স্থানীয় সংবাদ

খুলনায় লুটপাটের রাজ্য গড়েন কেসিসির সাবেক মেয়র খালেক

# তার মদদপুষ্ঠ কর্মচারিরা ছিল বেপরোয়া #

খলিল সুমন ঃ খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক নিয়মিতভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতেন। উন্নয়নকাজ পরিদর্শনে গিয়ে ইট বা বিটুমিন হাতে নিয়ে কাজের মান যাচাই করতেন। অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্টদের বকাঝকা করতেন। তার অনুসারীরা তার এ ধরনের দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য ও তৎপরতার ভিডিও ধারণ করে প্রচার করতেন। তবে বাস্তবে একেবারেই উল্টো চরিত্রের ছিলেন তালুকদার খালেক। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে কামিয়েছেন অঢেল অর্থ। খুলনা মহানগর থেকে শুরু করে তার ছেড়ে দেওয়া সংসদীয় আসনে (খুলনা-৩) স্ত্রীকে এমপি নির্বাচিত করিয়ে মোংলা ও রামপাল উপজেলার সব কিছুই নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। ঠিকাদারি কাজের ভাগবণ্টন, বেআইনিভাবে নিজেই ঠিকাদারি কাজ করা, পছন্দের লোকদের নিয়োগ দেওয়া, কমিশনবাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আইন লঙ্ঘন করে অন্যের লাইসেন্সে নিজেই ঠিকাদারি করতেন তালুকদার আবদুল খালেক। মেসার্স হোসেন ট্রেডার্স, আজাদ ইঞ্জিনিয়ার্স ও মেসার্স তাজুল ইসলাম নামের তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে গত কয়েক বছরে প্রায় ৬০ কোটি টাকার কাজ করেছেন তিনি। ঠিকাদার এইচএম সেলিম (সেলিম হুজুর) এসব কাজ দেখাশোনা করতেন। এর বাইরে ৫ শতাংশ কমিশনের ভিত্তিতে আরও প্রায় শতকোটি টাকার উন্নয়নকাজ বড় ঠিকাদারদের কাছে বিক্রি করেছেন। আবার লাইসেন্স ছাড়াই পছন্দের ব্যক্তিদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন কোটি কোটি টাকার কাজ। নগরভবন নিয়ন্ত্রণের জন্য তার ছিল কয়েকজন কাছের লোক। তাদের মধ্যে ছিলেন সাসপেন্ডকৃত সহকারি কনজারভেন্সী অফিসার নুরুন্নাহার এ্যানী, সাবেক সিনিয়র লঅইসেন্স অফিসার ফারুখ হোসেন তালুকদার, সাবেক এষ্টেট অফিসার নুরুজ্জামান তালুকদার, কর ধার্য শাখার সাবেক কর্মচারি শামীমুর রহমান, ক্যাশিয়ার রনি, সাবেক লাইসেন্স অফিসার রবিউল ইসলাম রবি, সাবেক সহকারি হিসাব রক্ষক রওশনারা বেগমসহ আরো ৭/৮ জন। রওশনারার চাকুরিতে যোগদানসহ নানা বিষয় রয়েছে বির্তক। কিন্তু খালেকের কাছের লোক হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ টু শব্দটি করতে সাহস পায়নি। যারা তাকে অনেক সময় ভূল তথ্য দিয়ে নিরিহ কর্মচারিকে হয়রানী করতো। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের খরচের কথা বলে চার বছর দুই মাস পর্যন্ত প্রতিটি কাজের বিলের ১ শতাংশ করে কেটে নেওয়া হয়েছে ঠিকাদারদের কাছ থেকে। আইন মোতাবেক কোনো ব্যক্তি মেয়র বা কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হওয়ার অথবা মেয়র বা কাউন্সিলর পদে থাকার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি বা তার পরিবারের কোনো সদস্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের কাজ সম্পাদন বা মালপত্র সরবরাহের জন্য ঠিকাদার হন। অথচ ঠিকই ঠিকাদারির চালিয়ে গেছেন তালুকদার খালেক। মূলত ঠিকাদারিই তার মূল পেশা। ২০০৮ সালে কেসিসির মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১২ সালে প্রথমবার বয়রা কলেজের সামনে সড়ক উন্নয়নের কাজ করেন তিনি। সেই কাজ দেখাশোনা করতেন ভাই জলিল তালুকদার। ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন খালেক। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, হোসেন ট্রেডার্সের নামে তালুকদার আবদুল খালেক ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বিআইডিসি সড়কের একাংশ, ৩ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে রূপসা বেড়িবাঁধ সড়ক উন্নয়ন, ৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে কেডি ঘোষ রোড, ৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে পুরাতন যশোর রোড, ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে সিমেট্রি রোড, ৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে নিরালা এলাকার পাঁচটি সড়ক উন্নয়নসহ ১৭টি সড়কের ঠিকাদারি করেছেন। এ ছাড়া আজাদ ইঞ্জিনিয়ার্সের নামে ২ কোটি ৫১ লাখ টাকায় মুন্সিপাড়া তৃতীয় গলি, ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে গগন বাবু রোড উন্নয়ন, তাজুল ইসলামের নামে খালিশপুর পিপলস মোড় থেকে গাছতলা মোড় পর্যন্তসহ আরও চারটি কাজ করেছেন। উন্নয়নকাজ ইচ্ছামতো বাটোয়ারা দরপত্রে অংশ নিতে ঠিকাদারি লাইসেন্স প্রয়োজন হয়। কিন্তু লাইসেন্স ছাড়াই অন্য নামে আওয়ামী লীগ নেতাদের ঠিকাদারি কাজ দিতেন তালুকদার আবদুল খালেক। সোনাডাঙ্গা থানা আ’লীগের সাঃ সম্পাদক তসলিম উদ্দীন আশার আশা সিন্ডিকেট নামে একটি চক্র ছিল কেসিসিতে ওপেন সিক্রেট। তসলিম উদ্দীন আশা সোনাডাঙ্গা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। সিন্ডিকেট করে কাজ ভাগিয়ে নেওয়াই ছিল তার কাজ। প্রকল্প এলাকায় তিনি ইচ্ছামতো কাজ করতেন। কোনো অফিসার তার কাজে তদারকি করতে পারতেন না। একইভাবে কাজ করতেন আরেক সহযোগী তাজুল ইসলাম। এই তাজুল কেসিসির পূর্ত বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের শারীরিক ও মানুষিকভাবে নির্যাতন করতেন। মেয়র তালুকদার খালেক সব জেনেও নিরব থাকতেন। মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমডিএ বাবুল রানাকে নিরালার আটটি সড়কের ৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকার ও ৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে টিবি ক্রস রোড এবং বানরগাতী সড়কের কাজ দেওয়া হয়েছে। মেসার্স তাজুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ করেছেন তিনি। বাবুল রানা বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে ৫ কোটি ১ লাখ টাকা ব্যয়ে খালিশপুর ১৮ নম্বর রোড উন্নয়নের কাজ দেওয়া হয়েছে খালিশপুর থানার ৯টি ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে। শাহীদ এন্টারপ্রাইজের নামে দেওয়া কাজটি ২৫ লাখ টাকায় কিনে নেন তাজুল ইসলাম। ওই টাকা ৯ ওয়ার্ডের নেতারা ভাগ করে নেন। এ বিষয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, ওই সময় কিছু করার ছিল না। টাকা দিয়ে কিনেই কাজ করতে হয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর, আওয়ামী লীগ নেতা ও ১৪ দলের কয়েকজন নেতাকে কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। মেয়রের ঠিকাদারি কাজ দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা সেলিম হুজুর বলেন, আমার লাইসেন্স দিয়ে বিভিন্নজন কাজ করেছেন। সব কাজ মেয়র সাহেবের বলে চালানো হচ্ছে, এটি ঠিক না। সংশ্লিষ্টরা জানান, তালুকদার আবদুল খালেক তার যাবতীয় অপকর্ম করাতেন তার এপিএস গোপালকে দিয়ে। এ সুবাদে সিটি করপোরেশনের দ্বিতীয় মেয়র বনে যান গোপাল। পুরো সিটি করপোরেশনের ৪১ জন কাউন্সিলরের মধ্যে অধিকাংশ কাউন্সিলরকেই তাকে ‘ট্যাক্স’ দিয়ে বরাদ্দ পেত হতো। এর পাশাপাশি কেসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিম্মি করে চাঁদাবাজিও করতেন। এর ফলে গোপালও দুই হাতে কমিয়েছেন অবৈধ সম্পদ। নিজের আর কোনো চাকরি না থাকলেও গোপাল নগরীর সার্কিট হাউস মাঠ এলাকায় গড়ে তুলেছেন বিলাসবহল অট্টালিকা। অন্যদিকে খুলনা কেসিসির নগরভবন থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতেন রামপাল ও মোংলা বাগেরহাট-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার আবদুল খালেক। কেসিসি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে এ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। তিনি আসনটি ছেড়ে দেওয়ার পর এখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তার স্ত্রী হাবিবুন নাহার। কিন্তু খালেকই রামপাল ও মোংলা উপজেলার সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। নগরভবনে বসেই দুই উপজেলার সব ঠিকাদারির কাজ বণ্টন, টিআর বরাদ্দ ও উন্নয়নকাজ বণ্টনের নির্দেশ দিতেন। এসব অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ কামিয়েছেন তালুকদার আবদুল খালেক। ২০০৮ সালের তথ্যানুযায়ী, তালুকদার আবদুল খালেকের বার্ষিক আয় ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের হলফনামায় দেখা গেছে, তার বার্ষিক আয় ২৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা। ২০০৮ সালে তার কাছে নগদ ছিল ৫৭ হাজার ৫৫০ টাকা। ২০২৩ সালে তার কাছে নগদ টাকা ছিল ৪ কোটি ৭৯ লাখ। এর বাইরে বর্তমানে তার ৩ দশমিক ২১ একর কৃষিজমি, ৩ কাঠা অকৃষিজমি, রাজউকের পূর্বাচলে একটি, কেডিএর ময়ূরী আবাসিকে একটি ও গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মুজগুন্নি আবাসিক এলাকায় প্লট রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য খুলনার সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেকের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে কোথায় রয়েছেন, তা কেউ-ই বলতে পারছেন না। একটি সূত্র জানায়, তিনি ভারতে রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button