের কলার ধরে ডিবির একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। এ ঘটনায় তিনি ও তার টিমের সদস্যরা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বলেও তদন্তে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রম ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমেই পরিচালিত হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে নিখোঁজ হওয়া সুখরঞ্জন বালীকে গুম করার ঘটনায় গ্রেপ্তার সাবেক এক সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ফজলুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। শুক্রবার (৩ জুলাই) বিকেলে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলমের আদালত এই আদেশ দেন।
গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার নিজ বাসা থেকে ফজলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেন করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এরপর শুক্রবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. হেলালুল ইসলাম আসামিকে এই মামলায় তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে জেল হাজতে আটক রাখার আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে শুনানিকালে তাকে এজলাসে ওঠানো হয়নি।
আটক রাখার আবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় সময় আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর পক্ষের সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী তার সঙ্গীয় আইনজীবী সহ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুরাতন হাইকোর্ট ভবনের মূল ফটকের সামনে গাড়ি যোগে এসে থামার সাথে সাথে সাদা পোশাকধারী বাহিনীর লোকজন সুখরঞ্জন বালীকে গাড়ি থেকে টেনে হেঁচড়ে নামিয়ে জোরপূর্বকভাবে তাদের সাদা ডবলকেবিন গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এরপর ভিকটিম সুখরঞ্জন বালী’কে চোখবাঁধা অবস্থায় ২ মাসব্যাপী শারীরিক নির্যাতন করে অন্ধকার বন্দিশালায় আটক রাখে। পরবর্তীতে ভারতের দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে ৫ বছর আটক থাকার পর সেখানকার গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে বাংলাদেশ থেকে তার ছেলে অপূর্ব বালী ভারতে গিয়ে কারাগার থেকে তার বাবাকে জামিনে মুক্ত করে নিয়ে আসে।
আরও বলা হয়, মামলাটি তদন্তকালে এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য প্রমাণে জানা যায় যে, ঘটনার দিন ডিএমপি ডিবি থেকে ২ টি ডবল কেবিন গাড়ি যোগে আসামি মো. ফজলুর রহমান ও তার সঙ্গীয় অফিসার ও ফোর্স আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুরাতন হাইকোর্ট ভবনের সম্মুখ থেকে জোরপূর্বকভাবে আটক করে ডিএমপি, ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে হাজতখানায় রাখার পর তাকে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঘটনার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে জেল হাজতে আটক রাখার প্রার্থনা করেন এই তদন্তকারী কর্মকর্তা।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, পিরোজপুরের বাসিন্দা সুখরঞ্জন বালী ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে আদালত প্রাঙ্গণ থেকেই নিখোঁজ হন। সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তাকে সীমান্ত এলাকায় পাওয়া গেছে। তবে তার পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো তখন থেকেই অভিযোগ করে আসছিল যে তাকে ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকেই তুলে নেওয়া হয়েছিল। ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, ওই মাসেরই ২১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর কার্যালয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেন সুখরঞ্জন বালী।
অভিযোগে তিনি দাবি করেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়া এবং পরে তার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ায় তাকে গুম ও নির্যাতন করা হয়েছিল। এই অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ৩২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জনকে বিবাদী করা হয়েছে।
আসামিদের তালিকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবির, সাবেক তদন্তকারী কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন এবং পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম আউয়ালের নামও রয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button