রূপসায় বেপরোয়া ‘হারেজ মাঝি’

ছিলেন জনযুদ্ধের ক্যাশিয়ার, আটক হন অপারেশন ক্লিনহাটে
আত্মীয়-স্বজনদের দিয়ে করছেন ঘাটের নিয়ন্ত্রণ
মাদকসেবী-কিশোর গ্যাংয়ের হাতে নৌকার ‘সুকানি-হাইল’
স্টাফ রিপোর্টার : রূপসায় মাঝি সংঘের বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক হারেজ হাওলাদারের নেতৃত্বে রূপসা ঘাটে অনিয়মের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ সাধারণ মাঝি ও স্থানীয়দের। তার বিরুদ্ধে অবৈধভাবে মাঝি সংঘের কমিটি দখল ও অর্থ আত্মসাতসহ ইতিপূর্বে চরমপন্থি সংগঠন-জনযুদ্ধের ক্যাশিয়ার থাকায় অপারেশন-ক্লিনহাটে যৌথ বাহিনীর হাতে গ্রেফতারও হন।
সাধারণ মাঝিদের দেওয়া তথ্যমতে, হারেজ হাওলাদারের আত্মীয়-স্বজনের ট্রলার গুলিতে প্রতি ট্রিপে ৩৫ থেকে ৪০ জন করে যাত্রী পারাপার করে। এছাড়া ঘাটে যাত্রী পারাপারে হারেজ রীতিমত অনিয়মের স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছে। মাঝি সংঘের সভাপতি হালিম চৌকিদার পারিবারিক কাজে মাদারিপুর থাকার সুযোগে সাধারণ সম্পাদক হারেজ খামখেয়ালিপনা বেশি করছে বলে অভিযোগ মাঝিদের। ৯ নভেম্বর রাতে যে ট্রলার দুর্ঘটনায় একজন যাত্রীর মৃত্যু হয়- সেই ট্রলারের মাঝিও ছিলো হারেজের আত্মীয় শফিক বেপারী। সে একজন মাদকসেবী বলে জানান ঘাটের মাঝিরা।
এদিকে, ট্রলার থেকে নদীতে পড়ে যাত্রী’র মৃত্যুর পরও থেমে নেই অনিয়ম। প্রায় ট্রলারে শিশু শ্রমিক ব্যবহার করা হচ্ছে। রাত ৯টার পর থেকে বেশিরভাগ ট্রলারের নিয়ন্ত্রণ থাকে মাদকসেবী ও কিশোর গ্যাংয়ের হাতে। কোন ট্রলারই ব্যবহার করেনা আলো (বাতি)। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন একাধিকবার রাতে ট্রলারে আলোর বিষয়ে তাগিদ দিলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। নদী পারাপারে নিয়মিত যাত্রীদের প্রশ্ন, এসব অনিয়ম দেখার কেউ নেই। যদিও এসকল অনিয়মের বিষয়ে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ এক অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছে।
মাঝি সংঘের সাধারণ সম্পাদক গেলো নির্বাচনে ভোটের ফলাফলে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীর সাথে ড্র হয়। পরবর্তীতে ওই পদে পুনরায় নির্বাচন বা কোন লটারি পদ্ধতি না করে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের তৎকালিন এমপি সালাম মূর্শেদীর নির্দেশে সাধারণ সম্পাদকের চেয়ার দখল করে হারেজ।
এদিকে, তৎকালীন পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি এম এল জনযুদ্ধের দক্ষিণাঞ্চলের গডফাদার আব্দুর রশিদ ও সোহেব-সুমনের সহযোগী ও ক্যাশিয়ার ছিলেন মাঝি হারেজ হাওলাদার। ওই সময় জনযুদ্ধের অবৈধ ক্ষমতার দাপটে সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতেন মাঝি ইউনিয়নের সম্পাদক হারেজ এমন অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ এক ভয়ংকর গুটিবাজ বহুরূপী হারেজের অত্যাচারে সাধারণ মাঝিরা ও যাত্রীরা অতিষ্ঠ। এর হাত থেকে প্রতিকারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
মাঝি হারেজ হাওলাদার ২০০২-৩ সালে ক্লিনহাট যৌথ বাহিনীর অভিযানে রাতে আটক হয়। ওইদিন রাতেই হারেজের নিকট থেকে চানমারি নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করে যৌথ বাহিনী। ২০২২ সালে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিপইয়ার্ড এলাকায় ডাকাতি হয়। সেই মামলায়ও হাজেরকে পুলিশ আসামি করে। তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে নড়াইলে ডাকাতি করতে গিয়ে হারেজ হাওলাদার গ্রাম বাসির হাতে প্রথমে আটক হয়। পরে ওইদিন জনগণ গণধোলাই দিয়ে পুলিশের হাতে হারেজকে হস্তান্তর করে। সে ওই ডাকাতি মামলায়ও কারাভোগ করে। এখনও পর্যন্ত ছোট-খাটো বিষয় নিয়ে উশৃংখল ছেলেদের দিয়ে সাধারণ মাঝিদেরও অপমান অপদস্ত করে এবং তাদেরকে মারপিট করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও টাউট প্রকৃতির হারেজ এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকা-ের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়দের বিস্তার অভিযোগ।
মাঝিরা আরও বলেন, তৎকালীল পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি জনযুদ্ধের ক্যাশিয়ার ছিলেন। সে একসময় অনেক অপরাধমূলক কর্মকা-ের সাথে লিপ্ত ছিলো। এখনও হারেজের অত্যাচারে সাধারণ মাঝি ও স্থানীয়রা অতিষ্ঠ হয়ে পরেছে। অনেক সময় তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ছোট-খাটো উঠতি বয়সী ছেলেদের দিয়ে সাধারণ মাঝিদের গায়ে হাত তুলতে পর্যন্ত দিধা বোধ করে না।
প্রসঙ্গত, গত ৯ নভেম্বর রাতে রূপসা ঘাট পারাপারের সময় পূর্ব রূপসা প্রান্তে ট্রলার ভেড়ানোর সময় চালকের খামখেয়ালীপনায় নদীতে পড়ে নিখোঁজ হয় মহিদুল হক মিঠুন। ওই রাতেই ট্রলারটি জব্দ করে রূপসা নৌ-পুলিশ। ঘটনার পর পরই নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস তল্লাশি অভিযান শুরু করে। পরদিন ১০ নভেম্বরও সকাল থেকে শুরু হয় ফের তল্লাশি অভিযান। পরে প্রায় ৭০ ঘন্টা পর মিঠুনের মরদেহ ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ।
এদিকে অভিযানিক দলকে ট্রলার দেওয়াসহ বিভিন্ন খরচ দেখিয়ে মাঝি সংঘের সাধারণ সম্পাদক হারেজ হাওলাদার ওই দিন শতাধিক ট্রলারে ট্রিপ দিয়ে অর্থ আত্মসাত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এলাকার স্থানীয় লোকজন ও যাত্রীরা মাঝি হারেজ এর বিরুদ্ধে এ-সব ঘটনার বিষয়টি প্রতিকারের দাবি জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে ট্রলার যাত্রী মামুন শেখ বলেন, প্রায় আমি এ ঘাট দিয়ে নদী পারাপার হই। কিন্তু ঘাটে এসে দেখি ট্রলারে অতিরিক্ত যাত্রী, যাত্রীদের দুর্ব্যবহার সহ নেশাখোর দিয়ে ট্রলারের হাল ধরানো হয়। যার কারনে প্রতিনিয়ত দূর্ঘটনা ঘটে। তিনি আরও বলেন, ঘাট পারাপারের মুহুর্তে মাঝি ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হারেজ হাওলাদার এর বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের কথা শোনা যায়। আমি এসব ঘটনার প্রতিকার চাই।
ট্রলারের যাত্রী মো. জালাল শেখ বলেন, প্রতিনিয়ত এই রূপসা ঘাটে ছোট-বড় দূর্ঘটনা অহরহ ঘটছে। কিছু নেশাখোর মাঝি দিয়ে ট্রলার চালানো হয়। যার কারনে ঘটে বড় ধরনের দূর্ঘটনা। আমরা প্রতিনিয়ত এ ঘাট দিয়ে ট্রলারে পারাপার হই তখন মাঝিদের সেক্রেটারি ঘাটে বসে নিয়ন্ত্রণ করার নামে আরও অনিয়ম করে।
আরেক নারী যাত্রী খাদিজা বেগম বলেন, এ ঘাট দিয়ে আমাদের পারাপারের সময় আর কত ভোগান্তি পোহাতে হবে। ঘাটের মাঝিরা খুব উদাসীন। যেকারণে পারাপারের মুহুর্তে মানুষের প্রাণহানির শিকার হতে হছে। বিষয়টি প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিৎ বলে তিনি মনে করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঘাটের একাধিক মাঝি বলেন, আগে এই ঘাটে কোনদিন এত অনিয়ন্ত্রিত ছিলো না। আমাদের ইউনিয়নের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হারেজ হাওলাদার একজন অর্থলোভী মানুষ। সে ইচ্ছাখুশী মতো অল্প বয়সী ও নেশাখোর মাঝিদের দিয়ে ট্রলার চালাই। আর এতে দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রলারে অতিরিক্ত যাত্রী উঠানো নিয়ম না থাকলেও অর্থের লোভে নিজের আখের গোছানোর জন্য খামখেয়ালি ভাবে অতিরিক্ত যাত্রী পারাপার করে। আমরা এই খামখেয়ালি ও অনিয়মের প্রতিকার চাই।
মাঝি সংঘের সাধারণ সম্পাদক মো. হারেজ হাওলাদার বলেন, ঘাটে কয়েকদিন আগে পারাপারের সময় নদীতে পড়ে একজন নিখোঁজ হয়। নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজতে ট্রলার দেওয়া হয়। এখানেও আমার বদনাম হয়েছে।
ঘাটের কিছু মাঝি নেশা করে ট্রলার চালায় বলে স্বীকার করে তিনি বলেন, ২-৩ মাস আগে দলীয় লোকজন ৭ জন লোক মাঝি হিসেবে ঘাটে দিয়েছে। নেতারা আবার আমার কাছে টাকা চায়, আমি দিতে পারিনা- বিধায় আমার পিছনে তারা লেগেছে। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে তার সবকিছু মিথ্যা। আমাদের মাঝি সংঘের লোকজন ও নেতারা আমাকে বাদ দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তৎকালীন নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি জনযুদ্ধ’র সাথে সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা ওই সময় ভয়ে বাঁচিনা তাহলে কিভাবে জনযুদ্ধের ক্যাশিয়ার হবো। যৌথ বাহিনী আমাকে নিয়ে গিয়ে ট্রলারের চোকানীর পাইপ উদ্ধার করে। আমার বিরুদ্ধে যে মিথ্যা মামলা হয়েছিলো সেগুলো সব খালাস।


