খামেনির ‘রক্তের বদলা’ নেওয়ার শপথ ইরানের

শেষ বিদায় জানাতে ৭ দিনের কর্মসূচি
খামেনির কফিন যাবে কারবালায়
ইরানের মাশহাদে শেষ জানাজা-দাফন
প্রবাহ ডেস্ক : ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কফিন প্রকাশ্যে আনার পর বর্তমানে তার মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে নিয়ে আসা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ৩৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি শুরু করল ইরান।
সংশ্লিষ্টদের আশা, খামেনির জানাজায় প্রায় ২ কোটি মানুষ অংশ নেবে, যা ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানাজা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শুক্রবার (৩ জুলাই) থেকে শুরু হওয়া ৭ দিনব্যাপী শোকানুষ্ঠান শেষ হবে আগামী বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) তার নিজ শহর মাশহাদে ইমাম রেজা মাজারে দাফন করার মাধ্যমে।
এই ৭ দিন ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে।প্রাথমিকভাবে মার্চ মাসে নির্ধারিত ছিল খামেনির জানাজা ও দাফন কেন্দ্রিক শোকানুষ্ঠান। তবে, ইরানের সঙ্গে মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় তা স্থগিত করা হয়। ৮৬ বছর বয়সী খামেনি ইরান যুদ্ধের প্রথম দিন অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি, তার বাসভবনে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বিমান হামলায় পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যসহ নিহত হন।
ইসলামি বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী এবং দেশটির প্রথম সর্বোচ্চ নেতা হওয়া আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সাল থেকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ইরানের নেতৃত্বে আসেন। পাহলভি রাজতন্ত্রের শাসনের অবসান ঘটানো বিপ্লবের পেছনের আদর্শিক শক্তি ছিলেন খোমেনি, অন্যদিকে খামেনি সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীকে গড়ে তুলেছিলেন।
এই দাফন অনুষ্ঠান আলি খামেনির পুত্র মোজতবা খামেনির অধীনে প্রথম বড় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। চার মাস আগে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। খামেনির শেষ বিদায়কে কেন্দ্র করে সাত দিনব্যাপী কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
সাত দিনের কর্মসূচি : ইরান ও ইরাকজুড়ে সাত দিনব্যাপী শোকানুষ্ঠান শুক্রবার (৩ জুলাই) তেহরানে শুরু হয়েছে। এদিনের কর্মসূচি হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিশ্বনেতা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং প-িতরা খামেনিকে শ্রদ্ধা জানাতে তেহরানে জড়ো হয়েছেন।
৪ ও ৫ জুলাই তেহরানে সর্বজনীনভাবে শোক পালন ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হবে। শেষ বিদায় জানাতে সর্বসাধারণের জন্য পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের কফিনসহ খামেনির কফিন থাকবে গ্র্যান্ড মোসাল্লাতে। বিশাল জনসমাগমের জন্য নির্মিত গ্র্যান্ড মোসাল্লা ইরানের অন্যতম বৃহত্তম প্রার্থনা কেন্দ্র এবং এটি দীর্ঘদিন ধরে প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় আয়োজনের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
৬ ও ৭ জুলাই, জানাজার উদ্দেশ্যে শোকাহত ইরানিরা রাজধানী থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার (৭৫ মাইল) দক্ষিণে অবস্থিত কোমের দিকে অগ্রসর হবেন। কোম হলো ইরানের শিয়া ইসলামি পা-িত্যের প্রধান কেন্দ্র এবং অন্যতম পবিত্র শহর। এখানে দেশটির বৃহত্তম মাদরাসাগুলো অবস্থিত।
ইরানি ও ইরাকি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৮ জুলাই নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে। এরপরে ইরাকের নাজাফ ও কারবালা শহরে গণমিছিল অনুষ্ঠিত হবে।
নাজাফের ইমাম আলি মাজার শিয়াদের জন্য অন্যতম পবিত্র স্থান, যেখানে প্রতি বছর লাখ লাখ মুসল্লি আসেন। বিশ্বাস করা হয় যে, এখানে নবী মুহাম্মদের চাচাতো ভাই ও জামাতা এবং শিয়া ইসলামের প্রথম ইমাম, ইমাম আলি ইবনে আবি তালিবের সমাধি রয়েছে।
কারবালায় অবস্থিত ইমাম হুসাইন এবং আব্বাসের মাজার শিয়া ইসলামের অন্যতম পবিত্রতম স্থান। এই স্থানেই ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার যুদ্ধে ইমাম হুসাইন এবং আব্বাস শহিদ হয়েছিলেন। আর এই ঘটনাটি শিয়া পরিচয় এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
এরপর মরদেহটি চূড়ান্ত দাফন অনুষ্ঠানের জন্য ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে এবং ৯ জুলাই মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারে শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়ে দাফনের মাধ্যমে খামেনিকে শেষ বিদায় জানানো হবে। মাশহাদকে ইরানের পবিত্রতম শহর বলে মনে করা হয়। ইমাম রেজা ছিলেন শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমাম।
শহরটি আলি খামেনির জন্যও ব্যক্তিগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ১৯৩৯ সালে মাশহাদেই জন্মগ্রহণ করেন এবং তার জীবনের বেশিরভাগ সময় সেখানেই কাটান। তিনি কোমে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আগে এই শহরের ধর্মীয় মাদরাসায় অধ্যয়ন করেছিলেন।
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন দেশটির সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক আকস্মিক ও বিধ্বংসী বিমান হামলার মাধ্যমে খামেনিকে হত্যা করা হয়, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে পুরোপুরি বদলে দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। এই হত্যাকা-ের পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা এখন চরম সীমায় পৌঁছেছে।
রাজধানী তেহরানে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে অনুষ্ঠিত খামেনেই-এর জানাজার আনুষ্ঠানিকতার ফাঁকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই কঠোর হুঁশিয়ারি দেন সামরিক প্রধান। শোকগ্রস্ত ও ক্ষুব্ধ জনতার উপস্থিতিতে দেওয়া এই বক্তব্যকে মূলত শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে ইরানের সরাসরি যুদ্ধের ডাক হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
হুংকার ছেড়ে মেজর জেনারেল আমির হাতামি বলেন, আমরা পূর্বের চেয়ে আরও দৃঢ় সংকল্পের সাথে ইরানি জাতির মূল শত্রু—আমেরিকা এবং অপরাধী জায়নবাদী গোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করছি যে আমাদের শহীদ নেতা খামেনির পবিত্র রক্তের প্রতিটি ফোঁটার প্রতিশোধ আমরা নেবই। এই কাপুরুষোচিত হামলার চড়া মূল্য তাদের চোকাতে হবে।
সামরিক প্রধানের এমন বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে ইরান কেবল এই শোক কাটিয়ে ওঠার লড়াই করছে না, বরং মার্কিন ও ইসরাইলি সামরিক অবস্থানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের পাল্টা আঘাত বা সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এখন চরম যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে এবং যেকোনো সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সূত্র: আল-জাজিরা



