জাতীয় সংবাদ

ত্রয়োদশ সংসদে কোটিপতি সদস্য সাড়ে ৭৯ শতাংশ : টিআইবি

প্রবাহ রিপোর্ট : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ৭৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ সদস্য কোটিপতি বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির দাবি, অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ২৩৬ জন কোটিপতি এবং এবং ১৩ জন শতকোটিপতি। গতকাল সোমবাররাজধানীর মাইডাস সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফকনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সংসদ নির্বাচনের সার্বিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। বিএনপির ৬২.০২ ও জামায়াতের ১৫.৯৪ শতাংশ এমপি ঋণগ্রস্ত: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের ঘোষিত মোট দায় বা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা, যা বিগত চারটি সংসদের তুলনায় সর্বোচ্চ। এমনটি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তারা আরও জানায়, নতুন সংসদের বিএনপির সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৬২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীর ১৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ দায় ও ঋণগ্রস্ত। প্রতিবেদনে টিআইবি জানায়, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের মোট দায় বা ঋণ ছিল ১ হাজার ১০৭ কোটি টাকা। দশম সংসদে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা, একাদশ সংসদে ৬ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা এবং দ্বাদশ সংসদে ১০ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। সর্বশেষ ত্রয়োদশ সংসদে এই অঙ্ক আরও বেড়ে ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ত্রয়োদশ সংসদের প্রায় অর্ধেক সংসদ সদস্যই দায় বা ঋণগ্রস্ত। দলভিত্তিক হিসেবে বিএনপির সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৬২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে এই হার ১৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। সংসদভিত্তিক তুলনায় দেখা যায়, দায় ও ঋণগ্রস্ত সংসদ সদস্যের হার নবম সংসদে ছিল ৫৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ, দশম সংসদে ৫৬ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ, একাদশ সংসদে ৫১ দশমিক ৩০ শতাংশ, দ্বাদশ সংসদে ৫২ শতাংশ এবং ত্রয়োদশ সংসদে তা কিছুটা কমে ৪৯ দশমিক ৮৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে টিআইবি জানায়, নির্বাচনে ৬৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ নির্বাচিত সদস্যদের বার্ষিক আয় ১০ লাখ টাকার বেশি। কোটি টাকার বেশি আয় করেন ৪৮ জন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় ৯৯ শতাংশ প্রার্থী কোনো না কোনোভাবে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। এর মধ্যে মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্যবিহীন প্রচারণা সামগ্রী ব্যবহার, যানবাহনসহ মিছিল, মশাল মিছিল ও শো-ডাউন, পাঁচজনের বেশি সমর্থক নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার মতো অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিপক্ষ প্রার্থীর পোস্টার, ব্যানার বা ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা কিংবা নষ্ট করার ঘটনাও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। টিআইবির পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, আচরণবিধির মোট ৫৮টি বিষয়ে দলভিত্তিক প্রার্থীদের লঙ্ঘনের হার ছিল উল্লেখযোগ্য। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী- সব পক্ষের মধ্যেই এ ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিটিভির রাতের খবরে বিএনপি ৩৫২ মিনিট, জামায়াত ১২৮: গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিটিভির রাত ৮টার খবরে নির্বাচন সম্পর্কিত সংবাদে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের পেছনে মোট সময় ব্যয় করেছে ৫৯৩ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড। যার মোট প্রাক্কলিত আর্থিক মূল্য ৫ কোটি ৩৪ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ওই সময়ের মধ্যে বিএনপির জন্য ৩৫২ মিনিট ১৫ সেকেন্ড ব্যয় করা হয়। যার আর্থিক মূল্য ৩ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকা। যা মোট ব্যয়ের ৫৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। জামায়াতের জন্য ব্যয় করা হয় ১২৮ মিনিট ১৫ সেকেন্ড। এর আর্থিক মূল্য ১ কোটি ১৫ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ টাকা। যা মোট ব্যয়ের ২১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জন্য ৭০ মিনিট ৩৯ সেকেন্ড ব্যয় করেছে বিটিভি। যার আর্থিক মূল্য ৬৩ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০ টাকা। যা মোট ব্যয়ের ১১ দশমিক ৮৯ শতাংশ। তবে জাতীয় পার্টির (জাপা) পেছেনে এক সেকেন্ড সময়ও ব্যয় করেনি বিটিভি। স্বতন্ত্রের জন্য ১০ সেকেন্ড ও অন্যান্য দলের জন্য ৪২ মিনিট ৩৬ সেকেন্ড দিয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমটি। টিআইবি জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাতে গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিএনপি ১১টি দলীয় পেজে ও ১১টি প্রার্থীর পেজে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। একই সময়ে জামায়াত ১১৫টি পেজে ১ কোটি ৩৫ লাখ ১৮ হাজার ৩৬০ টাকা এবং এনসিপি ১৭টি পেজে ১০ লাখ ৮২ হাজার ৮৭৭ টাকা ব্যয় করেছে। ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গড় বয়স ৫৯ বছর। প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন ২০৯ জন। প্রার্থীদের মধ্যে ৮৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর বা এরচেয়ে উচ্চ ডিগ্রিধারী। নির্বাচিতদের প্রায় ৬০ শতাংশ পেশায় ব্যবসায়ী। আইন পেশায় আছেন ১১ দশমিক ৮ শতাংশ ও শিক্ষকতা থেকে এসেছেন ৮ দশমিক ১ শতাংশ। টিআইবি জানায়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং শিক্ষকরা দলীয় রাজনৈতিক প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। এছাড়া সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক দলের প্রচারণায় অংশগ্রহণ এবং গান ও গজল গেয়েছেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নির্বাচনের পূর্বে নির্দিষ্ট কিছু আসনে বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ করেছে। ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দ, যা পদত্যাগ-পূর্ব উপদেষ্টার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলের প্রতি পক্ষপাতিত্বের বিবেচনায় বিতর্কিত হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত পোলিং অফিসার, প্রিসাইডিং অফিসার ও সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারদের বিবিধ অনিয়ম প্রসঙ্গে বলা হয়, নির্বাচনের আগের দিন কিছু আসনে প্রতিপক্ষের নেতার সঙ্গে গোপন বৈঠক ও আপ্যায়ন গ্রহণ, ব্যালটে সিল মারা, ব্যালট পেপারে আগে থেকে স্বাক্ষরসহ জাল ভোট প্রদানে সহায়তা করার ঘটনা ঘটেছে।
বর্জনের ঘোষণা দিলেও নির্বাচনের মাঠে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ একদিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নেতিবাচক অবস্থান নিলেও, অন্যদিকে দলটির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের একটি অংশ অনানুষ্ঠানিকভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগসহ রাজনৈতিক কর্মকা-ে অংশ নিয়েছেন। ফলে দলটির উভয় ভূমিকার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছে এবং দলটির কার্যক্রম ও ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে একই সময়ে আওয়ামী লীগ জুলাই অভ্যুথ্যান ও অন্তর্বর্তী সরকারকে অবৈধ ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে ঘোষণা করে নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকেছে। টিআইবি আরও জানায়, নির্বাচনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অবৈধ ঘোষণা করে প্রতিহত করার ঘোষণা দিলেও মাঠপর্যায়ে দলটির কর্মী-সমর্থকদের একটি অংশ ভোটার হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। যদিও দলের একটি অংশ ভোট বর্জন করেছে- যা সাধারণ ভোটারদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের ভোট টানার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াত জোট এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা এ ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও সাড়া দেখা যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা সরাসরি অংশগ্রহণকারী অন্য দলগুলোতে যোগদান বা তাদের প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। টিআইবি প্রতিবেদনে জানায়, জুলাই অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারকে অবৈধ ও ষড়যন্ত্রমূলক ঘোষণার অবস্থানে আওয়ামী লীগের অবিচল অবস্থান ছিল। নির্বাচনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগ কর্তৃক অবৈধ ও প্রতিহত করার ঘোষণা ও তৎপরতা এবং নির্বাচন ও নির্বাচনি পরিবেশে আওয়ামী লীগের নেতিবাচক ভূমিকায় সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গেছে। সংস্থাটি বলছে, মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের ভোট টানার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের অনেকেই, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত জোট এবং জাতীয় পার্টিসহ দল ও প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও সাড়া দিয়েছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণকারী কোনো কোনো দলে যোগদান ও প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button