জাতীয় সংবাদ

কলেজ শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ : অতিষ্ঠ জনগণ, বিরক্ত পুলিশ

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ ভরদুপুরে ব্যস্ত নগরে নানামুখী কাজে মানুষ যখন বাইরে সময় পার করছেন, তখন হঠাৎ কলেজ ইউনিফর্ম পরা কিছু কিশোর গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দুপাশে জড়ো হয়ে পাল্টাপাল্টি ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করছেন। আবার একপক্ষ আরেক পক্ষকে দিচ্ছে ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়া। কিছু সময় পর পর ‘ধর ধর ধর’ স্লোগানেও তারা একে অন্যকে পরাস্ত করতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ দেখলে মনে হতে পারে এ যেন কোনো সিনেমার অ্যাকশন দৃশ্য। তবে এটিই বেশ স্বাভাবিক এবং অতিপরিচিত দৃশ্য রাজধানীর সায়েন্সল্যাব, নিউমার্কেট এবং ধানমন্ডি এলাকার সাধারণ মানুষ, দোকানি এবং ব্যবসায়ীদের কাছে। আর বিষয়টি নিয়ে বেশ বিরক্ত স্থানীয় থানা পুলিশ থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। স্থানীয়রা বলছেন, ব্যস্ত দুপুরে হঠাৎ শুরু হওয়া হইচই, রাস্তাজুড়ে দৌড়াদৌড়ি, ইট ছোঁড়া কিংবা কাঁদানে গ্যাসে কাশতে থাকা সাধারণ মানুষÍ সবই এখন পরিচিত দৃশ্য। তাই পুলিশ থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এসব ঘটনা যেন একটা ‘সিজনাল ফেস্টিভ্যালে’ পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে মাঝেমধ্যে আবার যুক্ত হন ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরাও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘর্ষ, মারামারি এতটাই বেড়েছে যে, শিক্ষার্থীদের দৌড়াদৌড়ি দেখলেই এলাকাবাসী থেকে শুরু করে দোকানদার, পথচারীÍসবাই যেন আগেই বুঝে ফেলেন, এবার কোন দল মারামারিতে নামবে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, বছরের পর বছর ধরে চলা এই সংঘর্ষের কারণ বা নেপথ্যের ঘটনা প্রায়শই অজানা কিংবা আড়ালেই থেকে যায়। ফলে, কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারামারি কিংবা সংঘর্ষ শুরু হয়েছে সেটি না জেনেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। ফলশ্রুতিতে তাৎক্ষণিকভাবে এটি লাঘব হলেও পরবর্তী সময়ে আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। যা নিয়ে সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলমের ‘সংঘর্ষের কারণ তারা (ছাত্ররা) আর আল্লাহ্ ছাড়া কেউ জানে না’ মন্তব্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছে। খোদ পুলিশের হিসাব বলছে, গত বছরের অক্টোবর মাস থেকে এ বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ৬ মাসে নিউমার্কেট, ধানমন্ডি ও কলাবাগান থানার আওতাধীন ঢাকা কলেজ, ঢাকা সিটি কলেজ এবং ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ১২০টি মারামারি-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা ৪৮টি, সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা ৪২টি এবং আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা ৩০টি সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। অবশ্য, গত কয়েক বছর ধরেই এই তিন কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা ছুতোয় সংঘর্ষ লেগেই আছে। অধিকাংশ সময় ফেসবুক স্ট্যাটাস, ফুটপাতে হাঁটা, চোরাগোপ্তা হামলা, কলেজ বাস ভাঙচুর, স্লেজিং এবং বুলিংকে কেন্দ্র করে সূত্রপাত হয় মারামারির। যা জিইয়ে রেখে কয়েক দিন দফায়-দফায় ঘটে সংঘর্ষ ও মারামারি। বিষয়টি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মুখ খুলতে নারাজ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী জানান, সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করেই এমন সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। আর কিছু শিক্ষার্থীর জন্য সবাইকেই সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। দেখা যায়, কোনো একজন ছাত্রের ব্যক্তিগত বিরোধ, ক্রোধ অথবা ঝামেলা নানানভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কলেজে নিয়ে আসা হয়। একপর্যায়ে এসে কলেজের ঝামেলা হিসেবে সড়ক পর্যন্ত গড়ায়। এর জের ধরে উভয় কলেজের ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, এই সংঘর্ষের কারণে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে দুশ্চিন্তায় পড়তে হচ্ছে। যা তাদের শিক্ষাজীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ভয়ে কলেজে আসা এবং যাওয়ার সময় তটস্থ থাকতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের দুর্বল নজরদারি এবং পুলিশ প্রশাসন কড়াকড়ি না থাকায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, সামান্য কিছু হলেই মারামারি লেগে যায়। আমরা সাধারণ ছাত্ররা তো ভয়ে থাকি যে কখন কী হয়। ক্লাসে যেতেও ভয় লাগে, আবার ক্যাম্পাস থেকে বের হতেও ভয় লাগে। এই মারামারির জন্য আমাদের পড়াশোনার কত ক্ষতি হচ্ছে, সেটা কেউ বোঝে না। সিটি কলেজের আরেক শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এসব আসলে কিছু শিক্ষার্থীর বাড়াবাড়ি। নিজেদের মধ্যে একটু ঝামেলা হলেই সেটাকে কলেজের ঝামেলা বানিয়ে ফেলে। আর এর ভুক্তভোগী হই আমরা সবাই। ঠিকমতো ক্লাস করতে পারি না, রাস্তায় বের হলে টেনশন লাগে। এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, আসলে মারামারির কারণগুলো অনেক সময় আমরা নিজেরাও ঠিকভাবে জানি না। হঠাৎ শুনি মারামারি শুরু হয়ে গেছে। পরে দেখি রাস্তা বন্ধ, চারদিকে শুধু ইট আর চিৎকার। ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজের এক ছাত্রী বলেন, দেখেন যখন মারামারি শুরু হয়, তখন রাস্তায় একটা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। আমরা মেয়েরা তো আরও বেশি আতঙ্কে থাকি। কখন কার গায়ে ইট পড়ে বা ধাক্কা লাগে, সেই ভয়ে থাকি। এর একটা স্থায়ী সমাধান হওয়া দরকার। সম্প্রতি ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজ শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের কারণ ঃ গত ১৫ এপ্রিল এবং ২২ এপ্রিল সংঘর্ষে জড়ান ঢাকা কলেজ এবং সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে ১৫ এপ্রিলের সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ এখনও অজানা। দুই কলেজের শিক্ষার্থীরাই এক পক্ষ অপর পক্ষকে দোষারোপ করে বক্তব্য দিয়েছেন।
ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের দাবি, সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রথমে তাদের সহপাঠীদের মারধর করেছেন। যার প্রতিবাদে সবাই রাস্তায় নেমে এসেছেন। আবার ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা দাবি করছেন, ঢাকা কলেজের ছাত্ররাই আগে তাদের সহপাঠীকে মেরেছেন। সেদিন সায়েন্সল্যাব এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়েছে। পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, ঘটনা শুরুর প্রকৃত কারণ জানতে সময় লাগবে। তারা কী কী কারণে এটা করে, এরা (শিক্ষার্থীরা) এবং আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ বলতে পারবে না। আমরা ঘটনার সূত্রপাতের বিষয়টি পরে তদন্ত করে দেখব। তবে এরা মাঝেমধ্যে এই কাজ (সংঘর্ষ) করে থাকে। সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে স্ব-স্ব কলেজের শিক্ষকদের ভূমিকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজ শিক্ষকদের সহায়তা আমরা পেয়েছি। অনেকেই চেষ্টা করছিলেন তাদের শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে নিতে। তবে শিক্ষক প্রতিনিধিদের সংখ্যা আরও বেশি বড় হলে ভালো হয়। একজন বা কয়েকজন শিক্ষকের পক্ষে এত বড় সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। তবে ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সে বিষয়ে আমরা কাজ করব। ঠিক তার ৭ দিন পরই গত ২২ এপ্রিল (মঙ্গলবার) আবারও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়ান এই দুই কলেজের শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা ধরে চলা এই সংঘর্ষে ছাত্র, পুলিশ, সাংবাদিকসহ ২০ জনের অধিক আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস এবং সাউন্ড গ্রেনেডের আশ্রয়ও নিতে হয়েছে পুলিশকে। এর জেরে পর পর দুই দিন উভয় প্রতিষ্ঠানের ক্লাস বন্ধ রাখা হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button