জননিরাপত্তায় নাগরিকদেরও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করতে হবে

# মাল্টিপার্টি এডভোকেসি ফোরামের গোলটেবিল বৈঠকে পুলিশ কমিশনার #
স্টাফ রিপোর্টার : খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. জুলফিকার আলী হায়দার বলেছেন, জননিরাপত্তার দায়িত্ব শুধুমাত্র পুলিশ বাহিনীর একার নয়। এক্ষেত্রে নাগরিকদেরও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করতে হবে। তাহলেই জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, ৫ আগষ্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে পুলিশ স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে বিরত থাকলেও বর্তমানে তারা কাজে ফিরেছে। ভেঙ্গে পড়া মনোবলও ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। ফলে সারাদেশের মত খুলনায়ও ভেঙ্গেপড়া আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতির চেষ্টা করা হচ্ছে। থানায়ও স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু হয়েছে। তবে ৫ আগষ্ট পূর্ববর্তী পুলিশ আর বর্তমান পুলিশের কাজে পার্থক্য রয়েছে। যে পুলিশ সদস্যরা চাকরির বাইরে ব্যক্তিগত স্বার্থে বা কোন পক্ষের হয়ে বেআইনী কর্মকান্ডে লিপ্ত হলে তার চাকরি থাকবে না। পুলিশে চাকরি করার জন্য বহু শিক্ষিত বেকার যুবক রয়েছে- তারা চাকরি করবে। সোমবার নগরীর একটি অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘জননিরাপত্তা বিঘœকারী বিষয় চিহ্নিতকরণ ও সমাধানে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মাল্টি পার্টি এ্যাডভোকেসি ফোরাম (এমএএফ) খুলনা এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। এফসিডিও’র অর্থায়নে ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের বাস্তবায়নে বাংলাদেশ স্ট্রেনদেনিং পলিটিক্যাল একাউন্টিবিলিটি ফর সিটিজেন এমপাওয়ারমেন্ট (বি-স্পেইস) প্রকল্পের সহায়তায় এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন মাল্টিপার্টি এডভোকেসি ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এবং মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক রেহানা ইসা। বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক এনামুল হক। গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ম্যাফ সদস্য এবং দৈনিক প্রবাহের চীফ রিপোর্টার মুহাম্মদ নূরুজ্জামান। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পথ ধরে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় গত ৫ আগষ্ট। সহ¯্রাধিক জীবনের বিনিময়ে এসেছে নতুন স্বাধীনতা। পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বরর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় দুই মাস হতে চলেছে। এখনো সারা দেশে পুলিশি কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। আর এই সুযোগে অপরাধীরা তাদের তৎপরতা বাড়িয়েই চলেছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হামলা, লুটপাট, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা ঘটছে। বাড়ছে হত্যাকা-ের মতো গুরুতর অপরাধও। পিটিয়ে মানুষ মারা হচ্ছে। অন্যদিকে পুলিশি কার্যক্রমে শিথিলতার সুযোগ নিচ্ছে মাদক কারবারি, অস্ত্র ব্যবসায়ী, চোরাকারবারিসহ অন্যান্য অপরাধীরাও। ইভটিজিং, মাদক সেবন ও খুনসহ নানা অপরাধে কিশোরদের জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। গ্রুপ করে কিশোররা এসব অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। খুলনার বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। নানা অপরাধের জন্ম দিচ্ছে এই গ্যাংগুলো। এসব গ্যাংয়ে যুক্ত হচ্ছে বিভিন্ন স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশু-কিশোররা। ছোট ছোট অপরাধ থেকে শুরু করে এখন খুনের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে কিশোরদের এই গ্রুপগুলো। খুলনা জিলা স্কুল, করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় ও সেন্ট যোসেফস হাইস্কুলসহ মহানগরীর বেশ কয়েকটি স্কুলে বখাটে যুবকদের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো। এসব কিশোরদের দিয়েই এখন এলাকায় অধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলছে। এর বাইরে মাদক ব্যবসা, ভূমি দস্যুতা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র বিক্রি ও ভাড়াটে খুনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে খুলনা শহরের ত্রাস হিসেবে চিহ্নিত বেশ কয়েকটি কিশোর অপরাধী দল। তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে শহরে বারবার খুনের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু অপরাধ জগতের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা রয়েছে ধরাছোয়ার বাইরে। সব অনৈতিক, অবক্ষয়, অপচয়, দুর্নীতি, সহিংসতা, পারিবারিক সংঘাত, শিশুহত্যা, নারী ধর্ষণ, গুম, হত্যা, লুটতরাজ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অপহরণসহ জননিরাপত্তাহীনতার সবকিছুই কি একা পুলিশ বাহিনীর পক্ষে সামাল দেয়া সম্ভব? নিশ্চই না। তবে এই পরিস্থিতিতে যেকোনো মূল্যে পুলিশি কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে হবে। সচেতন জনতাকেও এগিয়ে আসতে হবে। নিজেরা আইন হাতে তুলে না নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করতে হবে। ‘মব জাস্টিস’ বা ‘মব কিলিং’ বন্ধ করতে হবে। সমাজ-সচেতন না হলে এ নিশ্চয়তা সম্ভব নয়। সমাজ-সচেতনতার জন্য প্রয়োজন সামাজিক জাগরণের। জনসাধারণকে তাদের নিরাপত্তা, সম্পদ ও সম্মান লাভের জন্য অবশ্যই সংগঠিত সচেতন ও বলিষ্ঠ সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নাগরিকদেরই নাগরিক জীবনের নিরাপত্তার জন্য অব্যাহত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের খুলনা অঞ্চলের রিজিওনাল ম্যানেজার রুবাইয়াত হাসান। স্বাগত বক্তৃতা করেন খুলনা জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং ম্যাফ’র সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুর রশিদ। অন্যন্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন ও উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক-গবেষক ও নাগরিক ঐক্য খুলনা মহানগর শাখার সদস্য সচীব কাজী মোতাহার রহমান বাবু, খুলনা জেলা ইমাম পরিষদের জয়েন্ট সেক্রেটারী অধ্যক্ষ মাওলানা নাজমুস সউদ, মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ম্যাফ’র যুগ্ম সম্পাদক শেখ সাদি, মহানগর গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি বেলাল হোসেন, হিন্দু, বৌদ্ধ, খিস্ট্রাণ ঐক্য পরিষদের নেতা বিমান বিহারী অমিত, ম্যাফ সদস্য ও কালের কণ্ঠের রিপোর্টার কৌশিক দে বাপী, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মোহাম্মাদ হেলাল, সাইফ খান, সাজিদুল ইসলাম বাপ্পি, সোস্যাল এক্টিভিস্ট জোবাইয়া নওশিনসহ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দলনের বিভিন্ন কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমন্বয়ক এবং বিভিন্ন সংগঠন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে আলোচনার মাধ্যমে দেশের বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক পরিবেশে নাগরিক নিরাপত্তাসহ সামাজিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করা হয়।



