খুলনার বিল ডাকাতিয়ায় স্থায়ী জলাবদ্ধতায় লাখো মানুষের দুর্ভোগ

# বেকার মানুষের জীবন চলছে অনাহারে অর্ধাহারে #
স্টাফ রিপোর্টার ঃ আকাশে জমে থাকা কালো মেঘ দেখলেই বুক কেঁপে ওঠে খুলনার বিল ডাকাতিয়ার আশপাশের অধিবাসীর। বৃষ্টির মৌসুম মানেই অভিশাপ তাদের জীবনে। তবে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তাদের জন্য আরো কস্টের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।
এ সময় বন্ধ হয়ে যায় কাজকর্ম, থেমে যায় উপার্জন। লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। জলাবদ্ধতা শুধু ওই অঞ্চলে অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, রূপ নিয়েছে এক মানবিক বিপর্যয়ের। বৃষ্টির মৌসুম শেষ হলেও দুর্ভোগ শেষ হয়নি এখানকার লাখো মানুষের। ক্যালেন্ডারে ভাদ্রমাস চললেও বিল ডাকাতিয়ায় এখনও চারিদিকে থৈ থৈ পানি, মাঠের পর মাঠ জলমগ্ন। ফসলী জমি এখন পানির নিচে। হাজার হাজার চিংড়ি মাছের ঘের ও শত শত হেক্টর জমির ধান ক্ষেত ডুবে আছে বৃষ্টির পানিতে। অথচ, পানি বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। দিনকে দিন দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে, বেড়েছে কৃষকের আহাজারি। আড়ংঘাটা থানার তেলিগাতী দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা কৃষক বাকী উল্লাহ ঢালী বলেন, বিল ডাকাতিয়া দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিল। একসময় এই বিল কৃষি ও মৎস্যজীবী মানুষের জন্য আশীর্বাদ ছিল। আজ সেই বিল খুলনা ও যশোর এলাকার মানুষের কাছে অভিশাপে পরিণত হয়েছে। এ অঞ্চলের একমাত্র শোলমারী নদী ছাড়া বাকি সব কটিই সম্পূর্ণরূপে ভরাট হয়ে গেছে। বিল ডাকাতিয়ার পানি বের হওয়ার একমাত্র চ্যানেল শোলমারী নদীটি পলি পড়ে আংশিক ভরাট হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে এসব অঞ্চলে। ডুমুরিয়া উপজেলার খর্নিয়া ইউনিয়নের ডোমরার বিল, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখন পানির নিচে। পানির কারণে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোতেও থাকতে পারছে না মানুষ। অনেক এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ক্লাস নিতে পারছেন না শিক্ষকরা। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, বিলের খননকৃত খালগুলো দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও অপরিচর্য থাকায় খাদগুলোর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ওই এলাকার অন্তত ত্রিশটি গ্রামের ফসলি মাঠে সৃষ্টি হয়েছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা। বিএনপি নেতা ও খুলনা ৫নং আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী আলহাজ্ব আলী আজগর লবী বলেন, বিল ডাকাতিয়ার পানি নিস্কাশনের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসকের সাথে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। শিগগিরই এ বিলের পানির সমস্যৗা সমাধান হবে বলে তিনি সাংবাদিকদের জানান। বিলপাটিয়ালা গ্রামের বাসিন্দা দীপঙ্কর মন্ডল বলেন, চারিদিকে প্রচুর পানি। ঘর থেকে নামলেই পানি। আষাঢ় মাস থেকে আমরা পানি বন্ধ। গতবার যে গতিতে পানি নেমেছে সেই গতিতে নামলেও আরও ২ মাস সময় লাগবে। খালগুলোতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষের কারণে জলাবদ্ধতা হচ্ছে। ডুমুরিয়া প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান জানান, দীর্ঘ জলাবদ্ধতার কারণে ৫ থেকে ৬টি বিদ্যালয়ের আশপাশ ও সড়ক পানিতে ডুবে আছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কমে গেছে। তেলিগাতী গ্রামের বাসিন্দা বিবেক মন্ডল বলেন, তাদের কৃষি জমি ও ঘের দীর্ঘ দিন যাবৎ পানির নীচে তলিয়ে রয়েছে। স্থায়ী এ জলাবদ্ধতা এলাকার মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। কর্মহীন এসব মানুষগুলো অর্ধাহারে-অনাহারে জীবন যাপন করছে। সরকার বারবার পানি নিস্কাশনের ওয়াদা দিলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। অবিলম্বে পানি নিস্কাশন করে এ অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইনসাদ ইবনে আমিন বলেন, দু’ দফায় অতিবর্ষণে ডুমুরিয়ার ১০০ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে থাকায় কাঁচা ফসল মরিচ, আদা, হলুদ, পেঁপে, শিম, তরমুজ, লাউ, টমেটো, উচ্ছে, ঝিঙে প্রভৃতির গাছ মরে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জল কুমার সেন বলেন, তারা শোলমারি নদীর ১০টি গেট ভাটার সময় খুলে রাখছে। যাতে বিলের পানি সহজে বের হয়ে যায়। আর জোয়ারের সময় ৩৫ কিউসেক পাম্প দিয়ে পানি সেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নদী থেকে মাটি সরবরাহের জন্য তিনটি ভাসমান স্কেভেটর ও ২টি লংভুম স্কেভেটর দিয়ে মাটি খননের কাজ চলছে। ভবিষ্যতের জন্য শোলমারি নদী খনন ও ৫টি পাম্প ক্রয়ের জন্য ৪৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প সাবমিট করা হয়েছে। দীর্ঘ ৪০ বছরের এ সমস্যা স্থায়ী সমাধানের জন্য পরামর্শ প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হবে।



