দেশে চালু হচ্ছে প্রথম রোবোটিক পুনর্বাসন কেন্দ্র

# চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত #
প্রবাহ রিপোর্ট ঃ ৬২টি রোবোটিক থেরাপি ইউনিট নিয়ে প্রস্তুত দেশের প্রথম রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, যেখানে ২২টি ইউনিট পরিচালিত হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে/ ইনফোগ্রাফ রাত পোহালেই বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতে যুক্ত হতে যাচ্ছে এক নতুন যুগের সূচনা। আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) স্থাপিত দেশের প্রথম রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার যা শুধু একটি হাসপাতালের ইউনিট নয়, বরং প্রযুক্তি ও মানবসেবার এক যুগল প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে আহত, শহীদ ও জীবিত যোদ্ধাদের জন্য এটি যেন পুনরায় হাঁটতে শেখার নতুন আশা। জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা-পুনর্বাসন নিশ্চিতই অন্যতম লক্ষ্য হবে এই রোবোটিক রিহ্যাব সেন্টারের, যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ জন রোগীকে উচ্চমানের পুনর্বাসন চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসা-পুনর্বাসনই নয়, অন্যান্য সাধারণ রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে যাচ্ছে এই যুগান্তকারী উদ্যোগ। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, দেশের প্রথম রোবোটিক রিহ্যাব সেন্টারটিতে থাকছে ৬২টি উন্নত রোবোটিক থেরাপি ইউনিট, যার মধ্যে ২২টি চালিত হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে। দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দ্বারা পরিচালিত এই ইউনিট প্রতিদিন প্রায় ৩০০ জন রোগীকে উচ্চমানের পুনর্বাসন চিকিৎসা দিতে পারবে। শুধু প্রযুক্তির প্রয়োগ নয়, এটি হবে একটি মূল্যবোধভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, যেখানে প্রযুক্তি শ্রদ্ধা জানাবে সাহসী প্রাণদের আত্মত্যাগকে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করা তরুণদের একজন জরিফুল ইসলাম। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন গুলিবিদ্ধ এই শিক্ষার্থী জানান, মিছিলের সামনের সারিতে থাকায় আন্দোলনের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। এরপর কোমর থেকে নিচে অবশ হয়ে যায় শরীর। বিছানা আর হুইলচেয়ারের সঙ্গে শুরু হয় নতুন জীবন। কিন্তু এখন তার চোখেমুখে নতুন আশার আলো। কারণ, তাদের চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের লক্ষ্যে দেশের প্রথম রোবোটিক পুনর্বাসন সেন্টার চালু হওয়ার খবর ইতোমধ্যে জেনেছেন তিনি। খুশিতে উৎফুল্ল এই শিক্ষার্থী বলেন, একরকম ধরেই নিয়েছিলাম, আর কখনও হয়ত হাঁটতে পারব না। কপালের দুর্ভাগ্য বলেই মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু যখন শুনেছি দেশেই রোবোটিক থেরাপি সেন্টার চালু হচ্ছে, এমনকি এর মাধ্যমে আবারও হাঁটার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আমি শুনে খুবই অবাক এবং আনন্দিত হয়েছি। আমিসহ সব জুলাই আহতরাই চীন এবং অন্তর্র্বতী সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। জরিফুল বলেন, আমি জানি বিষয়টা হয়ত এতো সহজ হবে না। কিন্তু এখনো আশা আছে আবার পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর, মাটির ওপর নিজের পায়ে হাঁটার। আহত আরেক তরুণ সাদিকুর রহমান, যিনি বুকে রবার বুলেটের আঘাতে মেরুদ-ে মারাত্মক জখম পেয়ে আহত হন। তিনি জানান, দুই মাস আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। শরীর নড়ছিল না। ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছিলাম। কিন্তু এখন যদি এই আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কিছুটা সুস্থ হয়ে আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি, তাহলে বুঝব, সেই দিনের লড়াই সার্থক হয়েছে।
সাদিক জানান, দেশে রোবটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার চালু হচ্ছে শোনার পর থেকে ভিডিওতে ইউরোপ-চীন-জাপানে রোবোটিক রিহ্যাবের ভিডিও দেখে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন।
তিনি বলেন, আহতদের অনেকেই যখন বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে, তখন মনে মনে ভাবতাম বিদেশ তো আর যাওয়া হবে না, দেশেও আর উন্নত চিকিৎসা সম্ভব না। এভাবেই বাকিটা সময় পার করতে হবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, জীবন নতুন করে শুরু হতে পারে। এই জরিফুল-সাদিকদের মতো জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত আরও অনেকেই রোবোটিক রিহ্যাব সেন্টারের খবরে আশায় বুক বাঁধছেন। যন্ত্রনির্ভর এই আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি তাদের শুধু শরীর নয়, মনকেও নতুন করে বাঁচার সুযোগ দিচ্ছে। সুস্থতা এখন আর শুধু ওষুধ কিংবা হুইলচেয়ারে সীমাবদ্ধ নয়Í এটা হয়ে উঠছে প্রযুক্তিনির্ভর প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারটি মোট ৬২টি রোবোটিক ইউনিট দ্বারা সজ্জিত, যার মধ্যে ২২টি সরাসরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা চালিত। প্রতিটি যন্ত্র নির্দিষ্ট শারীরিক পুনর্বাসন চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ডিজাইন করা হয়েছে। এর আওতায় থাকবে রোবোটিক গেইট ট্রেইনিং সিস্টেম, এক্সোস্কেলিটন থেরাপি, রোবোটিক আর্ম রিহ্যাবিলিটেশন ডিভাইস, এআই-বেইজড নিউরোফিডব্যাক সিস্টেম এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) থেরাপি সিস্টেমসহ আরও অসংখ্য রোবোটিক যন্ত্রপাতি। রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে দায়িত্ব পাওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে রোবোটিক আর্ম এক্সোস্কেলেটন, যা ব্যবহৃত হবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের হাঁটার ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে। রোগীর শরীরের বাইরের অংশে লাগানো হয় এই যন্ত্রটি, যা পায়ের চলাচলকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। এছাড়াও আহতদের চিকিৎসায় মাল্টি-অ্যাংগেল মুভমেন্ট ট্রেইনার ব্যবহার করা হবে স্ট্রোক বা নার্ভ ইনজুরিতে আক্রান্তদের জন্য। এটি রোগীর হাত বা পা নড়াচড়ায় সহায়তা করে এবং থেরাপির মাধ্যমে নার্ভ সিস্টেমের পুনরুজ্জীবন ঘটায়। তিনি বলেন, সেন্টারটিতে থাকছে ইন্টেলিজেন্ট ব্যালান্স সিমুলেটর নামের একটি যন্ত্র, যাদের মেরুদ- বা ব্রেইন ইনজুরির ফলে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে সমস্যা হয়, এটি তাদের সাহায্য করবে। এই যন্ত্রটি ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ভিত্তিক, যেখানে রোগীরা ভার্চুয়াল ট্র্যাক অনুসরণ করে চলাফেরা শিখতে পারেন। এ ছাড়া, ফিঙ্গার মোবিলাইজার ও পাম-গ্লাভ থেরাপি ইউনিট ব্যবহার করে হাতের প্যারালাইসিস বা গিলিয়েন-ব্যারে সিনড্রোমে আক্রান্তদের হাতের শক্তি পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা হয়। প্রতিদিন ৩০০ রোগীকে সেবা দেবে এই সেন্টার, আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে বিএমইউতে স্থাপিত এই রোবোটিক রিহ্যাব সেন্টার সাধারণ রোগীদের জন্যও খুলে দিচ্ছে নতুন সম্ভাবনা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শাহিনুল আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারটি বিশেষভাবে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় আহত সাহসী ব্যক্তিদের বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য করা হয়েছে। এছাড়াও এই সেন্টারটি নানা ধরনের জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে যেসব রোগীর ফিজিক্যাল বা নিউরোলজিক্যাল ক্ষতি হয়েছে, তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া হবে অনেক গতিশীল ও কার্যকর।
তিনি বলেন, এই সেন্টারে স্ট্রোকের কারণে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের জন্য থাকবে পূর্ণাঙ্গ রোবোটিক থেরাপি প্রোগ্রাম, যার মধ্যে রয়েছে মোটর স্কিল উন্নয়ন, ভারসাম্য বজায় রাখা এবং হাঁটা শেখানো। মেরুদ-ের ইনজুরির ফলে যারা প্যারালাইসিসের শিকার হয়েছেন, তারা পাবেন বিশেষভাবে কাস্টমাইজড রোবোটিক সাপোর্ট। দুর্ঘটনায় আহত পঙ্গু ব্যক্তি বা নার্ভ ইনজুরিতে যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না, তাদের জন্য থাকবে দীর্ঘমেয়াদি ফিজিক্যাল থেরাপির আয়োজন।
ডা. শাহিনুল আলম বলেন, সেরিব্রাল পালসি, গিলিয়েন-ব্যারে সিনড্রোম, ফ্রোজেন শোল্ডার, দীর্ঘমেয়াদি ব্যথা, অথবা শরীরের অস্বাভাবিক শক্ত হয়ে যাওয়া সমস্যার জন্য এই সেন্টারে থাকবে আলাদা সেশন এবং নিরীক্ষিত থেরাপি সিস্টেম। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সেন্টার প্রতিদিন গড়ে ৩০০ জন রোগীকে সেবা দিতে পারবে। পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল থাকায় এটি দেশের বৃহৎ ফিজিওথেরাপি এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হবে। দেশের চিকিৎসা খাতে নতুন যুগের সূচনা, বিএমইউতে দেশের প্রথম রোবোটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের উদ্বোধনের অপেক্ষায় চীনে প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রস্তুত চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট ও নার্সরা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রোবোটিক থেরাপি কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে চীনে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ১৫ জন চিকিৎসক, ১০ জন ফিজিওথেরাপিস্ট এবং ১০ জন নার্স। তাদের তত্ত্বাবধানেই এই থেরাপি সেবা প্রাথমিক পর্যায়ে চালু হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন দুজন চীনা রোবোটিক বিশেষজ্ঞ, যারা স্থানীয় চিকিৎসা কর্মীদের আরও অন্তত ১০ দিন প্রশিক্ষণ দেবেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে শুধু রোবোটিক থেরাপির সেবার মানই উন্নত হবে না, বরং দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় টেকনিক্যাল দক্ষতা ও আত্মনির্ভরতা বাড়বে। চীনের সরকার এ প্রকল্পে কেবল উন্নত যন্ত্রপাতি সরবরাহই করেনি, বরং দক্ষ জনবল গঠনে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে এই উদ্যোগকে টেকসই ও কার্যকর করে তুলেছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, চীনের সরকার কেবল উন্নত যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেই থেমে থাকেনি, বরং আমাদের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটি দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। এর ফলে সেবার মান যেমন বেড়েছে, তেমনি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় টেকনিক্যাল সক্ষমতাও দীর্ঘমেয়াদে বাড়বে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মতে, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি সম্পূর্ণরূপে চালু হলে তা শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও চিকিৎসা, গবেষণা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে একটি রোল মডেল হয়ে উঠতে পারে। উপাচার্য আরও জানান, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম বেতার ভবনে সীমিত পরিসরে চালু রয়েছে। তবে একটি আন্তর্জাতিক মানের ডায়াগনস্টিক ল্যাব এবং রিসার্চ সেন্টার স্থাপনের লক্ষ্যে পূর্বাচলে ২০০ বিঘা জমির জন্য আবেদন প্রক্রিয়াধীন আছে। এটি অনুমোদন পেলে দেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি স্থায়ী ও আধুনিক গবেষণাভিত্তিক অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে।



