স্থানীয় সংবাদ

নকশা পরিবর্তনের অজুহাতে ভৈরব সেতুর কাজ বিলম্বিত করছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান

# ৭ মাস পর মাত্র ৮জন শ্রমিক নিয়ে কাজ শুরু
# নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় স্বপ্নভঙ্গ হতে চলেছে দিঘলিয়াবাসীর
# দ্বিতীয় দফায় ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি

এম রুহুল আমিন : নদী বেষ্টিত খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সাথে শহরের যোগাযোগ ও বন্ধন অক্ষুন্ন রাখতে ভৈরব নদীর উপর সেতু নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ সিধান্ত ছিল। দ্বীপ উপজেলা দিঘলিয়ার সাথে সেতুর কারনে মেলবন্ধন তৈরী হবে শহরের। খুলনার দৌলতপুর (রেলিগেট) ও ‘দিঘলিয়া-আড়–য়া-গাজীরহাট-তেরখাদা সড়কের (জেড-৭০৪০) প্রথম কিলোমিটারে ভৈরব নদীর ওপর ভৈরব সেতু নির্মাণ’ প্রকল্প। গত ২০২১ সালের ২৪ মে জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই সরকারি খাস জমির উপর তড়িঘড়ি করে ২৪ নং পিলারের টেস্ট পাইলিংয়ের মধ্য দিয়ে খুলনাবাসীর দীর্ঘ প্রত্যাশিত ভৈরব সেতুর নির্মাণযজ্ঞ শুরু হয়। নির্মাণ কাজ শুরুর পর আশার আলো দেখে খুলনার দিঘলিয়া ও দৌলতপুরের মানুষ। আশা ছিল দ্রুতই কাজ শেষ হলে সেতুর উপর দিয়ে যাতায়াতের। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। স্বপ্নভঙ্গ হল খুলনাবাসীর। প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, প্রথম দফায় প্রকল্পের সময় বাড়ানো হয় ২০২৪ সালে ৩০ জুন পর্যন্ত। কাজ শুরুর তিন বছরের মাথায় ২০২৪ সালের মে থেকে দ্বিতীয় দফায় অনেকটা নাটকীয়ভাবে নির্মাণ কাজ বন্ধ কওে দেয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। এখন কবে নাগাদ সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হবে, এ নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সঠিক কোন তথ্য জানা যায়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী এস এম নাজমুল বলেন, পোস্ট কংক্রিট গার্ডার (পিসি) বাঁকের কারণে সমস্যা। বক্স গার্ডার করলে বাঁকগুলো নির্মাণ করা সম্ভব। কিন্তু নকশায় বক্সে গার্ডার ধরা নেই। এ কারণেই আমরা নকশার পরিবর্তন চেয়েছি। অপরদিকে স্টিল এক্স্রট্্রাকচার গাডার দ্বারা কাজ করলে অল্প সময়ের মধ্যে ব্রিজের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। দ্বিতীয় দফায় ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বৃদ্ধির আবেদন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত কাজ হয়েছে পাইল ক্যাপ ৩০ টির মধ্যে শেষ হয়েছে ১৩ টি,পিয়ার ক্যাপ ৫৮ টির মধ্যে ২০ টি,পিয়ার ক্যাপ ২৮টির মধ্যে ৬ টি, সার্ভিস পাইল ৩০৪ টির মধ্যে ১৬৪ টি। রেলিগেট অংশে নদীর তীরে ১৩ নং পিলারের পিয়ার ক্যাপ পর্যন্ত ও ১৪ নং পিলারের কলাম পর্যন্ত এবং ১ নং পিলারের পাইল সম্পূর্ন হয়েছে। ২৮ টি পিলারের মধ্যে কাজ শেষ হয়েছে ২০টি’র। সাড়ে ৩ বছরে কাজের অগ্রগতি ১৫ শতাংশ। দীর্ঘ ৭ মাস কাজ বন্ধ থাকার পর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিঃ (করিম গ্রুপ) ২৬ ডিসেম্বর থেকে মাত্র ৮ জন শ্রমিক নিয়ে সেতুর দিঘলিয়া প্রান্তে ১৮ নং পিলারের পাইল ক্যাপের নির্মাণ কাজ শুরুর করে। চলতি ১৩ জানুয়ারী ১৮ নং পিলারের পাইল ক্যাপ ঢালাইয়ের কাজ হয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপক সুত্রে জানা যায়,চলতি ৯ জানুয়ারী এ সপ্তাহে ভৈরব সেতুর শহরাংশের কাজ শুরু করবে। কিন্তু ১০ দিন অতিবাহিত হলেও শহরাংশে ঠিকাদার কোন কাজ করছে না। ১৯ জানুয়ারী -২৫ সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ২০ নং পিলারের পিয়ার ক্যাপ ও ১৭ নং পিলারের পাইল ক্যাপ ঢালাইয়ে ৮ জন শ্রমিক কাজ করছে। ভৈরব সেতুর নির্মাণ কাজ নিয়ে শুরু থেকেই চলছে নানা তালবাহানা। ডিজাইনে জটিলতা রেখেই অনেকটা তড়িঘড়ি করেই নির্মাণ কাজ শুরু হয়। কাজ শুরু হওয়ার ৩ বছর পর এসে ডিজাইন পরিবর্তন। এখন স্টিল সেতুর পরিবর্তে হবে কংক্রিট স্ট্রাকচারের সেতু। এক লেনের পরিবর্তে হবে দুই লেন। নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার সাড়ে তিন বছর পরও সেতুর শহরাংশে রেলীগেট থেকে দৌলতপুর মুহসিন মোড় পর্যন্ত রেলের জমি অধিগ্রহণের এখনও কোন সূরাহা হয়নি। এদিকে নির্মাণ সামগ্রির মূল্য দফায় দফায় বৃদ্ধির কারণে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির বিবেচনায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজেও অনেকটা গাফিলতি দেখা দিয়েছে। সবমিলিয়ে ভৈরব সেতুর নির্মাণ কাজ কবে নাগাদ শেষ হবে নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের(সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ তানিমুল হক বলেন, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নকশা পরিবর্তন করে কাজ করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমরা তাকে বলেছি বর্তমান নকশায় যেভাবে কাজ আছে সেইভাবে আমাদের কাজ সম্পূর্ণ করতে হবে। সড়ক ও জনপথ বিভাগ নকশা পরিবর্তনের পক্ষে না। আমরা চাই দ্রত সময়ের মধ্যে সেতু নির্মাণ কাজ শেষ করে জনসাধারনের জন্য উন্মুক্ত করতে। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর ভৈরব সেতু নামে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়। এরপর ২০২০ সালের ২৭ জুলাই সওজের খুলনা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ভৈরব নদীর উপর সেতু নির্মাণ কাজের দরপত্র আহ্বান করেন। প্রক্রিয়া শেষে ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিঃ (করিম গ্রুপ) নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সেতুর নির্মাণকাজ দেওয়ার বিষয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ১৩ দিন পর ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই উক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কার্যাদেশ পাওয়ার ৬ মাস পর ২০২১ সালের ২৪ মে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সেতুর কি দিঘলিয়া প্রান্তে সরকারি খাস জমির উপর ২৪ নং পিলারের টেস্ট পাইলিংয়ের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করে ভৈরব সেতুর নির্মাণ কর্মযজ্ঞ। বর্তমান নকশা অনুযায়ী ভৈরব সেতুর পিলার বসবে মোট ৩০টি। এর মাধ্যমে সেতুর শহরাংশে কুলিবাগান হতে রেলিগেট ভৈরব নদীর তীর পর্যন্ত ১ থেকে ১৪ নং পিলার এবং সেতুর দিঘলিয়া প্রান্তে ১৭ থেকে ২৮ নং পিলার বসবে। সেতুর রেলিগেট প্রান্তে নদীর পাড় থেকে ৪২ মিটার ভেতরে ১৫ নং এবং সেতুর দিঘলিয়া প্রান্তে নদী পার হতে ১৮ মিটার ভেতরে ১৬ নং পিলার বসবে। ভৈরব সেতুর মোট দৈর্ঘ্য হবে ১ দশমিক ৩১৬ কিলোমিটার। সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এরমধ্যে মূল সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০৩ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button