জাতীয় সংবাদ

পিলখানা হত্যাযজ্ঞে আসামি হচ্ছেন হাসিনাসহ একাধিক আ.লীগ নেতা

জাতীয় শহীদ সেনা দিবস আজ

পিলখানা হত্যাকাণ্ডে সার্বভৌমত্ববিরোধী তৎপরতা ছিল : প্রধানমন্ত্রী

প্রবাহ রিপোর্ট : বিডিআর হত্যাকা- ও বিস্ফোরক মামলায় আসামি করা হবে শেখ হাসিনা, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, ফজলে নূর তাপসসহ তৎকালীন মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী একাধিক মন্ত্রী ও এমপিদের। মঙ্গলবার সকালে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি স্পেশাল পিপি বোরহান উদ্দিন এসব তথ্য জানান।
২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রক্তাক্ত হয়েছিল পিলখানা। ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে জীবন দিতে হয়েছে।
বিচারিক আদালত ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর এ মামলার রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদ-, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদ- এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেন। হাইকোর্ট ১৩৯ আসামির মৃত্যুদ- বহাল রাখেন। এছাড়া ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদ- এবং ২২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়। খালাস পান ২৮৩ জন। মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের ইতিহাসে কালো দিন। ২০০৯ সালের এই দিনে রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরে (বর্তমান বিজিবি) ঘটে এক মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনা। বিদ্রোহী বিডিআর জোয়ানদের হাতে প্রাণ হারান ৫৮ জন সেনা সদস্য। আজ ও আগামীকাল তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিজিবি।
বহুল আলোচিত এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় (পিলখানা হত্যা মামলা) ১৩৯ জনকে ফাঁসি, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দিয়েছেন হাইকোর্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মামলা হিসেবে পরিচিত।
কী ঘটেছিল সেদিন? সেদিন সকাল ৯টা ২৭ মিনিটের দিকে বিজিবির বার্ষিক দরবার চলাকালে দরবার হলে ঢুকে পড়ে একদল বিদ্রোহী সৈনিক। এদের একজন তৎকালীন মহাপরিচালকের বুকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে। এরপরই ঘটে যায় ইতিহাসের সেই নৃশংস ঘটনা। বিদ্রোহী সৈনিকরা সেনা কর্মকর্তাদের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করে তাদের পরিবারকে জিম্মি করে ফেলে। পুরো পিলখানায় এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। চারটি প্রবেশ গেট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আশেপাশের এলাকায় গুলি ছুঁড়তে থাকে তারা। বিদ্রোহীরা দরবার হল ও এর আশপাশ এলাকায় সেনা কর্মকর্তাদের গুলি করতে থাকে। তাদের গুলিতে একে একে লুটিয়ে পড়তে থাকেন সেনা কর্মকর্তারা। ঘটনার ৩৬ ঘণ্টা পর এ বিদ্রোহের অবসান হয়। পিলখানা পরিণত হয় এক রক্তাক্ত প্রান্তরে। পরে পিলখানা থেকে আবিষ্কৃত হয় গণকবর। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় সেনা কর্মকর্তাদের লাশ। ৩৬ ঘণ্টার এ হত্যাযজ্ঞে ৫৭ সেনা কর্মকর্তা, একজন সৈনিক, দুই সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ বিজিবি সদস্য ও পাঁচজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন।
মামলা ও বিচারকার্য : এ ঘটনায় ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়। পরে এসব মামলা নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তরিত হয়। মামলায় সিআইডি দীর্ঘ তদন্ত শেষে হত্যা মামলায় ২৩ বেসামরিক ব্যক্তিসহ প্রথমে ৮২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে সম্পূরক অভিযোগপত্রে আরও ২৬ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করায় আসামির সংখ্যা হয় ৮৫০ জন। এছাড়া বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় ৮০৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় সিআইডি। পরে আরও ২৬ জনকে অভিযুক্ত করে মোট ৮৩৪ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয়া হয়।
রাজধানীর পুরান ঢাকার আলিয়া মাদরাসা মাঠে স্থাপিত ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ইতিহাসের কলঙ্কজনক এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদ-, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন, ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে (তিন বছর থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত) কারাদ-, ২৭৮ জনকে খালাস এবং চারজন আসামি বিচার চলাকালে মারা যাওয়ায় মামলার দায় থেকে তারা অব্যাহতি পায়।
আদালতের রায় ঘোষণার পর ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আসামিরা দ-াদেশের বিরুদ্ধে আপিল ও জেল আপিল করেন। এর মধ্যে ৬৯ জনকে খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ উদ্যোগ নেন। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে দেন। দেশের ইতিহাসে আসামির সংখ্যার দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় এ মামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে শুনানি শুরু হয়।
মৃত্যুদ-ে দ-িতরা সবাই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিডিআর) সদস্য ছিলেন। যাবজ্জীন কারাদ-ে দ-িতদের মধ্যে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু ও আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীও রয়েছেন। এর মধ্যে নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু ২০১৫ সালের ৩ মে রাজশাহী কারাগারে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
হাইকোর্টের রায়ে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ১৫২ জন আসামির মধ্যে ১৩৯ জনের ফাঁসির রায় বহাল রাখেন। একইসঙ্গে আটজনের মৃত্যুদ-ের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন ও চারজনকে খালাস দেওয়া হয়। অন্যদিকে এ মামলার অন্যতম আসামি বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন পিন্টু হাইকোর্টের বিচার চলাকালীন সময়ে মারা যান। এছাড়া বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন পাওয়া ১৬০ জন আসামির মধ্যে ১৪৬ জনের সাজা বহাল রাখেন হাইকোর্ট। এদের মধ্যে দু’জন আসামির মৃত্যু হয়েছে এবং ১২ জন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
বিডিআর পুনর্গঠন ও বিজিবি গঠন : পিলখানায় এই বিদ্রোহের ঘটনায় বিডিআরের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে যায়। শুরু হয় বিডিআর পুনর্গঠনের কাজ। বিডিআরের নাম, পোশাক, লোগো ও সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন করা হয়। বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। পরিবর্তন করা হয় বিদ্রোহের আইন।
পিলখানা হত্যাকা-ে সার্বভৌমত্ববিরোধী তৎপরতা ছিল :
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডির নেপথ্যে দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিরোধী তৎপরতা বিদ্যমান ছিল। নাগরিক হিসেবে বিষয়টি উপলব্ধিতে রাখা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় শহীদ সেনা দিবস (২৫ ফেব্রুয়ারি) উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে এ মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি, জাতীয় শহীদ সেনা দিবস। ২০০৯ সালের এই দিনে বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় সেনা হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিল। হত্যাযজ্ঞে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন শহীদ হয়েছিলেন। ২০০৯ সালের পর দিনটি যথাযোগ্য গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়নি। ২০২৪ সালে দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হওয়ার পর থেকে দিনটি ‘শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। আজকের এই বিশেষ দিনে আমরা সেনা হত্যাযজ্ঞে শহিদদের মাগফেরাত কামনা করছি। তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ করছি।
তারেক রহমান বলেন, পিলখানায় সংঘটিত সেনা হত্যাকা-ের বিচার চলমান। বিচারাধীন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলার অবকাশ নেই। তবে এই হত্যাকা-ের নেপথ্যে দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী তৎপরতা বিদ্যমান ছিলো-নাগরিক হিসেবে এই বিষয়টি আমাদের উপলব্ধিতে থাকা জরুরি বলে মনে করি।
তিনি আরও বলেন, এই হত্যাকা-ের পর নানা রকম মিথ্যা কিংবা অপতথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছিল। তবে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের কাছে পিলখানায় হত্যাকা-ের নেপথ্য কারণ এখন বোধগম্য।
প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনীকে একটি স্বাধীন দেশের সম্মান, বীরত্ব এবং গৌরবের প্রতীক হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ভবিষ্যতে আর কেউ যাতে সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে না পারে, আজ পুনরায় সেই শপথে বলীয়ান হতে হবে।
দেশ এবং জনগণের স্বার্থের বিপরীতে যে কোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াব-এই হোক শহীদ সেনা দিবসের প্রত্যয়,’ বলেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button