‘ক্ষমতায় গেলে যে ২৬ বিষয়ে অগ্রাধিকার দেবে জামায়াত’

নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা
ইশতেহারে ৫ ‘হ্যাঁ’ ৫ ‘না’
প্রবাহ রিপোর্ট : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ক্ষমতায় গেলে আগামী পাঁচ বছরের সরকার পরিচালনায় ২৬ বিষয়কে অগ্রাধিকার দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত ইসলামী। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজধানীর একটি হোটেলে দলের নির্বাচনী ইশতেহারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ’ স্লোগানে নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাধান্য পেয়েছে ২৬টি বিষয়। সেগুলো হলো— জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ, ইনসাফভিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন, যুবকদের ক্ষমতায়ণ, নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন, প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ গঠন, ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ, বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ, অর্থনীতি বিনির্মাণ, সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা,
রাষ্ট্র পরিচালনায় জুলাইয়ের স্বপ্নকে ধারণ করা, কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা, ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূন্য ভিশন’ বাস্তবায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে।
ইশতেহারের আরও প্রাধান্যের মধ্যে রয়েছে, শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি, প্রবাসীদের সব অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু নয় এবং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবার নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা, দ্রব্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, যাতায়াত ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং বিভাগীয় শহরগুলোর দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা, নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপ ও বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা, সার্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করা এবং সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।
জামায়াতের ইশতেহারের ২৬ দফা
১. ‘জাতীয় স্বার্থ আপসহীন বাংলাদেশ’ এই স্লোগানের আলোকে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থে আপসহীন রাষ্ট্র গঠন। ২. বৈষম্যহীন, দায় ও ইনসাফহিত্তিক একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠন। ৩. যুবকদের ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া। ৪. নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন। ৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের মাখাদে মাদক, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্তে একটি নিরাপদ রাষ্ট্র বিনির্মাণ। ৬. সকল পর্যায়ে সব নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন। ৭. প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও স্মার্ট সমাজ গঠন। ৮. প্রযুক্তি, ম্যানুফ্যাকচারিং, কৃষি ও শিল্পসহ নানা সেক্টর ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। সরকারি চাকরিতে বিনামূল্যে আবেদন, মেধার ভিত্তিত নিয়োগ ও সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ। ৯. ব্যাংকসহ সার্বিক আর্থিক খাতে সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগ ও বাবসাবান্ধব টেকসই ও স্বচ্ছ অর্থনীতি বিনির্মাণ। ১০ সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচনসহ সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করে সুসংহত ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা, ১১. বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকা-ের বিচার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করা। ১২. জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। ১৩. কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষকদের সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব সৃষ্টি করা। ১৪. ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ‘তিন শূনা ডিশন’ (পরিবেশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জ্যের শূন্যতা এবং বন্যা-ঝুঁকির শূন্যতা), বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ’ গড়া। ১৫. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিতে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি। ১৬. শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কাজের পরিবেশ; বিশেষ করে নারীদের নিরাপদ কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা। ১৭. প্রবাসীদের ভোটাধিকারসহ সব অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং দেশ গঠনে আনুপাতিক ও বাস্তবসম্মত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ১৮. সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু (মেজরিটি-মাইনরিটি) নয়: বরং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেরে সবার নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পিছিয়ে থাকা নাগরিক ও শ্রেণি-গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা। ১৯. আধুনিক ও সার্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা প্রদান এবং গরিব ও অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যায়ক্রাম বিনামূলো উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। ২০. সমসাময়িক বিশ্বের চাহিদাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করা। ২১. দ্রব্যমূলা ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রেখে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার পূর্ণ সংস্থানের নিশ্চয়তা। ২২. যাতায়াত ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং রাজধানীর সাথে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর সড়ক/রেলপথের দূরত্ব পর্যায়ক্রমে দুই-তিন ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা। ২৩. নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বল্পমূল্যে আবাসন নিশ্চিত করা। ২৪. ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রমকে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধ করা। ২৫. সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে নিরাপদ কর্মজীবন ও পর্যায়ক্রমে সকল নাগরিকদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ২৬. সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
জামায়াতের ইশতেহারে ৫ ‘হ্যাঁ’ ৫ ‘না’ : জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘোষিত জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচন মেনুফেস্টোতে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ৫টি মূলনীতিকে ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব নীতির মধ্যে রয়েছে-সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থান। একই সঙ্গে দলটি স্পষ্টভাবে ‘না’ বলেছে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজির মতো সমস্যার বিরুদ্ধে।
মেনুফেস্টোতে বলা হয়, রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সর্বস্তরে সততা নিশ্চিত করা হবে এবং দুর্নীতিমুক্ত শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দলটির মতে, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, তাই এসবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।
জাতীয় ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে জামায়াতে ইসলামী জানিয়েছে, বিভাজন ও আধিপত্যবাদী রাজনীতির পরিবর্তে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের ভিত্তিতে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে তারা কাজ করবে। ফ্যাসিবাদী শাসন ও কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মেনুফেস্টোতে বলা হয়েছে, আইনের শাসন ও মানবিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে সমাজে বৈষম্য কমানো হবে। বিচার ব্যবস্থা ও প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ তৈরির কথাও এতে উল্লেখ রয়েছে।
দক্ষতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে জামায়াত জানিয়েছে, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করতে কার্যকর নীতি গ্রহণ করা হবে। তরুণ সমাজের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত মেনুফেস্টোতে ‘হ্যাঁ’ বলা হয়েছে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানে; আর স্পষ্টভাবে ‘না’ জানানো হয়েছে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজির মতো রাষ্ট্র ও সমাজবিরোধী অনুশীলনে।



